সোমবার | এপ্রিল ১৯, ২০২১ | ৫ বৈশাখ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

ফিরে দেখা

সাম্য ও সম্প্রীতির রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

ড. মো. রুহুল আমীন

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং ৩০ লাখ প্রাণের আত্মত্যাগ দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ অর্জন করে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। কিন্তু অর্জিত বিজয়ে বাঙালি পায়নি আনন্দ-উল্লাস। কারণ স্বাধীন ভূখণ্ডে নেই বঙ্গবন্ধু। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতা হারানো বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের আরাধনার স্বপ্ন, তাদের অবিসংবাদিত নেতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সেদিন তারা কাছে পায়নি। মুক্ত বিজয়ী বাঙালি তখনো উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায়কখন ফিরবে তাদের নেতা। কখন তারা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্থপতিকে অভিবাদন জানাবে। কখন থেকে তারা নেতার দর্শন নির্দেশনায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করবে।

বঙ্গবন্ধু মার্চ, ১৯৭১ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তত্কালীন রেসকোর্স ময়দান) কাব্যিক অমর বাণীতে স্বাধীনতা পাগল বাঙালি জাতিকে বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি, আরো দেব, দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এই উন্মুক্ত স্বাধীনতার ডাকে বাঙালির দামাল সন্তানরা উন্মুখ হয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনীকে বিতাড়িত করতে। ওইদিন বঙ্গবন্ধু দেশের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়, ঘরে-ঘরে দুর্গ গড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে নির্দেশনায় দেশের সব বাঙালি চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে বাঙালি জাতিকে নির্মূল করতে বর্বর গণহত্যায় মেতে উঠলে বঙ্গবন্ধু তার ধানমন্ডির বাড়ি থেকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে দেশবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। স্বাধীনতা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানে। বাঙালি বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের মিলাওয়ালি সেন্ট্রাল জেলে। এরপর তাঁকে বন্দি রাখা হয় সিহালা রেস্ট হাউজে।

অবশেষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বেলা ৩টা। টানা ২৯২ দিন পাকিস্তানে কারান্তরীণ থেকে মুক্ত হয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালিকে দেখিয়েছেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখিয়েছেন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মাঝে সাম্য সম্প্রীতির বন্ধনের। দেখিয়েছেন উন্নত, সমৃদ্ধ সৌহার্দের বাংলাদেশের অবয়ব। তাই তাঁর ডাকে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, মেহনতি পেশাজীবী মানুষ এক মঞ্চে এসে একীভূত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিজয়ী বাঙালির মাঝে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন, হানাদার বাহিনী আমার দেশকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। আমার মানুষ আজ অসহায়, তারা না খেয়ে আছে। আপনারা আমাদের মানুষদের সাহায্য করুন।

বঙ্গবন্ধু প্রিয় দেশবাসীকে শান্ত, সুশৃঙ্খল ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলেন, দেশে শান্তি সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। আপনারা শান্ত থাকুন, ধৈর্য ধারণ করুন। যারা অন্যায় করেছে, যারা নারী ধর্ষণ, লুটতরাজ খুন-খারাবি করেছে, আমরা তাদের বিচার করব। তিনি বলেন, পাকিস্তানি ৯৫ হাজার সৈন্য আমাদের হাতে বন্দি। তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধ অপরাধে জড়িত, পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে তাদের বিচার করা হবে। কারো ওপর অন্যায় করা হবে না। তিনি আরো বলেন, আমার সোনার বাংলার মূল কথা হলো, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই

সাম্য সম্প্রীতির বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রকৃতি সম্পর্কে ওইদিন বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ। ইন্দোনেশিয়ার পরেই এর স্থান। আমি স্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিতে চাই যে আমার দেশ হবে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক দেশ। দেশের কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই সুখে সৌহার্দের বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে, শান্তিতে থাকবে।

একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে তার সংবিধানে। তাই সাম্য সম্প্রীতির বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু কালবিলম্ব না করে সংবিধান প্রণয়নকে অগ্রাধিকার দিলেন। তিনি ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারির মাধ্যমে ১২ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অতঃপর, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, যদিও আমরা ত্রাণ পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জরুরি কাজে নিয়োজিত আছি, তবুও আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের খসড়া সংবিধান গণপরিষদে পেশ করার জন্য গণপরিষদের অধিবেশন আহ্বানের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রয়োজনের চেয়ে এক মুহূর্তও বিলম্ব করব না।

বাংলাদেশকে বিশ্বে সম্প্রীতির আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের জনসভায় বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বলেন, আমরা কারো সাথে শত্রুতা চাই না, আপনারা আমাদের স্বীকৃতি দিন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ বাস্তব সত্য। সত্য অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়। আমরা জোটনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি। আমরা শান্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি।

বঙ্গবন্ধুর সরকার মাত্র ১১ মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালের নভেম্বর বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান দেশবাসীকে উপহার দিলেন। এই সংবিধানে উল্লেখ করা হয়, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা জাতীয়তাবাদ চারটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ন্যায় আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য নয়টি বিভাগ এবং ১৫৩টি অনুচ্ছেদ লিপিবদ্ধ করা হয় সংবিধানে

বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভ এবং সরকারের প্রতিটি অঙ্গের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে উদ্যোগ নেন। গৃহীত প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নে নিলেন দ্রুত পদক্ষেপ। তিনি স্বল্পতম সময়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থী দেশে ফিরিয়ে আনেন। বাংলাদেশী ধাতব মুদ্রা টাকার প্রচলন করেন। তার গতিশীল নেতৃত্ব দিকনির্দেশনায় গড়ে তোলা হয় প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী বিডিআর। সেনা, বিমান নৌবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় তিনি দক্ষ কৌশলী সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি গুরুত্ব দেন। এজন্য তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য সামরিক একাডেমি স্থাপন করেন।

জনকল্যাণকর রাষ্ট্র বিনির্মাণে কার্যকর প্রাশাসন অত্যাবশ্যক। বঙ্গবন্ধু প্রশাসন পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ সচিবালয়। তিনি প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ করে বিভিন্ন বিভাগ দপ্তর গঠন করেন। সরকারের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনা এবং বিস্তৃত করে অধিকতর জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করেন তিনি। প্রশাসনে মেধাবী জনবল নিয়োগের জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন গঠন করেন। সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান বজায় রেখে তাদের জন্য একটি কার্যকর বেতন কাঠামো তৈরির জন্য তিনি জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করেন।

বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। সোভিয়েত নৌবাহিনীর সাহায্যে চট্টগ্রাম মোংলা বন্দর মাইনমুক্ত এবং সচল করেন। তার গতিশীল অগ্রসরমাণ নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিমানের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৪ সালের মধ্যে ঢাকা-আরিচা সড়কের মধ্যে তিনটি সেতুর নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। আরিচা-নগরবাড়ী রুটে নিয়মিত ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। বিধ্বস্ত ভৈরব পাকশী সেতুর মেরামত সম্পন্ন করে রেল যোগাযোগ চালু করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানিমুক্ত সম্প্রীতির দেশ গড়ার জন্য দরকার শিক্ষিত দক্ষ জনগোষ্ঠী। তাই তিনি শিক্ষাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণ করেন। শিক্ষিত জাতি গঠনের লক্ষ্যে তিনি প্রারম্ভিক সূচনায় দেশের ১১ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। তিনি আরো ২৬ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন বঙ্গবন্ধু। তিনি দৃঢ়ভাবে অনুভব করতেন যে ক্ষুধা দারিদ্র্য মানুষের স্বভাব-চরিত্র হনন করে, মানুষকে বিপথগামী এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ করে। অভিশাপ থেকে মুক্তির বার্তা হিসেবে তিনি সদ্য স্বাধীন দেশে উচ্চফলনশীল বীজ, সার, কীটনাশক এবং সেচের পানি ব্যবহারের মাধ্যমে দানাদার ফসল, ডাল তেল ফসল, সবজি ফল উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সবুজ বিপ্লবের জনক শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কৃষিবিজ্ঞানী . নরম্যান আর্নেস্ট বোরলগের মতাদর্শ বাস্তবায়নে দেশে সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। বিপ্লব কার্যকর করতে তিনি দেশে কৃষি গবেষণা উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্প্রসারণের কার্যক্রম জোরদার করেন। প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, হর্টিকালচার বোর্ড, বাংলাদেশ চিনি খাদ্য শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। তিনি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন গঠন করে কৃষকদের বিনা মূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক সেচযন্ত্র সরবরাহ এবং ব্যবস্থাপনা চালু করেন। বঙ্গবন্ধু খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের হূদয়ের স্পন্দন অনুভব করেছিলেন। তাই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সবুজ বিপ্লব বাস্তবায়নে দরকার মেধাবী দক্ষ কারিগর। আর এজন্য তিনি কৃষিশিক্ষায় মেধাবীদের আকর্ষণ করার অভিপ্রায় নিয়ে ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কৃষি পেশাকে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত করেন।

অভ্যন্তরীণ শান্তি নিরাপত্তা হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে সাম্যের অনুসঙ্গ। দীর্ঘ ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং পাকিস্তানিদের ২৪ বছরের জুলুম, অত্যাচার নির্যাতনের শিকার ছিল দেশের মানুষ। তাদের অত্যাচার নির্যাতন, মাতৃভাষা সংস্কৃতির ওপর আঘাতের ফলে দেশের কোমল মেধাবী তরুণরা শিক্ষা, ক্রীড়া সংস্কৃতিচর্চায় বাধাগ্রস্ত ছিল। মেধাবী তরুণদের তারা ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার বিপথগামী করার চেষ্টায় ছিল লিপ্ত। বঙ্গবন্ধু পথহারা শিশু-কিশোরদের মূল সে াতধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য গড়ে তোলেন শিশু-কিশোর সংশোধনী কেন্দ্র। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন নতুন প্রজন্ম যেন হাজার বছরের লালিত বাঙালি সংস্কৃতি লালন করে, তাদের রক্তে যেন অনুরণিত হয় অলি-আউলিয়ার বাংলাদেশ, শহীদ-গাজীর বাংলাদেশ। তাদের কণ্ঠে যেন ধ্বনিত হয়বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের যে তার নেই কো শেষ, বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু বলতেন, দেশের প্রতিটি নাগরিক স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে এবং অন্যের ধর্ম পালনে উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগাবে। তার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল—‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার তিনি শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন শিশু একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি এবং গঠন করেন মহিলা শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বঙ্গবন্ধুর সাংস্কৃতিক দর্শন ছিলগ্রামের বৃদ্ধ নওজোয়ান, হিন্দু-মুসলমান, মিলিয়া গাইবে মুর্শিদী আর বাউলা গান। একই সঙ্গে মসজিদে আজান, মন্দিরে শঙ্খ ধ্বনিত হবে। বঙ্গবন্ধু বিশ্বের মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমাবেশ বিশ্ব ইজতেমার জন্য টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে জমি বরাদ্দ করেন।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিকক প্রজ্ঞা দূরদর্শিতার ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হয়। তিনি ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র হাজার ৩১১ দিন অর্থাৎ বছর মাস দিন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। এই স্বল্প সময়ে ১০৪টি রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। দেশে প্রায় ৫০ জন ভিভিআইপিসহ শতাধিক প্রতিনিধির আগমন ঘটে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ৭০টিরও বেশি চুক্তি এবং স্মারকলিপি স্বাক্ষরিত হয়। বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র ভারত আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী তাদের ৯৩ হাজার সৈন্য ১৯৭২ সালের মার্চে প্রত্যাহার করে নেয়। তারপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফর করেন। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি নামে খ্যাত।

বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ নেতৃত্ব ও দ্রুততম সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ দেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চরম বিরোধী এ দেশটি ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল আমাদের দেশকে স্বীকৃতি দেয়।

কোনো দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৈত্রী ও সম্প্রীতি বজায় রাখার পূর্বশর্ত হচ্ছে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিত্সা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনমানের উন্নয়ন। এজন্য প্রয়োজন আর্থিক সংস্থান এবং অর্থ লগ্নিকারী সংস্থার সঙ্গে গভীর যোগসূত্র। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের স্বায়ত্তশাসিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সদস্যপদ লাভ করে।

বৃহত্ রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভের পর জাতিসংঘের মহাসচিব কুর্টওয়ার্ল্ড হেইম বাংলাদেশ সফর করেন ১৯৭৩ সালের ৯ জানুয়ারি। বিশ্ব শান্তি পরিষদ ১৯৭৩ সালের ২৩ মে বিশ্ব শান্তির প্রতীক হওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক প্রদান করে। একই বছর অর্থাত্ ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্যপদ লাভ করে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজেরিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের চতুর্থ সম্মেলনে যোগদান করেন এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলনে যোগদান করে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের স্বীকৃতি সেই সঙ্গে ওআইসি এবং জাতিসংঘ ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে বাংলাদেশের সদস্যপদ নিশ্চিত করেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের স্বীকৃতি, ২৩ ফেব্রুয়ারি ওআইসির সদস্যপদ এবং ১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়কত্বের আরেকটি ঐতিহাসিক সাফল্য হলো, ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ১৩তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ সারা বিশ্বের অধিকারবঞ্চিত ও নিপীড়িতদের জন্য ন্যায়সংগত অধিকার, বিশ্ব শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতি সাহসী বক্তব্য ও সাহসী পদক্ষেপ ছিল। 

বঙ্গবন্ধু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে ভ্রমণ করে বাংলাদেশের জন্য মানবীয় ও উন্নয়নকল্পের জন্য সহযোগিতা চান। বঙ্গবন্ধু তাঁর শাসনকালে সাবেক সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্স কোসিগিন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো, আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হৌরি বোমেডিয়েন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, জাতিসংঘের মহাসচিব কুর্টওয়াল্ডহেইম, যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রপতি মার্শাল টিটো, ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ, জাপানের প্রধানমন্ত্রী কাকুয়ে তাকানা ও সৌদি বাদশাহ ফয়সালের সঙ্গে সাক্ষাত্ ও বৈঠক করেন।

বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর গৌরবময় ভূমিকার জন্য বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিরা তাঁকে বিভিন্ন অভিধায় আখ্যায়িত করেন। মিসরীয় বিশিষ্ট সাংবাদিক হাসনাইন বলেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান একমাত্র বাংলাদেশের নন, তিনি বাঙালিদের নায়ক এবং সমস্ত বাঙালির কাছে আশ্রয়দাতা।’ প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক সিরিল ভান বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে একমাত্র নেতা; যিনি রক্ত, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি এবং জন্মের দিক থেকে একজন পূর্ণ রক্তাক্ত বাঙালি।’ ভারতের সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় অহিংস গান্ধীবাদী নেতা বলে আখ্যায়িত করেন। কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৭৩ সালের জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বকে হিমালয় পর্বতমালার সঙ্গে তুলনা করেন। ব্রিটিশ মানবতাবদী আন্দোলনের নেতা লর্ড ফেনার ব্রোকওয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থপতি জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতীয় যুক্তরাজ্যের জনক মহাত্মা গান্ধী, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা ডি ভ্যালেরার চেয়ে মহান নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। ২০০৩ সালের ফ্রন্টলাইন সাময়িকীর একটি প্রবন্ধে লেখক ডেভিড লুভেন বঙ্গবন্ধুকে একজন ‘ফরগটেন হিরো’ বা বিস্মিত বীর বলে উল্লেখ করেন। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৯ সালের ১৬ আগস্ট জাতিসংঘ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববন্ধু (ফ্রেন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড) হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। 

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুর সাফল্য ও বিশ্বে বাঙালির উত্থানকে মেনে নিতে পারেনি। দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। সামরিক বাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী ও বিপথগামী সৈনিক ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা হত্যা করেছিল বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে, তারা হত্যা করেছিল সাম্য ও সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শারীরিকভাবে আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তিনি অমর ও অক্ষয় প্রতিটি বাঙালির হূদয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে, সাম্য ও সম্প্রীতির সোনার বাংলা বিনির্মাণে তাঁর নাম উজ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্তিমান। তাঁর দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও সঠিক নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং বাঙালি জাতির পিতা, বাংলাদেশের স্থপতি এবং আধুনিক, উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা।

 

. মো. রুহুল আমীন: অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যলয়, গাজীপুর

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন