বুধবার | অক্টোবর ২১, ২০২০ | ৬ কার্তিক ১৪২৭

শেষ পাতা

ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটে অচল খাতুনগঞ্জ

ওমর ফারুক চট্টগ্রাম ব্যুরো

অস্বাভাবিক দামে পেঁয়াজ বিক্রি পণ্যের ক্রয় রসিদ না থাকার কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক জরিমানার প্রতিবাদে ধর্মঘট পালন করেছেন খাতুনগঞ্জের কাঁচাপণ্য ব্যবসায়ীরা। তাদের ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়েছে দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার। গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সব ধরনের বিকিকিনি বন্ধ রাখেন বাজারের প্রায় ২৫০ পাইকারি আড়তদার ব্যবসায়ী।

খাতুনগঞ্জের প্রবেশমুখ পীতাম্বর শাহর দোকান থেকে নতুন চাক্তাই পর্যন্ত প্রায় ২৫০টি কাঁচাপণ্যের (পেঁয়াজ, রসুন আদা) আড়ত দোকান রয়েছে। এসব আড়ত দোকানের বেশির ভাগ মূলত আমদানিকারকদের কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।

গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হামিদুল্লাহ মার্কেট, চাক্তাই, চর চাক্তাই, নতুন চাক্তাইসহ পুরো বাজারে কাঁচাপণ্যের সব আড়ত দোকান বন্ধ রয়েছে। পণ্য বোঝাই করা ট্রাকগুলোও সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পণ্য ওঠানামাও ছিল তুলনামূলক কম।

ধর্মঘট বা দোকান বন্ধ রাখার কারণ সম্পর্কে ব্যবসায়ীরা জানান, দুই দিন ধরে প্রশাসনের লোকজন তাদের অযথা হয়রানি করছে। পণ্যের দাম বেশি রাখা খরিদা স্লিপ না থাকার অজুহাতে গত দুই দিনে ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। প্রশাসনের অযথা অযৌক্তিক হয়রানির প্রতিবাদে আমরা দোকানপাট বন্ধ করে রেখেছি। গত দুই দিন খাতুনগঞ্জে কাঁচাপণ্যের দোকানগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওমর ফারুক শিরিন আক্তার।

অভিযানের বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওমর ফারুক বলেন, নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে আমরা খাতুনগঞ্জের পাইকারি দোকানগুলোতে অভিযান চালিয়েছি। আমরা অভিযোগ পেয়েছি, কেনা দামের চেয়ে অস্বাভাবিক বাড়তি দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। তাই আমরা কাঁচাপণ্যের আড়তগুলোতে ক্রয় রসিদ চেক করি। কিন্তু যেসব ব্যবসায়ী বা আড়তদার ক্রয় রসিদ দেখাতে পারেননি তাদের জরিমানা করা হয়। কারণ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দাম নির্ধারণ পণ্য বিক্রি আইনগতভাবে বৈধ নয়। আমাদের মনিটরিং অব্যাহত থাকবে।

ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, গত রোববার বাজারের মেসার্স গ্রামীণ বাণিজ্যালয়কে হাজার টাকা, গোপাল বাণিজ্যালয়কে ১০ হাজার, মোহাম্মদিয়াকে ১০ হাজার, শাহাদত বাণিজ্যালয়কে হাজার, অসিউদ্দিনকে ১০ হাজার, বরকত ভাণ্ডারকে ১০ হাজার সেকান্দার অ্যান্ড সন্সকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগের দিন শনিবার মেসার্স মহিন ট্রেডার্স মেহের ট্রেডার্সকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব প্রতিষ্ঠানে জরিমানা করার মূল অভিযোগ ছিল খরিদা স্লিপ দেখাতে না পারা ক্রয়মূল্যের চেয়ে অস্বাভাবিক দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগ।

খাতুনগঞ্জের কাঁচাপণ্য ব্যবসায়ী মেসার্স গোপাল বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী বলয় কুমার পোদ্দার বণিক বার্তাকে বলেন, গতকাল আমার দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে আমার কাছে পণ্যের খরিদা স্লিপ খোঁজেন। আমরা যেহেতু কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করি, বিভিন্ন বন্দরের ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছে পণ্য বিক্রির জন্য পাঠিয়ে দেন। ফলে আমাদের কাছে খরিদা স্লিপ নয়, পণ্যের চালান থাকে। আমদানিকারকরা আমাদের ফোনে নির্দিষ্ট দামে পণ্য বিক্রি করতে মোবাইলে জানিয়ে দেন। ফলে আমাদের কাছে কোনো খরিদা স্লিপ থাকে না। কিন্তু প্রশাসনের লোকজন আমাদের কোনো বক্তব্য আমলে না নিয়ে জরিমানা করেন।

গত রোববার খাতুনগঞ্জ বাজারে ভারতীয় নাসিক জাতের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩৮ টাকা দরে, যা সপ্তাহের প্রথম দিন শনিবার ৪০-৪২ টাকা দরে বিক্রি হয়। একই সময় দেশী পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৪২ টাকা দরে। বর্তমানে ভারতীয় শুধু নাসিক পেঁয়াজই বাজারে আছে। সময় ভারতীয় সাউথ জাতের পেঁয়াজ বাজারে আসার কথা থাকলেও বন্যায় ফসলহানির কারণে এবার সাউথ জাতের পেঁয়াজ বাজারে আসেনি। ফলে ভারতীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। 

বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে পেঁয়াজ আমদানিকারক মোজাফ্ফর রহমান জানান, ভারতীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বেনাপোল, ভোমরা হিলি স্থলবন্দরে তিন-চারদিন ধরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৩৮ টাকায়। পেঁয়াজ কিনে আমরা চট্টগ্রামের বাজার খাতুনগঞ্জে পৌঁছাই। ফলে চট্টগ্রামের বাজারে ৩৭-৩৮ টাকার নিচে পেঁয়াজ বিক্রি করার কথা না।

হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক ফোরকান আহমেদ বলেন, আমরা সীমান্ত বাজারগুলো থেকে পেঁয়াজ কিনে চট্টগ্রামে পৌঁছাই। এতে প্রতি কেজিতে টাকা খরচ যোগ হয়। ফলে সময় খাতুনগঞ্জে ৩৮ টাকার কম দামে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি সম্ভব নয়। কারণ নাসিক জাতের পেঁয়াজ সীমান্তের বাজারে ৩৬ টাকা দামে কিনতে হয়েছে।

খাতুনগঞ্জের কাঁচাপণ্য ব্যবসায়ী তথা হামিদুল্লাহ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিচ বলেন, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ তথা বৃহত্তর খাতুনগঞ্জ মিলে প্রায় ২৫০ কাঁচাপণ্যের দোকান আড়ত রয়েছে। এর মধ্যে ৫০টির মতো দোকান বাজার থেকে পণ্য কিনে বিক্রি করে। বাকি প্রায় ২০০ দোকান আমদানিকারকদের এজেন্ট হিসেবে পণ্য বিক্রি করে। কিন্তু প্রত্যেকবার যখনই কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখনই আড়তদার তথা এজেন্টদের ওপর জরিমানা আরোপ করা হয়। আমদানিকারকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি চীনা আদা বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকা দামে, যা দুই সপ্তাহ আগে ১২০-১৫০ টাকা দামে বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি চীনা রসুন বিক্রি হচ্ছে ৫০-৭০ টাকা দামে, যা দুই সপ্তাহ আগে ৪৫-৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে।

আদা-রসুন আমদানিকারকরা জানান, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে আদা-রসুনের দাম অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু সত্য হলো বর্তমানে বাজারে যেসব আদা ১৮০-২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তা প্রায় একই দামে কিনতে হয়েছে। ৫০-৭০ টাকা দামে বিক্রি হওয়া রসুন কিনতে হয়েছে ৫০-৫৫ টাকার মধ্যে। সেই হিসেবে বরং কেনা দামেই বিক্রি হচ্ছে এসব কাঁচাপণ্য।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার কেজি। একই সময়ে রসুন আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৭৯ হাজার কেজি আদা আমদানি হয়েছে কোটি ৮৪ লাখ ৮৩ হাজার কেজি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন