শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

ফিচার

ডাচদের দৈহিক গঠন রহস্য, দেড়শ বছরে গড় উচ্চতা বেড়েছে ২০ সেন্টিমিটার!

বণিক বার্তা অনলাইন

দানবের দেশ নেদারল্যান্ডস! ইউরোপের এ দেশটিতে পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা মানুষের বাস। পৃথিবীর দীর্ঘতম জাতি এরা। একজন ডাচ পুরুষের গড় উচ্চতা ৫ দশমিক ৯৮ ফুট। আর একজন ডাচ নারীর গড় উচ্চতা ৫ দশমিক ৫৩ ফুট। যেখানে বিশ্বব্যাপী পুরুষের গড় উচ্চতা ৫ দশমিক ৬১ ফুট এবং নারীর ৫ দশমিক ২৩ ফুট।

তবে ডাচরা যে জাতি হিসেবে সব সময় বেশি উচ্চতাসম্পন্ন ছিল এমন নয় । রয়্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের প্রকাশিত একটি গবেষণার জন্য ডাচ সামরিক রেকর্ডগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৮০০ এর দশকের মাঝামঝি সময়ে নেদারল্যান্ডসের পুরুষরা আসলে ইউরোপের সবচেয়ে খাটো মানুষদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

গবেষণাটির সহযোগী কানাডার লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লুইস ব্যারেট বলেছেন, ১৮৬০ সালে ডাচ সামরিক পুরুষরা প্রায় ৫ দশমিক ৪১ ফুট লম্বা ছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ তাদের থেকে প্রায় ৫ সেন্টিমিটার বেশি লম্বা ছিল। 

এরপরই ইতিহাস পাল্টে গেছে। মাত্র ১৬০ বছরে ডাচ পুরুষরা ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে গেছে, যেখানে আমেরিকানরা বেড়েছে মাত্র ৬ সেন্টিমিটার। এটাকে জিনগত প্রভাব বলার পক্ষপাতি নন ব্যারেট। তিনি বিশ্বাস করেন, এখানে প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি ভূমিকা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তার গবেষণায় দেখা গেছে, নেদারল্যান্ডসের যেসব দম্পতির সর্বাধিক সন্তান রয়েছে, তারা লম্বা পুরুষ এবং গড় উচ্চতার নারী। এদিকে সর্বাধিক সন্তান থাকা আমেরিকান দম্পতিদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা খাটো নারী এবং গড় উচ্চতার পুরুষ। 

আমেরিকানদের ছাড়িয়ে যাওয়ার আরো একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। নেদারল্যান্ডসে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, কম আয় বৈষম্য এবং চমৎকার সমাজকল্যাণ ব্যবস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যারেট যুক্ত করেছেন পরিবেশগত কারণগুলো ডাচদের উচ্চতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। 

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ও জিনগত দিক থেকে উচ্চমানের শিশু জন্মানোর বিষয়ে নেদারল্যান্ডসে সবকিছুই প্রস্তুত থাকে এবং উচ্চতা হ্রাস করে এমন ধরনের কোনো সমস্যায় তাদের পড়তে হয় না। বিরূপ পরিবেশ প্রতিবেশের কারণে প্রতিবার মানুষের শরীরের প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া উন্নতি করার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলে শরীরের অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় হয়। এভাবে শক্তির অপচয় না হলে সেটি উচ্চতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগে। 

এরপর আবার ডাচদের ডায়েটে একটি বিশেষ উপাদান রয়েছে। নেদারল্যান্ডসের মানুষজনের দুধ খাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। এই অভ্যাস তাদের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, একাধিক গবেষণায় এমন ইঙ্গিত মিলেছে। কারণ দুধে বিপুল পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে। ব্যারেট ব্যাখ্যা করেন, ক্যালসিয়াম হাড় তৈরি করে এবং উচ্চতা ক্যালসিয়ামের সুলভ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। 

‘হোয়াই দ্য ডাচ আর ডিফরেন্ট : অ্যা জার্নি ইনটু দ্য হিডেন হার্ট অব দ্য নেদারল্যান্ডস’ গ্রন্থের লেখক বেন কোটসের মতে, দুগ্ধের প্রতি ডাচদের ভালোবাসা দেশটির মানবসৃষ্ট ভূগোলের ফলাফল। কেবল সামুদ্রিক পাখির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আক্ষরিক অর্থে জলাভূমিতে নেদারল্যান্ডসের পত্তন হয়। বহু শতাব্দি ধরে জোয়ারের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে এই দেশের মানুষ। ওয়াটার-পাম্পিং উইন্ডমিল (বায়ুকল) এবং পানির নালা দিয়ে তারা সমুদ্রকে হটিয়ে দিয়েছে। বাঁধ দিয়ে অক্ষত রাখা হয়েছে উপসাগর। সমুদ্রকে জমিতে পরিণত করে ডাচরা এমন এক জাতিতে পরিণত হয়েছে, যারা উত্তাল সামুদ্রিক ঢেউকে পরাজিত করে এবং শাসন করার আত্মবিশ্বাস রাখে। ডাচদের নিয়ে একটি জনপ্রিয় উক্তি রয়েছে। বলা হয়, ‘ঈশ্বর বিশ্ব সৃষ্টি করেছের, আর ডাচরা নির্মাণ করেছে নেদারল্যান্ডস’। 

সবচেয়ে বড় একক ডাচ ল্যান্ডগ্র্যাবটি (ভূমি অধিগ্রহণ) জুয়েদারজি নির্মাণের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছিল। এটা একটি বিস্ময়কর প্রকৌশল প্রকল্প। এটার মাধ্যমে নেদারল্যান্ডসের প্রাণকেন্দ্রে আরো ১ হাজার ৬২০ বর্গকিলোমিটার জমি তৈরি হয়েছিল। বাঁধ ও ডাইকগুলোর এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯২০ সালে। ১৯৯৭ সালেও এটি সম্পন্ন না হওয়ায় অনেক ডাচ জীবদ্দশায় এটি দেখে যেতে পারেননি।

ওয়েরডেন শহরের একজন অবসরপ্রাপ্ত পনির বিজ্ঞানী মিউইস হেটেঙ্গার বলেন, রটারড্যামের উত্তর-পূর্বদিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তথাকথিত চিজ ভ্যালি। সিলটি জমির এই ভ্যালিটির মাটি শাকসবজি বা শস্য চাষের জন্য খুব অ্যাসিডিক (অম্লীয়) ছিল। তবে এটা ঘাসের জন্য খুব ভালো ছিল।

ফলস্বরূপ সমুদ্রকে পেছনে ফেলে ডাচ কৃষকরা গমের মতো ফসলের দিকে নয়, বরং গরুর দিকে ঝুঁকেছিল। গরুগুলো একসময়ের সমদ্রতলে থাকা মাটিতে জন্মানো ঘাষ খেয়ে আনন্দে চরে বেড়িয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গরুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্ধারকৃত জমিতে দেশটির দুগ্ধ শিল্প গড়ে ওঠে। এতে করে তারা বিশ্বের বৃহত্তম দুধের গ্রাহকে পরিণত হয়। দুগ্ধের সঙ্গে তাদের ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত পনির বাজারের হোস্টে পরিণত হয়। আর দুগ্ধের সঙ্গে এমন আত্মার সম্পর্কই তাদের উচ্চতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 

বিবিসি অবলম্বনে শিহাবুল ইসলাম

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন