শনিবার | সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

সাম্প্রতিক

পেঁয়াজের বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে কিছু সুপারিশ

ড. মো. সাইদুর রহমান

পেঁয়াজ বাংলাদেশের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর একটি অন্যতম খাদ্য উপকরণ। রসুন আদার কদরও প্রায় সমানতালে চলে। তরকারিতে পেঁয়াজ না হলে বা কম হলে যেন চলেই না। মজাদার খাদ্যদ্রব্য তৈরিতে রমজানের সময় এবং কোরবানির সময়ে পেঁয়াজ এক অপরিহার্য ব্যবহূত পণ্য। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও গত বছর ধারণা করা হয়েছিল যে বাংলাদেশে সারা বছর ২৪ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। বছর কেউ কেউ বলছে চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ লাখ টন হয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী দেশে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ ১৮ দশমিক শূন্য লাখ টন, যা গত বছরে ছিল ১৭ দশমিক ৩৮ টন। আর আমদানি করা হয় প্রায় ১১ লাখ টন।

চাহিদার তুলনায় দেশে মোট উৎপাদন আমদানির হিসাবে কিছুটা গরমিল মনে হলেও পচনশীল পণ্য বিবেচনায় বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ কিছুটা বেশি রাখার চেষ্টা সংগত কারণেই খুব স্বাভাবিক। গত বছর এপ্রিলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে এবং জুলাইয়ে বন্যায় কোনো কোনো জেলার কৃষকদের নিজস্ব পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা পেঁয়াজ পচে যায়। বাজারে দেশীয় পেঁয়াজ ঘাটতির মূল কারণ ছিল এটি। আর দ্বিতীয় কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল অতিমাত্রায় আমদানি নির্ভরতায় বাধাপ্রাপ্ত হওয়া। মূলত পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকেই সিংহভাগ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। মিয়ানমার, মিসর, তুরস্ক থেকেও কিছু পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। গত বছর সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণে বাংলাদেশের বাজারেও এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। কয়েক দিনের ব্যবধানেই কেজিপ্রতি দাম ৪০-৪৫ টাকা থেকে ৫৫-৬০ টাকা হয়ে যায়। হঠাৎ করে ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের ডিরেক্টর জেনারেল অব ট্রেড (ডিজিএফটি) ঘোষণা করে যে ভারত থেকে রফতানি করা পেঁয়াজের দাম টনপ্রতি সর্বনিম্ন মূল্য হবে ৮৫০ ডলার, যা আগে ছিল ৩৫০ ডলার। ভারত সরকার তাদের অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই দাম বাড়ার বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রথমে রফতানি নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল নেয় এবং পরবর্তী সময়ে তাদের ভোক্তাদের চাহিদা অটুট রাখার স্বার্থে গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে পেঁয়াজ আর রফতানি করা হবে না বলে জানিয়ে দেয়। এমনকি আগের অর্ডারও বাতিল করে দেয়। এর সঙ্গে যোগ হয় কিছুসংখ্যক অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর অসাধু আচরণ। ফলে বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম প্রতি কেজি ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায় এবং পরবর্তী  এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ২০০-২৫০ টাকায়। বিপাকে পড়েছিল লাখ লাখ ভোক্তা, যারা রান্নাবান্নায় প্রচুর পরিমাণ পেঁয়াজ ব্যবহার করে অভ্যস্ত। বাজার অস্থিতিশীল হওয়ায় সরকারও পেঁয়াজের বাজারের লাগাম ধরতে ব্যর্থ বলে তার তকমা নিতে হয়েছিল। মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারের কারণে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ব্যাপক কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করেছিল এবং টিসিবি ঢাকা শহরে ৪৫ টাকা কেজি দরে প্রতিদিন পাঁচ টন করে পেঁয়াজ খোলাবাজারে বিক্রি করেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, ২০০৭-০৮ সালে নিজস্ব ভোক্তাদের কথা বলে চাল রফতানি নিয়ে ভারত একই কাজ করেছিল এবং ২০১৫, ২০১৭ ২০১৯ সালে পেঁয়াজ রফতানিতেও ভারত হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, যার প্রভাবে বাজারদর অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের এমন বৈরী আচরণ দেশের মানুষকে দারুণভাবে ব্যথিত করে। সঙ্গে সঙ্গে একথাও স্মরণ করিয়ে দেয় যে বেশি নির্ভরশীলতার সুযোগ যাতে কেউ না নিতে পারে, তার জন্য অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন। তা না হলে বাজার অস্থিতিশীল হওয়া অবশ্যম্ভাবী এবং এর দায় সরকারের পক্ষে এড়ানোও কঠিন। এখানে বলে রাখা ভালো যে ভারতে বার্ষিক পেঁয়াজ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২২-২৩ মিলিয়ন টন, যা গোটা পৃথিবীর পেঁয়াজ উৎপাদনের ২৫ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ভারত ১৯ লাখ ৯০ হাজার টন পেঁয়াজ রফতানি করেছে। গত বছর মিয়ানমার, মিসর তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হলে এবং জেলা প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগে বাজার তদারকির নামে অভিযান পরিচালনা করায় পেঁয়াজের বাজারদর কিছুটা কমে এসেছিল।

বছর সেই সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই হঠাৎ করে দেশী পেঁয়াজের কেজি ৩৫-৩৬ থেকে ৬০-৬২ টাকা এবং বিদেশী পেঁয়াজের কেজি ৩০-৩২ থেকে ৪৫-৪৬ টাকা হয়ে যায়। মূলত হঠাৎ মূল্য বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বন্যায় ভারতের কোথাও কোথাও পেঁয়াজ পচে যাওয়ার গুজব রটিয়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ করা রহস্যজনক, যা গত বছরের ন্যায় মূল্যবৃদ্ধিরই পূর্বাভাস দেয়। আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়। তা হলো, গত বছর পেঁয়াজের বাজারদর বৃদ্ধিতে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ার কোনো নমুনা পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে না। এমনকি বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির পরিমাণও ২০২০ সালের মে মাসে প্রকাশিত কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থে কেন যেন নেই (পৃষ্ঠা নং ৬৫৬) যাই হোক, বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে বাজার মনিটরিং অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে অতিরিক্ত দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। যদিও এগুলো কোনো দীর্ঘ মেয়াদের সমাধান নয়। গত বছরের ন্যায় বছরও যথাসম্ভব আগেই অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ যথেষ্ট পরিমাণ বাড়ানো না গেলে বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা কঠিন হতে পারে। এছাড়া অতি মুনাফালোভীরা যদি বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি করে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় তাহলেও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা দুষ্কর হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের নিমিত্তে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে তা হলো: . অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে বাজারে পেঁয়াজের জোগান বৃদ্ধি পেলে দাম কমে আসবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সে জোগান যেন কেউ কেউ সিন্ডিকেট করে বাধাগ্রস্ত না করতে পারে, তার জন্য রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে; . নিয়মিত বাজার তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বছরব্যাপী অব্যাহত রাখতে হবে; . দাম কিছুটা বাড়লেই খুচরা ব্যবসায়ী ভোক্তারা যেন হুজুগে বেশি মাত্রায় ক্রয় করে মজুদ না করে তার জন্য গণমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে; . ব্যবসায়ীদের শুধু দোষারোপ না করে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে; . যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে কৃষি বিপণন কর্মকর্তা নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে সঠিকভাবে পেঁয়াজের চাহিদা নিরূপণ করে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পেঁয়াজ উৎপাদনকারী একাধিক দেশ থেকে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাসময়ে আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে; . পেঁয়াজকে শুধু মসলা পণ্য হিসেবে গণ্য করলেই চলবে না বরং বিদ্যমান স্বল্প সুদে ( শতাশ হারে) ঋণ সুবিধা পরিধির ব্যাপক বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে বেশিসংখ্যক কৃষক পেঁয়াজ উৎপাদনে উৎসাহী হন এবং এতে পেঁয়াজের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে; . দেশীয় পেঁয়াজ সংরক্ষণের টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণায় বিনিয়োগসহ উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণে কৃষককে উৎসাহিত করতে হবে; . কৃষক উৎপাদন মৌসুমে যেন ভালো দাম পান, তার ব্যবস্থা করতে হবে। বছর ভালো দাম পেলে আগামী বছর বেশি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকরা এগিয়ে আসবেন; . মৌসুমে পেঁয়াজের দাম যাতে খুব বেশি কমে না যায়, তার জন্য পেঁয়াজচাষীদের উৎপাদন খরচের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাদের উপকরণ খরচে ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে; ১০. দেশের যেসব অঞ্চলে পেঁয়াজ উৎপাদনে তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে, সেসব অঞ্চলে (ফরিদপুর, পাবনা, নাটোর, রজিশাহী) কৃষকদের পেঁয়াজ উৎপাদনে এবং সংরক্ষণে উন্নত প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে; ১১. উচ্চফলনশীল পেঁয়াজের জাত উদ্ভাবনে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং ১২. পেঁয়াজের ব্যবহার কিছুটা কমানোর অভ্যাস এবং পেঁয়াজের কিছু বিকল্প মসলা রয়েছে, যেগুলো ব্যবহারেও ভোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

পরিশেষে, গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, ভারত নিজ দেশের ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য প্রথমে রফতানি নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে ভবিষ্যতে রফতানিতে প্রভাব পড়বে জেনেও পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করে রফতানি বন্ধ করে দিয়েছিল। অথচ আমাদের দেশের সরকার গত বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কেন দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করল না, যথাসম্ভব আগে থেকেই যথেষ্ট পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো হলো না এবং দাম স্থিতিশীল রাখতে বাজার তদারকির সুব্যবস্থা করছে না, তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা দরকার, তা না হলে গত বছরের ন্যায় বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। পেঁয়াজের ন্যায় রসুন, আদাসহ অন্যান্য মসলার বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ারও প্রয়োজন রয়েছে। পেঁয়াজের বিষয়ে এখন যেটা বেশি প্রয়োজন তা হলো, সরকারি ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পেঁয়াজ আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি করা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং টিসিবির মাধ্যমে শুধু ঢাকা নয় অন্যান্য জেলা শহরের বাজারেও তা সুলভ মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করা। অন্যথায় পেঁয়াজের অতিরিক্ত দামের পূর্বাভাস, ঝাঁজ আর চোটপাট যা- বলি না কেন, কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে তা আমাদের দেশের সাধারণ ভোক্তাদের আরো বিপাকে ফেলতে পারে, যা হবে সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত।  আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল প্রস্তাবিত বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখবে এবং আশু পদক্ষেপ নেবে।

 

. মো. সাইদুর রহমান: অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ এবং পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন