শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

মৃত্যুঞ্জয়

উন্নয়নের চালিকাশক্তি

ড. এ কে আব্দুল মোমেন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একটি নাম নয়, একটি প্রত্যয়; একটি আদর্শ, একটি দর্শন, একটি দীর্ঘ সংগ্রাম, নির্যাতিতের আলো, মানুষের ভালোবাসা, বাংলার সবুজ জমিনে এক সাগর রক্ত, একটি সফল বিপ্লব, অতঃপর একটি দেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম। বহু সংগ্রামের পর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যেতে বাধ্য হলো, পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে স্বীকৃতি পেল বাংলাদেশ। তবে তাতে স্বস্তির চেয়ে যন্ত্রণা বাড়ল বাংলাদেশের। অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, রাষ্ট্র ব্যবস্থাসহ সব ক্ষেত্রেই শুরু হলো শোষণ আর বঞ্চনা। এরপর বঙ্গবন্ধুর প্রগাঢ় নেতৃত্বে রাজনৈতিক নানা ঘটনার বাঁক-পরিক্রমায় একাত্তরে বাংলাদেশ পেল লাল-সবুজের নতুন পতাকা, বিশ্ব অভ্যুদয়ে নতুন পরিচিতি এল স্বাধীন বাংলাদেশের। নতুন বাংলাদেশ গঠনের শুরুতেই সবার সঙ্গে সুসম্পর্ককে প্রাধান্য দিলেন জাতির পিতা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের ভয়াবহতা নির্মমতা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেন। আর পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের প্রতি জুলুম নির্যাতনের প্রতিরোধের আন্দোলনে তিনি তো সম্মুখযোদ্ধা। এমন অভিজ্ঞতা থেকে বঙ্গবন্ধু সব সময় শান্তিপূর্ণ আইনানুগ সমাধানের নীতি গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু সারা জীবনই ছিলেন অহিংস, মানবপ্রেমী, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আর শান্তিপ্রিয়। তিনি চেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোনো জোট নয়, বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ দেশ; হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। সবার সঙ্গে আন্তরিক হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে স্বাধীন জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ, অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সমতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করলেন। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে প্রতিবেশী ভারত সর্বতোভাবে সাহায্য করে। ভারতের বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের জন্য বারবার ভেটো দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আমাদের বিরোধিতা করে পাকিস্তানকে অস্ত্রশস্ত্র-গোলাবারুদ দিয়ে গণহত্যায় সাহায্য করে। সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল না। এমন অবস্থায় বঙ্গবন্ধু কোনো ব্লকের অনুসারী না হয়েজোটনিরপেক্ষজোটে সদস্যপদ অর্জন এবংসবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এমন পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করলেন। যা আজও বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি মূলমন্ত্র। 

সব সময়ের বন্ধু ভারত

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের প্রতি বরাবরই শ্রদ্ধাশীল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে তাঁর পরিকল্পনা ছিল সমৃদ্ধ আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে দিল্লিতে ফিরে বঙ্গবন্ধু কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন ভারতের শক্তিশালী অবদানের কথা। বলেন, ‘বাংলাদেশ ভারতের ভ্রাতৃত্ববন্ধন চিরকাল অটুট থাকবে।ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নীতির মিল প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা হচ্ছে আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যবোধের মিল।তবে এর মানে এই নয় যে তিনি অন্ধভাবে ভারতের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। তা বোঝা যায় লন্ডন থেকে বাংলাদেশে তাঁর প্রথম যাত্রা দিয়েই। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি লন্ডন হয়ে দিল্লিতে আসেন। যাত্রায় তিনি বিনয়ের সঙ্গে ভারতীয় বিমান ব্যবহারের আমন্ত্রণ গ্রহণ না করে ব্রিটিশ বিমান ব্যবহার করেন।

বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি কেবল উদারই নয়, তা স্বাধীন বলিষ্ঠও বটে। তার প্রমাণ মেলে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাসখানেক পরেই। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় বঙ্গবন্ধু প্রথম সরকারি সফরে যান। ফেব্রুয়ারি তাঁর সম্মানে দেয়া এক নাগরিক সংবর্ধনায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে সুস্পষ্ট প্রশ্ন করে জিজ্ঞাসা করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় যেসব সৈন্য বাংলাদেশের প্রয়োজনে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, তারা কবে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহূত হবে।এর প্রত্যুত্তরে সমালোচকরা আশা করেছিলেন, ভারত হয়তো বাংলাদেশের ওপর নাখোশ হবে, সৈন্যদের অবস্থান দীর্ঘায়িত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইবে। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী স্বভাবসুলভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেই বঙ্গবন্ধুর এমন আহ্বানকে স্বাগত জানান। পরবর্তী সময়ে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের আগেই ভারতীয় সেনাদের বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহূত করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম দেশই আছে, যেখানে এত স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদেশী বিজিত সৈন্য বিদায় নেয় এবং এটি সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় নেতৃত্ব ব্যক্তিত্বের জন্য। আর ইন্দিরা গান্ধী ১৭-১৯ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন। ১৯ মার্চ বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা আর সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার বিষয়ে দুই দেশের একমত হওয়ার ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশের বড় সাফল্য। এতে বলা হয়, এক দেশ আরেক দেশের স্বাধীনতা আর আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কোনো দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে। কোনো দেশই কারো প্রতি আক্রমণ বা ধরনের অভিযান পরিচালনা করবে না। নিরাপত্তার প্রতি হুমকি বা সামরিক কোনো অভিযান পরিচালনার মতো পদক্ষেপ থেকে দেশগুলো বিরত থাকবে। চুক্তিভুক্ত দেশগুলো আক্রান্ত হলে বা এসব দেশের ওপর আক্রমণের শঙ্কা তৈরি হলে পারস্পরিক মতামত সমঝোতার ভিত্তিতে শান্তি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে উভয় দেশ তাদের নীতি সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেবে। স্বাধীনতা পাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় এমন সাফল্য সে সময়েই ইঙ্গিত করে যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেবল সৌহার্দপূর্ণ আর সংযমীই নয়, বরং তা একে অন্যের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস সমসম্মানের পরিচায়ক।

শুভেচ্ছা সফরে সোভিয়েত ইউনিয়নে

ভারত সফরের পরই বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের থেকে মার্চ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। বিমানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ আর জনগণের জন্য বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের শুভেচ্ছা নিয়ে যাচ্ছি।সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সফরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা বাংলাদেশের উদীয়মান পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অপরিসীম প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। অত্যন্ত সফল সফরকেবঙ্গবন্ধুর শুভেচ্ছা সফরহিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে ঐতিহাসিক রাজকীয় সম্মাননা প্রদান করা হয়। সে দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের সময় রাস্তার দুই ধারে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, জনগণ ফুল হাতে বঙ্গবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানান। যেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কোনো মহানায়কের অভিবাদন। আজকের জাতীয় স্মৃতিসৌধ বলতে গেলে সেই রাশিয়া সফরের প্রাপ্তি। লেনিনগাদের স্বাধীনতা স্তম্ভগুলো দেখার পর বঙ্গবন্ধুর মনে ভাবনা জাগে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে এমন অবকাঠামো তৈরি করা উচিত। তারই ফলে পরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়। সফরে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বড় ধরনের কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বঙ্গবন্ধুর সফরের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল। ১৯৭৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজের জন্য সংগ্রহ করা খাদ্যসামগ্রী থেকে বাংলাদেশকে দুই লাখ টন খাদ্যসামগ্রী সহযোগিতা প্রদান করে। ১৯৭৩ সালের জুনে কয়েকটি মিগ-২১ জঙ্গি বিমান, পরিবহন বিমান হেলিকপ্টার পাওয়া যায় দেশটির কাছ থেকে। রাষ্ট্রীয়, নৈতিক পররাষ্ট্রনীতির দিক থেকে সবসময়ই বাংলাদেশের পাশে পাওয়া গেছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে।

বরফ গলতে শুরু করে চীনের সঙ্গে

স্বাধীন হওয়ার পরও বাংলাদেশের প্রতি চীনের বিদ্বেষ নীতি কার্যকর থাকে। ১৯৭২ সালের আগস্ট জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন করে বাংলাদেশ। কিন্তু চীনের বিরোধিতায় ১০ আগস্ট তা নাকচ হয়ে যায়। নিয়ে ক্ষোভও ঝরে পড়ে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক অধিবেশনে ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেন, “...যখন চীনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে ভেটো দেওয়া হতো তখন এই বাংলার মানুষই বিক্ষোভ করত। আমি নিজে ওই ভেটোর বিরুদ্ধে বহুবার কথা বলেছি। যে ভেটোর জন্য চীন ২৫ বৎসর জাতিসংঘে যেতে পারে নাই, দুঃখের বিষয়, সেই চীন ভেটোপাওয়ারপেয়ে প্রথম ভেটো দিল আমার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তবুও আমি কামনা করি তাদের বন্ধুত্ব। অনেক বড় দেশ। দুশমনি করতে চাই না। বন্ধুত্ব কামনা করি। কারণ আমি সকলের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু জানি না, আমার এই কামনায়, আমার এই প্রার্থনায় তারা সাড়া দিবেন কিনা। যদি না দেন কিছু আসে যায় না। ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা এত ছোট দেশ নই। বাংলাদেশ এতটুকু নয়। পপুলেশনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ দুনিয়ার অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র।এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা পররাষ্ট্রনীতি ফুটে ওঠে। পরে অবশ্য চীন তাদের অবস্থান পাল্টায়। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা রেড ক্রসের একটি দল সফর করে বাংলাদেশের বন্যার্ত অঞ্চল। তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায় মিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা। আর পঁচাত্তরের মে মাসে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।

মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন

স্বাধীনতা লাভের মাত্র তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশ ১২৬টা দেশের স্বীকৃতি অর্জন করে। এত অল্প সময়ে এতগুলো দেশের স্বীকৃতি পাওয়া মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়। স্বীকৃতির মানে হলো, ওইসব দেশ বাংলাদেশকে পূর্ণ সার্বভৌম দেশ হিসেবে পরিগণিত করে। শুরুর দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে আরব মুসলিম দেশগুলো খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কারণ পাকিস্তানের মতো বড় মুসলিম দেশ থেকে বের হয়ে গিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা ভৌগোলিক আয়তনের ছোট্ট দেশটির ভবিষ্যৎ কি-ইবা হতে পারেএমন দোলাচল ছিল তাদের। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক যোগাযোগ তাদের আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়। এদিক থেকে ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সের জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলন উল্লেখ করার মতো। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্মেলনে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ মতামত তুলে ধরেন, যা তাকে সম্ভাব্য বিশ্ব মুসলিম নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। একই সঙ্গে আরবদের সমর্থন করায় বাংলাদেশের প্রতি আরব দেশগুলোর অগাধ আস্থা তৈরি হয়। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় আরবদের প্রতি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি মেডিকেল টিম পাঠানো হয়। প্রায় কাছাকাছি সময়ে যুদ্ধরত মিসরীয় সেনাবাহিনীর জন্য লাখ পাউন্ড চেয়ে পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের প্রতি আরব দেশগুলোর দৃষ্টি ফেরানো। বাংলাদেশ তাতে সফলও হয়। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর দেশবাসীর উদ্দেশে দেয়া এক বেতার টেলিভিশন ভাষণে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন, ‘আমরা আজ গর্বিত যে মধ্যপ্রাচ্যে আমরা আরব ভাইদের এবং ফিলিস্তিনবাসীদের পাশে রয়েছি। ইসরায়েলিরা তাদের ন্যায্য অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে। ইসরায়েলিরা জাতিসংঘের প্রস্তাব মানেনি। তারা দখল করে বসে আছে আরবদের জমি। আমি আরব ভাইদের একথা বলে দেবার চাই এবং তারা প্রমাণ পেয়েছে যে বাংলার মানুষ তাদের পেছনে রয়েছে। আরব ভাইদের ন্যায্য দাবির পক্ষে রয়েছে। আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে তাদের সাহায্য করব।১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ৩২তম দেশ হিসেবে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ওআইসির সদস্যপদ লাভ করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি পরিণত মর্যাদা লাভ করে।

উদীয়মান বিশ্বনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত

শান্তি ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করায় অল্প সময়েই সদ্য স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক মহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক দরবারে শান্তির মডেল হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে চিলির রাজধানী সান্তিনিয়াগোতে বিশ্ব পরিষদের প্রেসিডেন্সিয়াল কমিটির সভায় বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকা রাখায় বঙ্গবন্ধুকেজুলিও কুরি পদক দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পৃথিবীর ১৪০টি দেশের শান্তি পরিষদের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে এই পদকের জন্য প্রস্তাব গৃহীত হয়, যা পুরো বাঙালি জাতির জন্য গর্বের বিষয়। ১৯৭৩ সালের মে মাসে বিশ্ব শান্তি পরিষদ ঢাকায় দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ২৩ মে জাতীয় সংসদের উত্তর প্লাজায় বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি পদক পরিয়ে দেয়া হয়। সময় বিশ্ব শান্তি পরিষদে যোগ দিতে আসা সারা বিশ্বের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। পদক পরিয়ে দেয়ার সময় বিশ্ব শান্তি পরিষদের সে সময়ের মহাসচিব রমেশ চন্দ বলেন, ‘শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।বঙ্গবন্ধুও তাঁর ভাষণে বলেন, ‘বিশ্ব শান্তি আমার জীবনদর্শনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যেকোনো স্থানেই হোক না কেন, তাদের সঙ্গে আমি রয়েছি। আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতিতে ভর করে জাতিসংঘের UN Peackeeping- বাংলাদেশ আজ একটি ব্র্যান্ড নেম।

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু

১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম স্বাধীন দেশ হিসেবে সদস্যপদ লাভ করে পরিচিতি পায় বিশ্বজুড়ে। ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বক্তৃতা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই ভাষণটি ছিল সারা বিশ্বের অধিকারহারা শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ভাষণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার একটি বলিষ্ঠ উচ্চারণ সাহসী পদক্ষেপ। বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বিশদ আকারে তুলে ধরেন।

বিভিন্ন দেশ আন্তর্জাতিক সংস্থায় বঙ্গবন্ধুর পদচারণা

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু নিজের দেশের মানুষের কল্যাণের কথাই ভাবেননি, তিনি হূদয় দিয়ে অনুভব করতেন বিশ্বের নিঃস্ব মানুষের দুঃখ-দুর্দশা। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘বিশ্বটা দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে শোষক, অন্যভাগে শোষিত। আমি শোষিতদের দলে।বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো ধর্ম বা বর্ণের মানুষের ওপর শোষণ বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে তিনি কখনো দ্বিধা করেননি। মূলত বঙ্গবন্ধু ছিলেন এমন একজন বিশ্বনেতা, যিনি সবসময়ই শোষিতদের পক্ষে কথা বলতেন। তাঁকে তুলনা করা হতো হিমালয়ের সঙ্গে। তিনি আফ্রিকার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন; অবসান চেয়েছেন এশিয়া, আফ্রিকা লাতিন আমেরিকায় বিদেশী শাসনের। বঙ্গবন্ধু যেমন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন, তেমনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সাইপ্রাস সরকারকে উত্খাতের নিন্দাও করেছেন। ভিয়েতনামে আমেরিকার বোমাবাজি বন্ধের দাবিও জানায় বাংলাদেশ তাঁর আমলেই। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়ার আগের পুরোটা সময় তিনি উল্কার মতো ছুটে চলেছেন বিশ্বজুড়ে। নিজে যেমন বাংলাদেশের উন্নয়নের মিশন নিয়ে ভ্রমণ করেছেন বিভিন্ন দেশ, তেমনি বাংলাদেশেও এসেছেন বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, সরকারপ্রধানরা।

শেষ হইয়াও যা হইল না শেষ

জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে জুলাই ১৯৭৫, মাত্র সাড়ে তিন বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ৫০টির মতো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের সফরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক সফর অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের সফল কূটনৈতিক তত্পরতায়। ওই স্বল্প সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার নানা বিষয়ে ৭০টির বেশি চুক্তি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। অনেক দেশ সংস্থা যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন, সুইডেন, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বুলগেরিয়া, বেলজিয়াম, আলজেরিয়া, নেদারল্যান্ডস, জাতিসংঘ, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি, আইডিএ, ইউএনএইচসিআর প্রভৃতি বাংলাদেশকে কোটি কোটি ডলারের বিভিন্ন ধরনের ঋণ, সাহায্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদান করে এবং স্বীকৃতি প্রদান করে আরো বিভিন্নমুখী সহযোগিতার। সময় বাংলাদেশ এডিবি, আইসিএও, ইকাফ এবং এফএও সদস্যপদ লাভ করে। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষার যে মিশন নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই তার শতভাগ সুফল ভোগ করতে থাকে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকতেই সৌদি আরব, সুদান, ওমান চীন ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, দূরদর্শিতা বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল এসব অর্জনে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের জনসভায় প্রদত্ত এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি দুনিয়ার প্রত্যেক রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই, কারো সাথে দুশমনি করতে চাই না। সকলের সাথে বন্ধুত্ব করে আমরা শান্তি চাই।

 

. কে আব্দুল মোমেন: মন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন