বুধবার | অক্টোবর ২১, ২০২০ | ৬ কার্তিক ১৪২৭

সম্পাদকীয়

কেউ কোথাও নেই

সেলিম জাহান

টিলার ঢালু পথ বেয়ে নামতে নামতে পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম গাড়ি বারান্দার বাতি নিভিয়ে সাবের সদর দরজাটি বন্ধ করলো - দরজার একপাট লাগিয়ে অন্য পাটটি সে টেনে নিল। ঘরের ভেতরের আলো সাবেরের পেছনে পড়ায় আমার বন্ধুটিকে একটি অচেনা ছায়ামূর্তির মতো লাগছিলো তারপর দরজা বন্ধ হয়ে গেলোএবং পিচকারীর মতো কালো অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

সেই অন্ধকারে পেছনের বাড়িটিকে একটি ভূতুড়ে বাড়ির মতোই লাগছিল। টের পেলাম চারদিকের কুয়াশা আর একটু ঘন হয়ে বসেছে। শীতও লাগছে একটু। ওভারকোটের কলারটা তুলে দিয়ে, মাথার টুপিটা নামিয়ে পকেটে হাত পুরলাম। ততক্ষণে চারদিকের অন্ধকার চোখে সয়ে এসেছে। টিলার নিচেই পিচের রাস্তাটা চোখে পড়ল। ঐ পথেই ফিরতে হবে শহরে।

ধাঁধাঁটা শুরু হল টিলার নিচে নেমেই। বাঁয়ে যাবো না ডানে? যদ্দূর মনে পড়ে ডান দিক দিয়েই এসেছিলাম। তার মানেই সেদিক দিয়েই ফিরতে হবে স্টেশনে। বেশি দূরে নয়। ডানে বেশ কিছুটা গিয়ে বাঁ হাতি গলিটা ধরে মিনিট পাঁচেক হেঁটে ডানে গেলেই রেল স্টেশনটি মনে আছে। 

ডানে হাঁটা শুরু করলাম। দেখেছো কাণ্ড - না আছে ফুটপাতে কোন বাতি, না আছে পথে কোন গাড়ি। এই আধো অন্ধকারে, ভূতুড়ে পরিবেশে আমি ছাড়া কোন জন-মানব, গাড়ি-ঘোড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। কুয়াশা আবার হালকা হয়ে এসেছে একটু। ক’টা বাজল? হাতের ঘড়ির দিকে তাকালাম। কম নয়? প্রায় রাত ১১টা।

এই তো বাঁয়ের গলি পাওয়া গেলো। ‘আহ্!’, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। কিন্তু সে আরাম দীর্ঘস্থায়ী হলো না। বাঁয়ে মোড় নিতেই হকচকিয়ে গেলাম। এটা কোথা থেকে এলো? যাওয়ার সময় তো দেখি নি মনে হয়, নাকি দেখেছি? কিন্তু বাড়ীটির দিকে তাকিয়ে কি এক ঠান্ডা ভীতি যেন আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেলো। 


নিকষ কালো তিন-তলা বাড়ী। তৃতীয় তলা একদম অন্ধকার। একতলা-দোতলা বাড়ীর জানালার মাঝখান দিয়ে ঘরের কমলা রঙ্গের আলো দেখা যাচ্ছে। বাইরে থেকে দু’টো সবুজ বাতি দালানের গায়ে পড়ে কেমন যেন একটা অন্যরকমের আবহ সৃষ্টি করেছে।বাড়ীটির গায়ে একটি ফলকে লেখা ‘Rushmead’ - ওটা কি রাস্তার নাম। বাতি-টাতি জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু কোন মানুষের সাড়া নেই।

আমি আস্তে আস্তে তিন-চারটি সিঁড়ি ভেঙ্গে সদর দরজার সামনে এলাম। দরজা হাট করে খোলা। ভেতরে একটু উঁকি দিয়েই বুঝলাম যে এ’টি একটি পুরোনা শুঁড়িখানা। কাঠের দেয়ালে সাজানো নানান রঙিন পানীয়ের বোতল, ঝকঝকে গ্লাসগুলো দেখা যাচ্ছে কাচের আলমারীতে, ছাদ থেকে পাখাগুলো খুব আস্তে ঘুরছে। ঘরের পুরো ডানদিক জুড়ে কিছু দূরে দূরে টেবিল, যার প্রত্যেকটা ঘিরে চারটে করে চেয়ার। কৌচ-কেদারাও আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নানান কোনায়। ঘরের মাঝখান দিয়ে সাদা ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। কিন্তু কোন মানুষের সাড়া নেই। 

সিঁড়ি দিয়ে রাস্তার নামার জন্যে যেই পা বাড়িয়েছি, তখনই যেন মনে হল, গ্লাসের টুং টাং শব্দ শুনলাম, মৃদু পিয়ানোর আওয়াজও পাওয়া গেল বোধহয়, কারা যেন হেসেও উঠলো। আর তখনি দেখলাম, বাড়ীটির একটি দেয়ালে হালকা সাদা রেখায় একটি ক্রুশ আঁকা - যেটাকে ঘিরে নানান কারুকাজ এবং এগুলোর নিচে একজোড়া হলদে বাতি বিড়ালের চোখের মতো ছিটকে পড়ছে দেয়ালে। 

হঠাৎ প্রচন্ড ভয় পেলাম। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের আভাস, নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এলো, হাত-পা যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। চারপাশে কেমন এক আতঙ্ক যেন আমাকে ঘিরে ধরছে। সেটা মনে হতেই রাস্তা ধরে দিলাম দৌড়। পাঁচ মিনিট আর আর থামাথামি নেই, চারদিকে তাকানো নেই। যখন থামলাম, তখন রীতিমত হাঁপাচ্ছি। কাপড়-জামা ঘামে ভিজে একশা। একটু ধাতস্থ হয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, সেই কালো বাড়িটা তেমনি আছে। 

‘যাক বাবা, বাঁচা গেলো। ভৌতিক কিছু নয়। বেশ একটা চন মনে ভাব নিয়ে গুন গুন করে গান ধরলাম। এগুলাম সামনের দিকে। বাহ্, এখানে তো সুন্দর একটা বাতি আছে পথের পাশে। পুরোনো কালের গ্যাসের বাতির মতো। পাশে একটি চালাবাড়ীর চালা দেখা যাচ্ছে মনে হয়। চালা পেরিয়ে একটি Weeping Willow-এর মাথা দেখা যাচ্ছে না? 

এ সব ভাবতে ভাবতেই খেয়াল হল, চারধারে শুধু একটাই তো বাতি। রাস্তায় আরো তো পথ-বাতি থাকার কথা। নেই ক্যানো? আশ্চর্য্য! তা’হলে ঐ যে পথ-বাতিটি দেখছি রাস্তার উল্টোদিকে, সেটা কি চোখের ভ্রম? একবার মনে হল, পথ পেরিয়ে বাতির খুঁটিটি ধরে দেখি তো ঠিক কিনা! কিন্তু সাহসে কুলোল না! যদি পথ-বাতি না থাকে।

সুতরাং মনকে শান্ত করে অনেকটা চোখ বুঁজেই পথ বাতি পার হলাম। ভাবলাম। এবারসআর পেছন ফিরে তাকাবো না। কিন্তু অবাধ্য মনকে বাঁধবে কে? ফিরে তারাতেই হলো? কিন্ত, এ কি? ঘরেরে চালা আছে, উইলো গাছ আছে, কিন্তু পথ-বাতি? পথ-বাতি তো নেই। চারদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। আমি কি পাগল হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল, আমি বোধহয় পড়েই যাবো। 


কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই দেখা গেলো, সামনের Williams Station-এর আলো। দ্রুত পা চালালাম। আর এক মুহূর্ত এখানে নয়। স্টেশনে ঢুকতেই দেখি একটি ট্রেন আস্তে আস্তে ছেড়ে যাচ্ছে। কি ট্রেন, কোথায় যাচ্ছে - কিচ্ছু ভাবলাম না। এ জায়গা থেকে বেরুতেই হবে। দৌড়ে গিয়ে সামনে যা কামরা পেলাম, তাতেই উঠে গেলাম দরজার হাতল ধরে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ধপ করে জানালার পাশে বসে পড়লাম। বাইরে তাকিয়ে দেখি, মানুষতো দূরের কথা, একটি কাক পক্ষীএ নেই ত্রিতল্লাটে।আগের দেখা পথ-বাতিটা স্টেশন সামনে পোতা - আর তার আলোয় দেখা যাচ্ছে, স্টেশনের নাম Williams নয়, এ স্টেশনের নাম Kingston Station. 

আর তখনই মুঠোফোন বেজে উঠল পাশের ঘরে বার্তা আসার সংকেত জানিয়ে। ধড়মড় করে উঠে দেখি, টেবিলে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আর সামনে তিনটে ছবি - একটি ওর বাড়ীর কাছের একটি শুঁড়িখানার, একটি ওর বাড়ি থেকে দশ মিনিট দূরে স্টেশনে যাওয়ার পথে একটি পথ-বাতির আর তৃতীয়টি ওর স্টেশন Kingston এর। 

সাবের এ দুষ্টুমী প্রায়ই করে আমার সঙ্গে - অদ্ভুত জিনিসের ছবি তুলে প্রিন্ট করে আমাকে পাঠায়। গত বছর একটা কালো বেড়ালের ছবি পাঠিয়ে আমাকে বলেছিল যে, বেড়ালটি তার বাগদত্তা। তার আগে একটি গাছের ছবির নিচে লেখা ছিল, আমার সাঁই। সাবেরটা একটা পাগল! 


আমি নিজের মনেই হেসে উঠি। তারপর পাশের ঘরে যাই মুঠোফোনটি তুলে বোতাম টিপতেই দেখলাম বার্তা পাঠিয়েছে আমাদের আরেক বন্ধু ফারুক। ফোনের সবুজ পর্দায় লেখা - ‘সাবের গতরাতে চলে গেছে’। 

ড. সেলিম জাহান, একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মুখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন দু’দশক ধরে। ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা এক ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন