শুক্রবার | অক্টোবর ৩০, ২০২০ | ১৫ কার্তিক ১৪২৭

ফিচার

শ্রীলঙ্কাকে বারবার দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচিয়েছে যে ফল

বণিক বার্তা অনলাইন

আমার মা রাজধানী কলম্বো থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে কুরুনেগালায় ৮ জন সদস্যের পরিবারে বড় হয়েছেন। ১৯৭০’র দশকে দ্বীপটিতে মারাত্মক খরার সময় একমুঠো তাজা নারকেল ঝুরির সঙ্গে সেদ্ধ কাঁঠাল তাদের নিত্যদিনের খাবার ছিল। প্রাকৃতিক তেল মিশ্রিত এই সহজ কার্বোহাইড্রেড সমৃদ্ধ খাবারটি কৃষক-পরিবারগুলোকে শুষ্ক সমতলে দিনরাত পরিশ্রম করার যথেষ্ট শক্তি সরবরাহ করেছিল। কলম্বো-ভিত্তিক ফ্রিল্যান্স নিবন্ধকার জিনারা রথনায়েক তার এক নিবন্ধে এমনটিই লিখেছেন।

আর আজকাল স্টারবাকস র‌্যাপিং করে সেই কাঁঠাল পরিবেশন করে। অন্যদিকে পিৎজা হাটের জনপ্রিয় একটি খাবারের মধ্যে কাঁঠাল একটি। লন্ডনের স্থানীয় পত্রিকা ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড কাঁঠালকে ‘কিমচি, বাঁধাকপি ও ফুলকপি- একের ভেতর সব’ হিসেবে অভিহিত করেছে। পিনট্র্যাস্ট এটিকে আখ্যা দিয়েছে ‘২০১৭ সালের হটেস্ট ফুড ট্রেন্ড’, আর সম্প্রতি গার্ডিয়ান এ ফলটিকে ‘ভেগান সেনসেশন’ বলে অভিহিত করেছে।

কাঁঠাল হলো বৃক্ষে জন্মানো বিশ্বের বৃহত্তম ফল। পাকার পাকার সঙ্গে এ ফলের ত্বক সবুজ থেকে হালকা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। কাঁঠাল কাঁচা অবস্থায় রান্না করে খাওয়া হয় এবং পাকা কাঁঠাল আম বা আপেলের মতো খাওয়া যায়। যদিও পশ্চিমারা এটিকে বিকল্প ‘নৈতিক মাংস’ হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশে রান্না করা কাঁচা কাঁঠালকে গরিবের মাংস বলে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বলে ‘গাছ পাঁঠা’।

জিনারা রথনায়েক বলেন, আমার মায়ের বেড়ে ওঠার স্মৃতিগুলো তার ভাই-বোনদের স্মৃতির সঙ্গে অসংখ্য কাঁঠালের পদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ২০০০ দশকের গোড়ার দিকে একই ফল আমার শৈশবের ক্ষুধা দূরীভূত করেছিল। পাকা কাঁঠাল খেতে বসলেই আমার মা সেই পুরনো দিনগুলোর কথা স্মরণ করতেন। 

সুস্বাদু এই ফলটিকে শ্রীলঙ্কানরা সমীহ করে, কারণ এটি বারবার দ্বীপটিকে অনাহার থেকে বাঁচিয়েছে। তারা পাকা এ ফলটির তীব্র গন্ধ পছন্দ করে। যদিও পাশ্চাত্যের লোকেরা প্রায়শই এটিকে দুর্গন্ধযুক্ত হিসেবে বর্ণনা করে। তবে শ্রীলঙ্কা, ভারত, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে পাকা কাঁঠালের মৌসুমী ঘ্রাণটি জনসাধারণের মনে সুবাতাস দিয়ে যায়। শ্রীলঙ্কাতে এটি ‘দুর্ভিক্ষের ফল’ হিসেবেও পরিচিত। 

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রটিতে কাঁঠাল গাছ বাথ গাসা (ধান গাছ) নামে পরিচিত। তাদের প্রধান খাদ্য ভাত। প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগে জলাশয় ও সেচ খালগুলোর কল্যাণে মাঠজুড়ে ধান চাষ হতো। ১৮১৫ সালে ব্রিটিশ বাহিনী দ্বীপটি দখল করে এবং পরবর্তীকালে কৃষকদের জমি ছিনিয়ে নেয়। রফতানি আয় বাড়ানোর জন্য দ্বীপটিতে তারা ধানের পরিবর্তে চা, রাবার ও দারুচিনি জাতীয় ফসল চাষ বাড়িয়ে তোলে। 

শ্রীলঙ্কাজুড়ে কাঁঠাল গাছ ছড়িয়ে দেয়ার অগ্রপথিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সদস্য আর্থার ভি ডায়াসকে। একটি বিদ্রোহের ঘটনায় ব্রিটিশরা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। যদিও ১৯১৫ সালে কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এরপর ডায়াস ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেকে শামিল করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে আবাদ ক্রমশ কমতে থাকায় দ্বীপবাসীরা শিগগিরই খাদ্য সংকটে পড়বে। তিনি দেশজুড়ে খাদ্য সুরক্ষা ও স্বনির্ভরতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। 

উস্বেতাকিয়াওয়া শহরের সেন্ট মেরিস মহা ভিডুহালার ইতিহাসের শিক্ষক দামিথ অমরসিংহ বলেন, একজন ব্যক্তি ধান চাষের জন্য একটি পুকুর বা খাল খনন করতে পারে না। তবে অর্থার ভি ডায়াস বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি কাঁঠাল গাছ লাগাতে পারেন, যা ভাতের মতো ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে। 

ডায়াস শ্রীলঙ্কাজুড়ে ১০ লাখ কাঁঠাল গাছ লাগানোর উচ্চাভিলাসী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। মালয়েশিয়া থেকে কাঁঠালের বীজ আমদানি করে তিনি অঙ্কুরোদগমের জন্য স্বাস্থ্যকর বীজ সংগ্রহ করেন। চারা ও বীজ বিতরণের জন্য তিনি দেশের দূর প্রান্তে ভ্রমণ করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডায়াসের ক্যাম্পেইনটি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি নায়কোচিত ডাকনাম ‘কস মামা’ বা আঙ্কেল জ্যাক নামে খ্যাতি পান। আজ ডায়াসকে একজন জাতীয় নায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং বেশিরভাগ শ্রীলঙ্কান শিশু বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে তার সম্পর্কে জানতে পারে।

১৯৭০’র দশকে মুদ্রাস্ফীতি, খরা ও খাদ্যাভাব শ্রীলঙ্কাকে পর্যুদস্ত করে। ১৯৭৪ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি নিবন্ধে শ্রীলঙ্কার তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক বলেছিলেন, ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আমাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। আমরা আক্ষরিকভাবে টিকে থাকার জন্য লড়াই করছি। তবে দশকের গোড়ার দিকে ডায়াসের প্রচারণার কারণে লোকেরা তাদের বাড়ির উঠানে কাঁঠাল গাছ রোপণ করেছিল। গাছগুলো তখন বড় হয়ে ফল দেয়া শুরু করেছে। সঙ্কটের মধ্যে এগুলোই শ্রীলঙ্কানদের রক্ষা করছে।

সম্প্রতি অমরসিংহ বলেছেন, কভিড-১৯ এর কারণে শ্রীলঙ্কার দীর্ঘ কারফিউ চলাকালীন কাঁঠাল আবারো জনগোষ্ঠীকে খাদ্যাভাব থেকে রক্ষার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। সবকিছু বন্ধ থাকায় মানুষের উপার্জন কমে গেছে এবং সরকারি খাদ্য ও ওষুধ সহায়তা দুর্গম গ্রামগুলোতে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লেগেছিল। অর্থ ও খাবারের অভাবে অনেক গ্রামবাসী সেদ্ধ কাঁঠালের ওপর ভরসা করেছে। যেমনটি ১৯৭০’র দশকে মানুষজন কাঁঠালের ওপর নির্ভর করে বেঁচেছিল।

বিবিসি অবলম্বনে শিহাবুল ইসলাম

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন