রবিবার | অক্টোবর ২৫, ২০২০ | ১০ কার্তিক ১৪২৭

প্রথম পাতা

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখে বিপাকে আইসিবি

মেহেদী হাসান রাহাত

দেশের বেশকিছু ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) স্থায়ী আমানত রেখেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) আমানত রাখা এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশকিছু পরবর্তী সময়ে রুগ্ণ হয়ে পড়ে এবং আইসিবিকে আমানতের অর্থ এর বিপরীতে সুদ দেয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আমানতের অর্থ আদায় করতে না পেরে বিপাকে পড়ে তারল্য সংকটে থাকা আইসিবি। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন এবং কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সুদের টাকা দিতে শুরু করেছে।

আইসিবির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ হিসাব বছরে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আইসিবির স্থায়ী আমানতের পরিমাণ ছিল ৩১০ কোটি টাকা। এর পরের ২০১৫-১৬ হিসাব বছরে আমানতের পরিমাণ বেড়ে ৩১৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে এসে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আইসিবির আমানত দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯২ কোটিতে। এর পরের ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে এর পরিমাণ আরো বেড়ে ৭৮৯ কোটিতে দাঁড়ায়। তবে সর্বশেষ ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে স্থায়ী আমানতের পরিমাণ কমে ৬৬৪ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

আইসিবির তথ্যানুসারে বর্তমানে ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাদের ৬৬৪ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্থায়ী আমানত রয়েছে ফিনিক্স ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ১৫৫ কোটি টাকা। ফিনিক্স ফিন্যান্স বর্তমানে আইসিবির আমানতের বিপরীতে বকেয়া থাকা সুদের অর্থ প্রায় অনেকাংশে পরিশোধ করেছে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের কাছে। দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম দুষ্কৃতকারী পিকে হালদারের লুটপাটের কারণে দুরবস্থায় পড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিং আইসিবিকে আমানতের অর্থ কিংবা সুদ কোনোটাই দিচ্ছে না।

আরেক সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ফিন্যান্সে আইসিবির ১১৮ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে আমানত সুদের অর্থ আদায়ে আইসিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

পিকে হালদারের লুটপাটের শিকার আরেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ফিন্যান্সের কাছে আমানত সুদ বাবদ আইসিবি ৬২ কোটি টাকা পাবে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি সুদের কিছু অর্থ পরিশোধ করেছে।

ফারইস্ট ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে আইসিবির স্থায়ী আমানতের পরিমাণ প্রায় ৬২ কোটি টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে আইসিবিকে সুদের কিছু অর্থ দিয়েছে।

এফএএস ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে আইসিবির ৩৬ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিও আইসিবিকে সুদের আংশিক অর্থ পরিশোধ করেছে।

সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সে বর্তমানে ৩৩ কোটি টাকা আমানত রয়েছে আইসিবির। আমানত সুদের অর্থ আদায়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আলোচনা করছেন আইসিবির কর্মকর্তারা।

অবসায়ন প্রক্রিয়ায় থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের কাছে আইসিবির ২৫ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে কবে আমানত সুদের টাকা পাওয়া যাবে সেটি অনিশ্চিত।

বাংলাদেশ ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে (বিডি ফিন্যান্স) আইসিবির ২৩ কোটি টাকা স্থায়ী আমানত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আমানত সুদের অর্থ আদায়ে আইসিবির কর্মকর্তাদের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের কাছে স্থায়ী আমানত বাবদ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে আইসিবির। প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে সুদের অর্থ পরিশোধ করছে বলে আইসিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর আগে আমানতের অর্থ উদ্ধারে আইসিবির কর্মকর্তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর উদ্যোগে ভাটা পড়ে। তাছাড়া করোনার কারণে ঋণের কিস্তি সুদের বিষয়ে সরকার ঘোষিত নীতি শৈথিল্যের সুযোগে বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আইসিবির আমানত সুদের অর্থ পরিশোধে গড়িমসি করছে। তিন থেকে চার বছর আগে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখা হয়েছিল এবং তখন এগুলোর অবস্থা ভালো ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই রুগ্ণ হয়ে পড়ার কারণে আইসিবির আমানত সুদের অর্থ আটকে গেছে বলে জানিয়েছেন আইসিবির কর্মকর্তারা।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমানত উদ্ধার প্রক্রিয়ার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, এরই মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিছু অর্থ উদ্ধার রয়েছে। বাকি অর্থ উদ্ধারের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সমস্যাগ্রস্ত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আইসিবির আমানত রাখার বিষয়টি নিয়ে সন্তুষ্ট নয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্প্রতি বিএসইসির পক্ষ থেকে আইসিবির সংস্কার পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে পরামর্শক নিয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে, দেশের পুঁজিবাজারকে সহায়তা করাই ছিল আইসিবি গঠনের উদ্দেশ্য। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে ২০১৮-১৯ ২০১৯-২০ হিসাব বছরে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিক লোকসানে ছিল এবং মূলধন হারিয়েছে। উৎপাদন খাতে দেয়া ঋণ এবং -ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমানতের অর্থ আদায় করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়েছে। ধরনের প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেয়া এবং আমানত রাখা কোনোভাবেই পুঁজিবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে মনে করছে কমিশন।

বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, আইসিবি পিপলস লিজিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখেছে, যা কোনোভাবেই উচিত হয়নি। আমরা প্রতিষ্ঠানটিকে সংস্কার পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। পরামর্শকের প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন বিষয়ে সরকারের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে। সংস্কার পুনর্গঠনের মাধ্যমে আইসিবিকে কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলে জানান তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন