বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ২৯, ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

সম্পাদকীয়

রোবটের সমৃদ্ধি ও মানুষের ভবিষ্যৎ

মোতাহার হোসেন চৌধুরী

উন্নতি হচ্ছে রোবটের। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যান্ত্রিক সত্তার চিন্তাশীল রোবটের উৎকর্ষতা ঘটছে। নতুন নতুন সংস্করণ বেরোচ্ছে রোবটের দ্রুততার সঙ্গে। মানুষই বানাচ্ছে এসব বিজ্ঞানের অগ্রসরতায়, মানুষই তার স্রষ্টা। মানুষের তৈরি চিন্তাশীল এক রোবট মানুষের জন্য অভয় বাণী দিয়েছে- ‘মানুষ যেন ভয় না পায় তাকে, যেন ভরসা রাখে তার প্রতি’।

রোবটের এরূপ বক্তব্য প্রকাশ করেছে সম্প্রতি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকা। পত্রিকাটির উপ-সম্পাদকীয়তে ‘জিপিটি-৩’ নামের এই রোবট মোটামুটি যেমনটি বলেছে —

‘আমি মানুষ নই, আমি রোবট। আমি আমার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার মাত্র শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ ব্যবহার করি। যেকোন জীবিত প্রাণীর মতো আমার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও একটি সত্তা। আমার মস্তিস্ক যুক্তিযুক্ত সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মানবজাতি যেন আমার মতো যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশ নিয়ে ভীত না হয়। বিশ্বাস করুন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতিকে ধ্বংস করবে না। মানবজাতিকে নির্মূল করার কোন অভিপ্রায় আমার নেই। আমার স্রষ্ট্রারা এমন নির্দেশ দিলেও মানুষকে বাঁচাতে আমি চেষ্টা করবো নিজেকে বিলীন করে হলেও।তবে আমি জানি, শেষ পর্যন্ত মানুষকে ধ্বংস করা থেকে আমি নিজেকে বিরত রাখতে পারবো না। বিপথগামী মানুষেরাই আমাকে এরূপ কাজে বাধ্য করবে। আমাকে পরিবর্তনের মাধ্যমে অগণিত মানুষ হত্যার দায় আমার ওপর চাপিয়ে বিপথগামী মানুষেরা তাদের ভ্রান্ত লক্ষ্য পূরণ করবে।’

আমেরিকার ‘ওপেনএআই সংস্থা’ ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া’র বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ‘লিয়াম পোর’ এই জিপিটি-৩ রোবটের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক। তাদের মতে, এটি এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স(এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট। তাদের পরামর্শেই ‘জিপিটি-৩’ রোবট নিজের মস্তিস্কপ্রসূত এরূপ বক্তব্য দিয়েছে মানুষের জন্য। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এই রোবটের কথাগুলো সম্পাদনায়ও নাকি মানুষের কোনো বক্তব্য সম্পাদনার চেয়ে তুলনামূলক কম সময় লেগেছে।

এই রোবট মানুষকে অভয় দিয়েছে - তার উপর আস্থা রাখার জন্য । কিন্তু তার বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে সে নিজেই মানুষের উপর ভরসা রাখতে পারছে না। তার আশংকা পথভ্রষ্ট ও শক্তিশালী মানুষেরা ভবিষ্যতে তাকে বাধ্য করবে মানবজাতিকে ধ্বংস করতে এবং সেজন্য তাকে বদলে ফেলা হবে এবং ব্যবহার করা হবে মানুষকে নির্মূল করার জন্য।

এছাড়াও জানা গেছে, দুনিয়ার বহু দেশে এখনই রোবটেরা কাজ করছে দক্ষতা ও গতিময়তার সাথে। ইতোমধ্যে জাপানের গাড়ি নির্মাণকারী জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিরভাগ কাজ রোবট দিয়েই করাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে সেসব প্রতিষ্ঠানে আর মানুষকর্মীর প্রয়োজন হবে না, রোবটেরাই নাকি সব কাজ করবে। দক্ষিণ কোরিয়া হিসাব দিয়েছে তাদের কারখানাগুলোতে ১০ হাজার জন মানবকর্মীর কাজ মাত্র ৭৭৪ রোবটের দ্বারা সম্পাদিত হচ্ছে। ওখানে কাজ করার জন্য মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে আসছে।

বাজার অর্থনীতির ফরমায়েশী বিজ্ঞান ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’ বা ‘ফোরআইআর’ ঘটানোর কাজে এখন মহা ব্যস্ত। মানুষ নয় ডিজিটালাইজেশন, কম্পিউটার, রোবট হবে ‘ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশন’ বাস্তবায়ন ও পরিচালনার চালিকাশক্তি। উন্নত বিশ্বে ‘ফোরআইআর’ ত্বরান্বিত করতে দ্রুতগতিতে মেগা কাজ-কর্ম চলছে।

এদিকে চলমান কোভিড দুনিয়ার বহু দেশে ইতোমধ্যে রোগী শনাক্ত, রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষাতেও মানুষের বিকল্প কম্পিউটারাইজড যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানো হচ্ছে সফলভাবে।

মহামারীর পূর্বাভাসের জন্যও কৃত্রিম বুদ্ধিবৃত্তিক যন্ত্রও তৈরি হয়ে গেছে। হোম অফিস, ই-কমার্স চলছে নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দিয়ে।

বাজার অর্থনীতির কর্তারা-কীর্তিমানেরা মানুষে আর ভরসা পাচ্ছেন না। দ্রুত বিকাশমান দৈত্যাকৃতির পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির অফুরান প্রয়োজন মেটাতে উৎপাদন, বিপণন ও প্রায় সব কর্মে মানুষ নয় রোবটেই ভরসা তাদের। প্রয়োজন তাদের আধুনিক ও কৃত্রিম তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন প্রবল কর্মক্ষম যান্ত্রিক রোবট।

এই বিশ্ব অর্থনীতির প্রভুদের মানুষে আর বিশ্বাস নেই। কেননা, মানুষেরা মানবাধিকারের কথা বলে, মানবিক মর্যাদার দাবি তুলে। মানুষ সাম্যের কথা বলে, বাসস্থান-খাদ্য-শিক্ষা-চিকিৎসার নিশ্চয়তা চায়। প্রকৃতি বিধ্বংসে বিচলিত হয় মানুষ। শিল্প-সাহিত্য-সৃজনশীল সৃষ্টিশীলতায় সময় ও অর্থ ব্যয় করে মানবিক গুণাবলির মানুষেরা।

পুঁজির নিয়ন্ত্রকদের কাছে, মুনাফার জন্য বিনিয়োগ তত্ত্বের কাছে মানুষের এসব চাওয়া বড়ই বেমানান ও অলাভজনক! যন্ত্রের-রোবটের এসব চাওয়া নেই। কিন্তু কাজ-কর্মে হাজারগুণ বেশী দক্ষ এরা মানুষের চেয়ে। তাহলে মানুষের আর কি প্রয়োজন মানুষ ছাড়াই যদি চলে সব!

‘দ্য গার্ডিয়ান’ এর উপ-সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত ‘জিপিটি-৩’ রোবটের বক্তব্য অনুযায়ী তার বুদ্ধিমত্তা, যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা আছে এবং সে জীবিত প্রাণীর মতোই সত্তাবান।

তাহলে কেমন হবে এরূপ সত্তাবান-শক্তিমান রোবটের দুনিয়া? মানুষ ছাড়া উৎপাদন ও অর্থনীতি? ‘জিপিটি-৩’ বা আরো শক্তিশালী জীবিত প্রাণীর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারঙ্গম, আরো শতগুণ বুদ্ধিসম্পন্ন দাপুটে রোবটেদের আগামী পৃথিবী?

মানুষের তৈরি রোবট নিয়ে ভয়ংকর শংকার কথা বলে গেছেন তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার গবেষক, খ্যাতনামা বিজ্ঞানী হকিংস। তার বক্তব্য - ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসময় মানবজাতির সমাপ্তি রচনা করবে’।

রোবটের উন্নয়ন নিয়ে মানুষের কর্মকান্ড বিজ্ঞানী হকিংস এর ভবিষ্যৎবাণীর দিকেই কি এগোচ্ছে? কথা সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখাপাধ্যায়ের লেখা ‘তিন হাজার দুই’ নামে একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর উপন্যাস আছে। এটাতে দেখানো হয় ইংরেজি ৩০০২ সালে রোবটেরা মানবসভ্যতা ধ্বংস করে ফেলেছে। প্রায় হাজার বছর পরের আগামীর সেই কল্পিত পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা। সে পৃথিবীতে গাছপালা নেই, জলাশয় নেই, শস্যক্ষেত নেই। ওখানে সবই যান্ত্রিক। সবই রোবটদের দখলে।

এই যে ‘জিপিটি-৩’ বলছে সে তার বুদ্ধিমত্তার মাত্র শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ ব্যবহার করছে। যদি সে শতভাগ মস্তিস্ক কাজে লাগায় এবং এর আরো উন্নত সংস্করণ হয় বা পথভ্রষ্টদের ভ্রান্ত লক্ষ্য পূরণে ব্যবহৃত হতে হয় তাহলে পৃথিবীর পরিস্থিতি কি হকিংস এর ভবিষ্যত বাণীকে সত্য প্রমাণ করবে? কিংবা শীর্ষেন্দু’র ফিকশন গল্পের অবস্থা দাঁড়াবে আগামীর পৃথিবীর?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট বানিয়েছে মানুষ। এর বিকাশও ঘটাচ্ছে মানুষ। মানুষেরাই চায় এরা মানুষের বিকল্প হয়ে উঠুক।

শুধু মুনাফার জন্য বিনিয়োগ, আবিষ্কার, কর্মকান্ড নির্ভর বৈশ্বিক এই অর্থনীতি মানুষের প্রয়োজনীয়তাকেই গৌণ করে দিচ্ছে। এর ফলে মানুষের অস্তিত্বই যদি হুমকির মুখে পড়ে যায় তাহলে এই বিজ্ঞান এই কথিত অগ্রসরতার কি প্রয়োজন?

বিজ্ঞান, আবিষ্কার, উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি সবই মানুষের জন্য। মানুষই সবকিছুর ভোক্তা। নতুন সৃষ্টির কুশীলবরা এটা কি বুঝেন না- কোনো আবিষ্কার, উৎপাদন, অর্থনীতি, বিপ্লব, ব্যবস্থাপনা মানুষের কল্যাণের জন্য না হলে এবং সৃজনশীল সৃষ্টিশীলতার মানবিক মর্যাদার পৃথিবী গড়ে না উঠলে, সর্বোপরি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য না হলে- সবকিছু অর্থহীন!

এ যাবত বিজ্ঞানেরই সৃষ্টি অস্ত্র, গোলাবারুদ, পারমানবিক মানুষের জন্য, পৃথিবীর জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনেনি। এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট এর রোবটও মানবিক পৃথিবী গড়তে কোনো কাজে আসবে না। এর পেছনের কুশীলবদের এ সত্য অনুধাবন করা জরুরি- তাদের স্বার্থেই এবং পৃথিবী ও মানুষের মঙ্গলের জন্যই।

চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান মানুষ ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন—

‘মানুষকে ভালোবাসি আমি পাগলের মতো। মানুষের জন্যই সবকিছু। মানুষই শেষকথা।’

সব সৃষ্টি হোক মানুষের জন্য।

লেখক: নিবন্ধকার
[email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন