মঙ্গলবার | অক্টোবর ২০, ২০২০ | ৪ কার্তিক ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আসছে শীতে কভিড পরিস্থিতির ব্যাপকতর অবনতির আশঙ্কা প্রধানমন্ত্রীর

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এখন থেকেই সার্বিক প্রস্তুতি নিতে হবে

দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের ধারাবাহিকতা ছয় মাসের বেশি সময় অতিক্রম করেছে। এরই মধ্যে ভাইরাসটির সামাজিক সংক্রমণের মাত্রা পুরো দেশে বিস্তার লাভ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ের মধ্যেই রয়েছে। প্রথম পর্যায়ের করোনা সংক্রমণ কখন শেষ হবে, তা বলতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। এদিকে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবসা, শিল্প-কারখানা, গণপরিবহন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, দোকানপাট, বাজারঘাট সবই খুলে দেয়া হয়েছে। লকডাউন আর রেড-ইয়েলো-গ্রিন জোনের পরিকল্পনারও আপাত ইতি ঘটেছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক ব্যবহারএসব স্বাস্থ্যবিধি পালনে আর তেমন তাগিদ বোধ করছে না জনসাধারণ। এসব স্বাস্থ্য নির্দেশনার পরিপালন নিশ্চিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েরও খুব একটা সক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে না। ফলে দেশে সংক্রমণ এখন তিন লাখ এবং মৃত্যু হাজার ছাড়িয়েছে। বৈশ্বিক চিত্রও এর চেয়ে ভিন্নতর নয়। অনেক দেশেই চলমান মহামারী এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে আসছে শীতে ইউরোপের অনেক দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসতে পারে। এসব দেশের মধ্যে আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, চেক রিপাবলিক, বেলজিয়াম, ইতালি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্পেন উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশেও শীত ঘনায়মান। অবস্থায় সংগত কারণেই সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী আসন্ন শীতে করোনা পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। তার আশঙ্কার যথার্থতার সায় মিলছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও। সুতরাং বিষয়টি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সক্রিয়তা জরুরি।

তবে সর্বাগ্রে বিগত সময়ে কভিড মোকাবেলা কার্যক্রমের একটি অনুপুঙ্খ পর্যালোচনা মূল্যায়ন হওয়া জরুরি, যাতে অতীতের ভুল-ত্রুটি-সীমাবদ্ধতার আলোকে সামনের দিনগুলোর করণীয় নির্ধারণ সহজতর হয়। বিগত সময়ে কয়েকটি নেতিবাচক বিষয় দেখা গেছে। প্রথমত, কভিড-১৯ মোকাবেলা করতে গিয়ে আমাদের পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়েছে। কভিডে আক্রান্ত হয়নি, এমন সাধারণ রোগীদেরও হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাওয়া ব্যাহত হয়েছে। প্রথম দিকে অনেক সাধারণ রোগী হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেও চিকিৎসা পায়নি। সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সব হাসপাতাল-ক্লিনিকে একই ধরনের হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। দ্বিতীয়ত, কভিড-১৯ মোকাবেলা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক অব্যবস্থাপনা জবাবদিহি ঘাটতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। এন-৯৫ মাস্ক, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা বিতরণের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কভিড-১৯ পরীক্ষায় প্রতারণা, ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার কেলেঙ্কারিতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। তৃতীয়ত, কভিড সংক্রমণের বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে প্রাথমিক করণীয় হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুনঃপুন তাগিদ সত্ত্বেও দ্রুত বিপুলসংখ্যক মানুষের কভিড পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রথম দিকে শুধু সরকারি সংস্থার হাতেই পরীক্ষার এখতিয়ার সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। বেসরকারি কোনো সংস্থাকে পরীক্ষার অনুমোদন দেয়া হয়নি দীর্ঘ সময় ধরে। সরকারি তরফেও দ্রুত পর্যাপ্তসংখ্যক পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এখনো দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সরকারি বা বেসরকারি কোনো ধরনের পরীক্ষাকেন্দ্রই নেই। আসলে পরীক্ষার সংখ্যাস্বল্পতা এবং উচ্চহারে সংক্রমিত রেড জোনগুলোয় লকডাউন বাস্তবায়নে ব্যর্থতাসহ নানা কারণে সংক্রমণ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এখনো পরীক্ষার হার তুলনামূলক অনেক কম। ফলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র মিলছে না। এমনটি হলে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবেলা করা কঠিন হবে বৈকি।

কভিড-১৯-বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি বরাবরই পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছে। কিন্তু তাতে অগ্রগতি নেই বললে চলে। এখন তাদের পরামর্শ আর উপেক্ষা করা সমীচীন হবে না। পরীক্ষার সংখ্যা অবশ্যই আরো বাড়াতে হবে। সংক্রমণ আর বাড়তে দেয়া চলবে না। সেজন্য মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় সরকারের বাড়তি তত্পরতা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, এনজিও, যুবসমাজের সহযোগিতা নিয়ে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাতে হবে। প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

এটা সত্য যে বর্তমানে হাসপাতালে রোগীদের শয্যা পেতে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। কভিড চিকিৎসায় নিবেদিত হাসপাতালগুলোয় অনেক শয্যা বরং খালি থাকছে। ফলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কভিড হাসপাতালের সংখ্যা কমিয়ে আনছে। কিছু বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে এরই মধ্যে চিকিৎসাসংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু শীতে করোনা পরিস্থিতির ব্যাপকতর অবনতির যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেটি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। তার জন্য এখনই প্রস্তুত থাকতে হবে। এজন্য কাভিড হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাক্ষেত্রে আরো উন্নতি ঘটাতে হবে। অক্সিজেন সরবরাহ, আইসিইউ সেবা বাড়াতে হবে। রোগীর সম্ভাব্য চাপ সামলাতে আরো অনেক হাসপাতাল এখন থেকেই প্রস্তুত রাখতে হবে। হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে রোগীর অবস্থা জটিল-গুরুতর হওয়ার আগেই হাসপাতালে নেয়া হয়। এতে মৃত্যুহার লক্ষণীয় মাত্রায় কমবে বৈকি। আসন্ন শীতে অন্য দেশ, বিশেষত ইউরোপের দেশগুলো কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে সেগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। সর্বোপরি কভিড চিকিৎসাসহ সামগ্রিক চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত করতে হবে। সেজন্য দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্ত্র্য মন্ত্রণালয় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণে উদ্যোগী হবে, এটিই প্রত্যাশা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন