শনিবার | সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে এডিপি

শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জনই নয়, লক্ষ্য থাকুক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও

কভিড-১৯ মহামারীর অভিঘাতে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও পর্যুদস্ত হয়েছে। বিশেষ করে দুই মাসের সাধারণ ছুটি তথা অঘোষিত লকডাউনের সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ থাকায় অর্থনীতিতে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনসাপেক্ষে লকডাউন তুলে সবকিছু খুলে দেয়া হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে ফের শুরু হয়। প্রতিটি খাতই নতুন স্বাভাবিকতায় কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে এখন। তারই ধারাবাহিকতায় মহামারী থেকে আমাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার পেতে শুরু করেছে। অন্য অনেক অর্থনীতি যেখানে কভিডের আঘাতে এখনো গভীরতর মন্দায় নিমজ্জিত, বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুততার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এটি ইতিবাচক বিষয় বৈকি। কিন্তু সত্য যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাত্রা এখনো প্রাক-কভিডের সময় পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। এক্ষেত্রে কৃষি খাত ব্যতিক্রম। কেবল উল্লিখিত খাত বাদে আর কোনো খাতের কর্মকাণ্ড কভিডের আগের মাত্রায় পৌঁছেনি। এমনকি মার্চের পর থেকে তৈরি পোশাক শিল্প খুব চমকপ্রদভাবে নৈপুণ্য দেখালেও এখনো একটা স্থিতিশীল পর্যায়ে থিতু হতে পারেনি। সেদিক থেকে নতুন স্বাভাবিকতায় অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য পূর্ণোদ্যমে ফিরিয়ে আনাটাই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রশংসনীয় বিষয় হলো, স্বাস্থ্য মহামারী পরিচালন ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সত্ত্বেও সরকার উপযুক্ত অর্থনৈতিক প্রণোদনা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনীতিকে সুসংহত করেছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায়ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে দ্রুতই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুরু হতে যাচ্ছে, যার ইঙ্গিত স্পষ্টত বিদ্যুৎ উৎপাদন, রফতানি, রেমিট্যান্স, ব্যাংকঋণ এবং অন্য ধরনের আর্থিক লেনদেনে প্রতীয়মান। আমাদের অর্থনীতির এই আশাপ্রদ চিত্রের বাস্তবতায় চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দশমিক শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) যেভাবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তাতে সংস্থাটির প্রবৃদ্ধিবিষয়ক প্রাক্কলনটি মোটেই অবাস্তব অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সেটি পরিপূরণে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ বা ঝুঁকিও কম নেই। সেসব অবশ্যই রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের মাথায় রাখতে হবে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ বহিঃস্থ দুটো দিকেই আমাদের ঝুঁকি আছে। অভ্যন্তরীণভাবে নভেল করোনাভাইরাস এখনো আমাদের চারপাশে আছে। সংক্রমণের হারের সঙ্গে দিন দিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। যদিও এর মাত্রাগত ভয়াবহতা আমাদের দেশে তুলনামূলক কম। ভাইরাসটির একটি শক্তির দিক হলো, এর মিউটেশনের ক্ষমতা। খুব দ্রুততার সঙ্গে হোস্টের সঙ্গে অভিযোজিত হতে পারে। তাই এটি সহজেই আরো বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে এবং সাংঘাতিক রূপে দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিস্তার ঘটাতে পারে। সুতরাং সুরক্ষা নির্দেশনা পরিপালনে আমাদের ন্যূনতম শৈথিল্য দেখানোও সমীচীন হবে না। কেউ জানে না, কবে মহামারী শেষ হবে। কাজেই রাষ্ট্রীয়ভাবে সুপরিকল্পিত উপায়ে দীর্ঘমেয়াদি মহামারী ব্যবস্থাপনায় আমাদের জোর দিতে হবে, যাতে অর্থনীতিকে এর ভবিষ্যৎ যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অভিঘাত থেকে মুক্ত রাখা যায়।

একইভাবে বহিঃস্থ দিক থেকেও কিছু নেতিবাচক ফ্যাক্টর বিদ্যমান। বিশ্বায়ন, সুরক্ষাবাদের বর্ধন, আঞ্চলিকভাবে চীন ভারতের মধ্যকার অবনতিশীল উত্তেজনা এবং বৈশ্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন, রাশিয়া-জার্মানি, তুরস্ক-গ্রিস প্রভৃতি দেশের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মতো প্রতিকূল প্রবণতা বিরাজমান। কাজেই নতুন উদীয়মান এসব বাস্তবতার আলোকে আমাদের অর্থনৈতিক বাণিজ্য কৌশলগুলো বিন্যাস করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নিরসন করতে হবে। চলমান রফতানিমুখী উন্নয়ন মডেলে বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো রফতানি বহুমুখীকরণে ঘাটতি। শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো গতানুগতিক পণ্য রফতানিতেই মনোযোগী। বিশেষ করে প্রধান রফতানি খাত পোশাক শিল্প এখনো নিম্ন ধাপের পণ্যই রফতানি করছে। অনেক দিন ধরে অধিক মূল্য সংযোজিত উচ্চধাপের পণ্য রফতানির কথা বলা হলেও এক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য। কভিড নতুন কিছু পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববাজারে সেগুলো সরবরাহে আমাদের শিল্প খাত কীভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে, তার পথনকশা তৈরি করতে হবে। নতুন রফতানি গন্তব্যের অন্বেষণও জরুরি। চলমান মহামারী সর্বব্যাপ্ত হওয়ায় রফতানিজনিত অভিঘাত মোকাবেলার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।

কভিড-১৯ মহামারীতে কর্মসংস্থান অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মীরা চাকরিচ্যুত হয়েছেন বা হচ্ছেন। সুতরাং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কর্মসংস্থানের বিষয়টিতে অধিক দৃষ্টি দিতে হবে। অর্থনীতির বৃহদংশ অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় ছোট উদ্যোগ তথা সিএসএমই খাত হলো দেশে কর্মসংস্থানের বড় আধার। মূলত খাতেই বেশিসংখ্যক কর্মী কাজহারা হয়েছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সরকার ঘোষণা করলেও ছোট প্রণোদনার সুবিধা খুব একটা পাচ্ছে না বলে খবর মিলছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গতি আনতে হলে তাদের সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। নইলে এডিবির প্রাক্কলিত জিডিপি অর্জন কঠিন হবে বৈকি।

দিন শেষে অর্থনৈতিক উন্নয়ন চিন্তায় কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধিই চূড়ান্ত বিষয় নয়। এটি কিছু ক্ষেত্রে কাজের হলেও এর কিছু গভীরতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষত অনেক বেশি মানবকল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির মোহে আচ্ছন্ন থাকলে চলবে না। তাই বিদ্যমান উন্নয়ন চিন্তায় পরিবর্তন এনে আরো কল্যাণকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক পরিমাপক অন্বেষণ এখন সময়ের দাবি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন