বুধবার | নভেম্বর ২৫, ২০২০ | ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

সেরা ব্যাংক-২০১৯

ইবিএল ডাচ্-বাংলা ব্র্যাক ব্যাংকই শীর্ষে

হাছান আদনান ও মেহেদী হাসান রাহাত

২০১৯ সালজুড়ে নয়-ছয়ের ডামাডোল ছিল দেশের ব্যাংকিং খাতে। ছিল নজিরবিহীন তারল্য সংকটও। এছাড়া বেসরকারি খাতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি, খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, সুশাসনের ঘাটতি ছোট-বড় ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় বছরজুড়েই আলোচনা-সমালোচনায় মুখর ছিল ব্যাংকিং খাত। বহুমাত্রিক এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ভালো করছে বেশকিছু ব্যাংক। আবার কিছু ভালো ব্যাংক যাচ্ছে ক্রমে খারাপের দিকে।

দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো নিয়ে ২০১৩ সাল থেকেই প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে র‍্যাংকিং করে আসছে বণিক বার্তা। ২০১৯ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অষ্টম র‍্যাংকিং তৈরি করা হয়েছে এবার। লংকাবাংলা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের রিসার্চ টিমের সহায়তায় প্রস্তুত করা র‍্যাংকিংয়ে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে শীর্ষে থাকা ব্যাংকগুলোর স্কোর কমেছে, আবার স্কোর বেড়েছে নিচের দিকে থাকা বেশকিছু ব্যাংকের। সব মিলিয়ে সাতটি সূচক বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করা র‍্যাংকিংয়ে ৭০ স্কোরের মধ্যে ৩০-এর বেশি পেয়েছে মাত্র দুটি ব্যাংক। স্কোরের দীনতা দেশের ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একটি ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে বৈশ্বিক কিছু মানদণ্ড রয়েছে। এগুলো হচ্ছে সম্পদের বিপরীতে আয় (রিটার্ন অন অ্যাসেট বা আরওএ), শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানার বিপরীতে আয় (রিটার্ন অন ইকুইটি বা আরওই), শ্রেণীকৃত ঋণ (এনপিএল) অনুপাত, কর-পরবর্তী নিট মুনাফা, শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস), মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (ক্যাপিটাল অ্যাডেকোয়েসি রেশিও বা সিএআর) শাখাপ্রতি পরিচালন মুনাফা (ওপিবি) আগের বছরগুলোয় শেয়ারপ্রতি আয়কে (ইপিএস) সেরা ব্যাংক নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্যতম নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে ২০১৯ সালের সেরা ব্যাংক নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্দেশক হিসেবে ইপিএসের পরিবর্তে কর-পরবর্তী নিট মুনাফাকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। মূলত স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করার কারণে ব্যাংকের নিট মুনাফায় হেরফের না হলেও ইপিএস কমে যায়। কারণে এবার ইপিএসের পরিবর্তে নিট মুনাফাকে হিসাব করা হয়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের ২০১৯ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাত নির্দেশকের ভিত্তিতে তৈরি করা র‍্যাংকিংয়ে প্রথম, দ্বিতীয় তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল), ডাচ্-বাংলা ব্র্যাক ব্র্যাংক। এর আগের দুই বছরের র‍্যাংকিংয়েও তিনটি ব্যাংক শীর্ষ তিনে ছিল। নিট মুনাফা এনএভিপিএস-বহির্ভূত তালিকায় ২০১৯ সালে শীর্ষ তিনের মধ্যে রয়েছে ইবিএল, ডাচ্-বাংলা প্রিমিয়ার ব্যাংক।

২০১৯ সালের সেরা ব্যাংকের সার্বিক তালিকায় শীর্ষ দশে জায়গা করে নেয়া অন্য ব্যাংকগুলো হচ্ছে প্রিমিয়ার, ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ট্রাস্ট ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড। অন্যদিকে নিট মুনাফা এনএভিপিএস বাদে করা র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষ দশে থাকা বাকি ব্যাংকগুলো যথাক্রমে ব্যাংক এশিয়া, ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।

দুই বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে স্কোর বেড়েছে ১৬টি ব্যাংকের। একই সময়ে ১৩টি ব্যাংকের স্কোর কমেছে। অপরিবর্তিত ছিল একটি ব্যাংকের স্কোর। ২০১৯ সালে স্কোর বেড়েছে এমন ১৬টি ব্যাংক হলো ইবিএল, প্রিমিয়ার, ব্যাংক এশিয়া, ট্রাস্ট, সিটি, যমুনা, ঢাকা, ইউসিবি, এনসিসি, শাহজালাল ইসলামী, এক্সিম, আইএফআইসি, উত্তরা, ফার্স্ট সিকিউরিটি, স্ট্যান্ডার্ড এবি ব্যাংক। অন্যদিকে স্কোর কমে যাওয়া ব্যাংকগুলো হলো ডাচ্-বাংলা, ব্র্যাক, ইসলামী, সাউথইস্টমার্কেন্টাইল, আল-আরাফাহ্, প্রাইম, এনবিএল, এমটিবি, পূবালী, ওয়ান, এসআইবিএল রূপালী ব্যাংক। আর স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে র‍্যাংকিংয়ের একেবারে তলানিতে থাকা আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের।

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ শাখাপ্রতি পরিচালন মুনাফার টেবিলে শীর্ষস্থান ধরে রেখে এবার সার্বিক টেবিলে এক নম্বরে উঠে এসেছে ২০১৮ সালে তিন নম্বরে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির সার্বিক স্কোর ২০১৮ সালের ৩২ দশমিক ১৯ থেকে এবার ৩৫ দশমিক ২৫- উন্নীত হয়েছে। একইভাবে নিট মুনাফা এনএভিপিএস বাদ দিয়ে করা র‍্যাংকিংয়ে ৫০-এর স্কেলে ২০১৮ সালের ২৫ দশমিক ৯২ থেকে এবার স্কোর বেড়ে ২৮ দশমিক শূন্য পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। ২০১৮ সালের মতোই এবার ব্যাংকটি ৫০-এর স্কেলে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

২০১৮ সালে শীর্ষে থাকা ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এবার দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে গেছে। এবার ব্যাংকটি এনএভিপিএসে শীর্ষে অবস্থান করছে। তাছাড়া আরওইতে দ্বিতীয় এবং নিট মুনাফায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। ২০১৮ সালে ব্যাংকটি আরওই এনএভিপিএসে প্রথম এবং আরওএতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ৭০ স্কেলে ২০১৯ সালে ব্যাংকটির প্রাপ্ত স্কোর এর আগেরবারের তুলনায় কমে গেছে। এবার ব্যাংকটি ৩৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ স্কোর অর্জন করেছে, যেখানে এর আগের বছর স্কোর ছিল ৩৭ দশমিক ৪৯। এদিকে নিট মুনাফা এনএভিপিএস বাদ দিয়ে ৫০ স্কেলে করা স্কোরিংয়েও ব্যাংকটির প্রাপ্ত স্কোর ২৩ দশমিক ২৯ থেকে ২৩ দশমিক ৯১- উন্নীত হয়েছে, যার সুবাদে ৫০ স্কেলের র‍্যাংকিংয়ে থেকে এবার নম্বরে উঠে এসেছে ব্যাংকটি।

স্কোর আগের বছরের চেয়ে কমে যাওয়ার কারণে সেরা ব্যাংকের তালিকায় দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে বাজার মূলধনে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির সার্বিক স্কোর ৩৪ দশমিক শূন্য থেকে ২৯ দশমিক ৪০- নেমে এসেছে। পাঁচ নির্দেশকে স্কোর ২৫ দশমিক ১৩ থেকে ২১ দশমিক ৫৩-তে নেমে আসায় ৫০ স্কেলের র‍্যাংকিংয়ে দ্বিতীয় থেকে নম্বরে নেমে গেছে ব্র্যাক ব্যাংক। গত বছর ব্যাংকটি আরওএ চ্যাম্পিয়ন হলেও এবার তারা নম্বরে নেমে গেছে।

ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান . আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিদায়ী বছরে আমরা ব্যাংকের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছি। এজন্য ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা কিছুটা কমেছে। এর প্রভাবই ব্যাংকের অন্যসব সূচকে পড়েছে। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগকে আমরা ব্যয় হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ হিসেবে দেখছি। বিনিয়োগের সুফল আমরা সহসা পেতে শুরু করব। ব্র্যাক ব্যাংকের সামাজিক দায়দায়িত্ব রয়েছে। এজন্য আমরা শুধুই মুনাফার পেছনে ছুটতে চাই না।

তিন বছর ধরে র‍্যাংকিংয়ে ধারাবাহিক উন্নয়ন করেছে প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড। ২০১৭ সালে র‍্যাংকিংয়ে ব্যাংকটির অবস্থান ছিল ১৫। প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করায় ২০১৮ সালে সার্বিক র‍্যাংকিং তালিকায় নম্বরে উঠে এসেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এবার আরো এক ধাপ এগিয়ে র‍্যাংকিংয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংক স্থান পেয়েছে শীর্ষ -এ। আবার ৫০ স্কেলের র‍্যাংকিংয়ে থেকে নম্বরে উঠে এসেছে ব্যাংকটি। র‍্যাংকিংয়ের পাশাপাশি প্রাপ্ত নম্বরেও উন্নতি করেছে প্রিমিয়ার ব্যাংক। ৭০- তাদের স্কোর ২৬ দশমিক ২১ থেকে ২৮ দশমিক ৮৬ এবং ৫০ স্কেলে ২২ দশমিক শূন্য থেকে ২৩ দশমিক ৪৯- উন্নীত হয়েছে।

দেশের শীর্ষ চার ব্যাংকের মধ্যে স্থান করে নেয়াকে গৌরবের বলে জানান প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম রিয়াজুল করিম। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে আমরা গণমানুষের ব্যাংক হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। চেষ্টায় আমরা শতভাগ সফল। ব্যাংকের প্রতিটি সূচকে উন্নতি হয়েছে। উদ্বৃত্ত তারল্য দিয়ে আমরা প্রায় হাজার কোটি টাকার সরকারি বিল-বন্ড কিনেছি। এর মাধ্যমে ব্যাংকের ভিত আরো মজবুত হয়েছে।

এম রিয়াজুল করিম জানান, প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান পরিচালনা পর্ষদের সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা আমাদের সমৃদ্ধির পথে চলতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড কমিয়ে এনেছি। বড় ঋণ থেকে বেরিয়ে এসএমই রিটেইল ব্যাংকিংয়ে জোর দেয়া হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রিমিয়ার ব্যাংক ছড়িয়ে পড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে ব্যাংককে ঢেলে সাজানো হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংক যে ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে, তাতে আগামীর পথ চলা আরো উজ্জ্বল হবে।

আকারের দিক থেকে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যাংক হলো ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির দায় ইকুইটির পরিমাণ ছাড়িয়েছে লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। তবে বিদায়ী বছরে র‍্যাংকিংয়ে এক ধাপ পিছিয়েছে ব্যাংকটি। একই সঙ্গে ব্যাংকটির প্রাপ্ত নম্বরও কিছুটা কমেছে। মূলত আরওএ, আরওই এবং সিএআরের দিক থেকে পিছিয়ে থাকায় ইসলামী ব্যাংকের র‍্যাংকিং অবনমন হয়েছে। ২০১৮ সালে ব্যাংকটির সার্বিক র‍্যাংকিং ছিল ৪। এবার এক ধাপ পিছিয়ে ইসলামী ব্যাংক নম্বরে নেমেছে। তবে নিট মুনাফার দিক থেকে ব্যাংকটির অবস্থান সবার শীর্ষে। এনপিএলের হারে তৃতীয় এবং এনএভিপিএসের দিক থেকে চতুর্থ অবস্থানে আছে ইসলামী ব্যাংক। সব মিলিয়ে সার্বিক সূচকে ইসলামী ব্যাংক নম্বর পেয়েছে ২৮ দশমিক ৭৪, ২০১৮ সালে মোট ২৯ দশমিক ৬৩ নম্বর পেয়েছিল ব্যাংকটি। এনএভিপিএস নিট মুনাফা বাদ দিয়ে করা র‍্যাংকিংয়ে ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান নবম থেকে দশম স্থানে নেমেছে। ৫০ স্কেলে ব্যাংকটির স্কোর ১৯ দশমিক ৫৭।

ইসলামী ব্যাংক বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার ব্যাংকের একটি বলে জানান মো. মাহবুব-উল-আলম, যিনি দেশের বৃহৎ ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে রয়েছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অন্য কোনো ব্যাংক গণনায়ই আসেনি। এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ব্যাংকিংকে ব্যবসা হিসেবে না দেখে আমরা মানব সেবা হিসেবে দেখি। এজন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলামী ব্যাংকের সেবা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সম্পদের আকার বড় হওয়ায় আমাদের সিএআরের আকারও অনেক বড়। আমরা ব্যাসেল- অনুযায়ী পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ করতে পেরেছি। গত এক মাসে ইসলামী ব্যাংকে প্রায় হাজার কোটি টাকার আমানত বেড়েছে। গ্রাহকদের আস্থা বিশ্বাসের কারণেই আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ভবিষ্যতে ইসলামী ব্যাংক আরো ভালো করবে।

র‍্যাংকিং টেবিলে ধারাবাহিক উন্নতি করছে ব্যাংক এশিয়া। ২০১৬ সালে সাত নির্দেশকে ২১ দশমিক ৫৩ স্কোর নিয়ে ব্যাংকটি ছিল ১৯ নম্বরে। ২০১৭ সালে ২৪ দশমিক ৫৯ স্কোর নিয়ে তারা উঠে আসে ১০ নম্বরে। এরপর ২০১৮ সালে ব্যাংক এশিয়া র‍্যাংকিংয়ে সপ্তম স্থানে উঠে আসে। আর বিদায়ী বছরে ব্যাংকটি স্থান করে নিয়েছে শীর্ষ -এ। আর ৫০ স্কেলের র‍্যাংকিংয়ে ব্যাংক এশিয়া চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। সিএআর সূচকে ব্যাংকটির অবস্থান দেশসেরা। আর শাখাপ্রতি আয়ের দিক থেকে ব্যাংক এশিয়ার অবস্থান দ্বিতীয়। সব মিলিয়ে সাতটি সূচকে ব্যাংক এশিয়া পেয়েছে ২৬ দশমিক ৩২ নম্বর। ৫০ স্কেলে ব্যাংকটির স্কোর ২২ দশমিক ২৫। ২০১৮ সালে দুটি স্কেলে ব্যাংক এশিয়ার প্রাপ্ত নম্বর ছিল যথাক্রমে ২৫ দশমিক ৪৮ ২১ দশমিক ১৬।

ব্যাংক এশিয়ার শীর্ষ নির্বাহী মো. আরফান আলী বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই ব্যাংক এশিয়া ধারাবাহিক উন্নতি করেছে। বণিক বার্তার র‍্যাংকিংয়ে আমাদের উন্নতি তার প্রমাণই দিচ্ছে। গত কয়েক বছর ডিভিডেন্ড কম দিয়ে আমরা ব্যাংকের ভিত মজবুত করার দিকে বেশি নজর দিয়েছি। ফলে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা সিএআরের দিক থেকে ব্যাংক এশিয়া দেশসেরা অবস্থান পেয়েছে। করোনাকালে দেশের অনেক ব্যাংকই ঝুঁকিতে আছে, এক্ষেত্রে ব্যাংক এশিয়া অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত।

ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করছে এমন ব্যাংকগুলোর একটি ট্রাস্ট। ২০১৮ সালে র‍্যাংকিংয়ে ট্রাস্ট ব্যাংকের অবস্থান ছিল অষ্টম। এবারের র‍্যাংকিংয়ে ব্যাংকটি এক ধাপ এগিয়ে সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে। এনএভিপিএস নিট মুনাফা বাদ দিয়ে ৫০ স্কেলের স্কোরে ট্রাস্ট ব্যাংক স্থান করে নিয়েছে পঞ্চম স্থানে। সবকটি সূচক মিলিয়ে ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রাপ্ত নম্বর ২৬ দশমিক ২৪। ২০১৮ সালে ২৫ দশমিক শূন্য নম্বর পেয়েছিল ব্যাংকটি। ট্রাস্ট ব্যাংকের শক্তির জায়গা হলো আরওই এবং শাখাপ্রতি মুনাফা। আর দুর্বলতার জায়গা হলো খেলাপি ঋণের উচ্চহার।

ট্রাস্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, অতীতের কিছু খেলাপি ঋণ না থাকলে র‍্যাংকিংয়ে ট্রাস্ট ব্যাংক আরো ভালো করত। তবে কিছু সূচক আছে যেগুলো সংখ্যা বা অর্থের পরিমাপে মাপা যায় না। করপোরেট সুশাসনের দিক থেকে ট্রাস্ট ব্যাংকের অবস্থান সবার ঊর্ধ্বে। আর কস্ট-টু-ইনকাম রেশিওর দিক থেকে আমরা সবার শীর্ষে। ১০০ টাকা আয় করতে ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যয় হয় মাত্র ৩৫ টাকা। এজন্যই করোনাকালে ব্যয় সংকোচন নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। অথচ দেশের অনেক ব্যাংকই কর্মীদের বেতন কমিয়ে কস্ট-টু-ইনকাম রেশিও কমানোর চেষ্টা করছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি দ্য সিটি। ২০১৬ সালে বণিক বার্তার র‍্যাংকিংয়ে ব্যাংকটির অবস্থান ছিল তৃতীয়। এর পর থেকেই র‍্যাংকিংয়ে পেছাতে থাকে ব্যাংকটি। তবে ২০১৯ সালে আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছে সিটি ব্যাংক। এবারের র‍্যাংকিংয়ে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকটির চার ধাপ উন্নতি হয়েছে। সাতটি সূচকে দেশসেরা ব্যাংকের তালিকার অষ্টম স্থান পেয়েছে সিটি ব্যাংক। ২০১৮ সালে ব্যাংকটির অবস্থান ছিল ১২তম। সামগ্রিক সূচকে সিটি ব্যাংকের প্রাপ্ত নম্বর ২৫ দশমিক ৯৮। আগের বছর ২৩ দশমিক শূন্য স্কোর পেয়েছিল ব্যাংকটি।


সিটি ব্যাংকের শক্তির জায়গা হলো শাখাপ্রতি আয়, সিএআর, আরওএ আরওই। অন্যদিকে দুর্বলতার জায়গা হলো খেলাপি ঋণের উচ্চহার এনএভিপিএস।

র‍্যাংকিংয়ে চার ধাপ উন্নতিতে খুশি সিটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেন, সিটি ব্যাংক তার হারানো র‍্যাংকিং ফিরে পাচ্ছে, এটি আনন্দের সংবাদ। সমগ্রিক দিক থেকে আমাদের ব্যাংকের ভিত অনেক শক্তিশালী। তবে দুর্বলতার দিক হলো খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়ে গেছে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনাকে আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। আশা করছি, এক্ষেত্রে দ্রুতই আমরা সফলতা পাব। একই সঙ্গে সিটি ব্যাংকের শাখাগুলো পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে শাখাপ্রতি ব্যাংকের আয় আরো বাড়বে।

র‍্যাংকিং তালিকায় নিজের জায়গা ধরে রাখতে পেরেছে যমুনা ব্যাংক লিমিটেড। ২০১৮ সালে সমগ্রিক র‍্যাংকিংয়ে ব্যাংকটির অবস্থান ছিল নবম। ২০১৯ সালেও একই অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে ব্যাংকটি। তবে ২০১৯ সালে যমুনা ব্যাংকের প্রাপ্ত স্কোর বেড়েছে। একই সঙ্গে ৫০ স্কোরের সূচকে এক ধাপ এগিয়ে সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে ব্যাংকটি। সাতটি সূচকে বিদায়ী বছর যমুনা ব্যাংক পেয়েছে ২৫ দশমিক ৭৮ নম্বর, যা ২০১৮ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৭৮। যমুনা ব্যাংকের শক্তির জায়গা হলো খেলাপি ঋণের নিম্নহার, আরওএ আরওই। অন্যদিকে দুর্বলতা হলো শাখাপ্রতি কম আয় এনএভিপিএস।

জনসেবার প্রতি গুরুত্ব দেয়ার কারণেই যমুনা ব্যাংকের শাখাপ্রতি আয় কম বলে মনে করেন ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী মির্জা ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, যমুনা ব্যাংক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শাখার সংখ্যা বাড়ানোয় গুরুত্ব দিয়েছে। এজন্যই আমাদের শাখাপ্রতি আয় কিছুটা কম। তবে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরাটি আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সফলতা। ব্যাংকের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমরা ব্যাসেল--এর সবকটি সূচক সফলতার সঙ্গে পালন করেছি। এছাড়া করপোরেট সুশাসন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের কারণে বাজারে যমুনা ব্যাংকের কোনো বদনাম নেই।

র‍্যাংকিং তালিকায় ছয় ধাপ এগিয়ে এবার শীর্ষ ১০- উঠে এসেছে ঢাকা ব্যাংক। ব্যাংকটির সার্বিক স্কোর ২২ দশমিক ৮২ থেকে এবার ২৪ দশমিক ১৩- উন্নীত হয়েছে। এবার ব্যাংকটি মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাতের তালিকায় ১০ থেকে - উঠে এসেছে। অন্যদিকে শাখাপ্রতি পরিচালন মুনাফার দিক দিয়ে থেকে - নেমে গেছে। পাঁচ নির্দেশকে ৫০-এর স্কেলে ব্যাংকটির স্কোর ১৯ দশমিক ২৮ থেকে ২০ দশমিক ৪১ উন্নীত হয়েছে। এতে ব্যাংকটি তালিকায় ১১ থেকে - উন্নীত হয়েছে।

ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমরানুল হক বলেন, র‍্যাংকিংয়ে এক সঙ্গে ছয় ধাপ উন্নয়ন আমাদের জন্য আনন্দের। উন্নতির ধারাবাহিকতা আমরা ধরে রাখতে চাই। এজন্য আরওএ, আরওই, নিট মুনাফা এনএভিপিএসসহ যেসব সূচকে আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি, তা উন্নয়নে জোর দেয়া হবে। তবে বছর আগামী বছরে আমরা ঢাকা ব্যাংকের ব্যালান্সশিটের আকার খুব বেশি বাড়াব না। এই দুই বছর আমরা ব্যাংকের স্বাস্থ্য ভালো করায় জোর দিচ্ছি।

সেরা ব্যাংকের তালিকায় এবার সবচেয়ে বেশি উত্থান হয়েছে ইউসিবি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের। এর মধ্যে ইউসিবি ১৯ থেকে ১১-তে এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ২৪ থেকে ১৬-তে উঠে এসেছে। ইউসিবির সার্বিক স্কোর ২২ দশমিক শূন্য থেকে ২৩ দশমিক ৯১ এবং শাহজালাল ইসলামীর ১৯ দশমিক ৮৬ থেকে ২২ দশমিক ৭৪- উন্নীত হয়েছে। আর ৫০-এর স্কেলে ইউসিবি ২২ থেকে ১৭ এবং শাহজালাল ইসলামী ২১ থেকে ১২তম অবস্থানে উঠে এসেছে। মূলত মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাতের দিক দিয়ে উন্নতির কারণে ইউসিবির এবং শ্রেণীকৃত ঋণ অনুপাতে উন্নতির কারণে সেরা ব্যাংকের তালিকায় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের উত্থান হয়েছে।

র‍্যাংকিংয়ে উন্নতির ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে আশাবাদী শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত দুই বছরে আমরা ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড কমানো, খেলাপি ঋণের লাগাম টানা মূলধনের ভিত শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছি। বণিক বার্তার র‍্যাংকিংয়ে এসবের প্রতিফলনই ফুটে উঠেছে। যে শক্তিশালী ভিতের ওপর ব্যাংক দাঁড়িয়েছে, তাতে আগামীতে আমরা আরো ভালো করব।

এদিকে সেরা ব্যাংকের তালিকায় সবচেয়ে বড় অবনমন হয়েছে এমটিবি, পূবালী, মার্কেন্টাইল এনবিএলের। এর মধ্যে এমটিবি ১৫ থেকে ২৩, পূবালী ১৭ থেকে ২৪, মার্কেন্টাইল থেকে ১৩ এবং এনবিএল ১১ থেকে ১৮-তে নেমে গেছে। এমটিবির সার্বিক স্কোর ২২ দশমিক ৮৭ থেকে ২০ দশমিক ৫৩, পূবালীর ২২ দশমিক ৬৭ থেকে ১৯ দশমিক ৭২, মার্কেন্টাইলের ২৬ দশমিক ১৫ থেকে ২৩ দশমিক ৭৫ এবং এনবিএলের ২৩ দশমিক শূন্য থেকে ২২ দশমিক ৪৪- নেমে গেছে। আর ৫০-এর স্কেলে এমটিবি ১২ থেকে ২০, পূবালী ২৪ থেকে ২৬, মার্কেন্টাইল ব্যাংক থেকে ১৩ এবং এনবিএল ১৭ থেকে ২২- নেমে গেছে। আরওইতে অবনমনের কারণে এমটিবির; আরওএ, আরওই, নিট মুনাফা এনএভিপিএসে অবনমনের কারণে পূবালীর; আরওএ, আরওই, নিট মুনাফা শ্রেণীকৃত ঋণ অনুপাতে অবনমনের করণে মার্কেন্টাইলের এবং  আরওই, মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত শাখাপ্রতি পরিচালন মুনাফায় অবনমনের ফলে এনবিএলের র‍্যাংকিংয়ের অবনতি হয়েছে।

তাছাড়া এনসিসি ব্যাংক ১৮ থেকে ১৪, আইএফআইসি ২৬ থেকে ২০, উত্তরা ব্যাংক ২৩ থেকে ২১, ফার্স্ট সিকিউরিটি ২৫ থেকে ২২, এক্সিম ব্যাংক ২০ থেকে ১৯ এবং এবি ব্যাংক ২৯ থেকে ২৮তম স্থানে উন্নীত হয়েছে।

অন্যদিকে সাউথইস্ট ব্যাংক ১০ থেকে ১২, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ১৪ থেকে ১৫, প্রাইম ব্যাংক ১৩ থেকে ১৭, এনবিএল ১১ থেকে ১৮, ওয়ান ব্যাংক ২২ থেকে ২৫, এসআইবিএল ২১ থেকে ২৬ এবং রূপালী ব্যাংক ২৮ থেকে ২৯তম স্থানে নেমে এসেছে।  স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক (২৭) আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের (৩০)র‍্যাংকিং গত বছরের মতোই অপরিবর্তিত রয়েছে।

সাতটি নির্দেশকে বণিক বার্তার করা র‍্যাংকিংয়ের মোট নম্বর ছিল ৭০। কিন্তু ইবিএল ডাচ্-বাংলা বাদে আর সব ব্যাংকই নম্বর পেয়েছে ৩০-এর নিচে। অর্থাৎ দেশের প্রায় শতভাগ ব্যাংকই অর্ধেক নম্বরও পায়নি। অন্যদিকে পাঁচ নির্দেশকের ভিত্তিতে করা র‍্যাংকিংয়ের মোট নম্বর ছিল ৫০। এর মধ্যে ইবিএল বাদে আর সব ব্যাংকই অর্ধেকের কম নম্বর পেয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন