শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

১৫ আগস্টের একটা প্যান্ডোরার বক্স আছে, যা আজও খোলা হয়নি

মহিউদ্দিন আহমদ

মহিউদ্দিন আহমদ ১৯৫২ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। শিক্ষাজীবনে জড়িত ছিলেন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গেও। ১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনে মুহসীন হল থেকে সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরের বছর মুক্তিযুদ্ধে তিনিবেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্টএর হয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকোংহে বিশ্ববিদ্যালয়ে এনজিও স্টাডিজ নামক একটি বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডসহ আরো নানা বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাহাত মিনহাজ

রাহাত মিনহাজ: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে (শেখ হাসিনা-রেহানা ছাড়া) ঘাতকদের হাতে শাহাদত বরণ করেছিলেন। এটি শুধু নিছক হত্যাকাণ্ড নয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তন হয়েছিল। শুরুতেই জানতে চাই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খবর আপনি কীভাবে পেয়েছিলেন?

মহিউদ্দিন আহমদ: ১৯৭৫ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী। আমি মুহসীন হলের রেসিডেন্ট, কিন্তু ওই সময় আমি হলে ছিলাম না। মোহাম্মদপুরে আম্মার সঙ্গে বাসায় ছিলাম। ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে অনেক গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাই। পরে রেডিও অন করলে ডালিমের ঘোষণা শুনি। তখন বুঝলাম কী ঘটে গেছে। আমার ধাতস্থ হতে ঘণ্টাখানেক লেগে যায়। রাস্তায় বেরিয়ে এলাম, বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট জটলা চোখে পড়ল। চায়ের দোকান, পানের দোকানে ছোট ছোট ভিড়। অনেকেই বিহ্বল। সবাই কথাবার্তা বলছে। কয়েক দিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম খোঁজ নিতে। শেখ কামাল তাঁর স্ত্রী, দুজনই আমাদের ব্যাচমেট ছিলেন। এর মধ্যে আমরা কোনো বড় সংবাদ পেলাম না। শুধু একটা বড় খবর দেখলাম ২৩ আগস্ট। বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেফতার হয়েছেন। তাজউদ্দীন, কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আব্দুস সামাদ আজাদ, কোরবান আলী ২৩ আগস্ট গ্রেফতার হলেন। আর ২৪ আগস্ট বড় সংবাদ পেলাম, জেনারেল সফিউল্লাহকে সরিয়ে জেনারেল জিয়া সেনাপ্রধান হয়েছেন। আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদের মতো যুবনেতা যারা ছিলেন, তারা আরো পরে অ্যারেস্ট হলেন।

 

রাহাত মিনহাজ: প্রতি বছর ঘুরে ১৫ আগস্ট জাতীয় জীবনে আসে। জাতীয় শোক দিবসে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা হয়। আপনি৭৫-এর পুরো ঘটনা দেখেছেন। পরে গবেষণা করেছেন। আপনার মূল্যায়ন কী? এই দিনটিকে কীভাবে আমাদের স্মরণ বা উপলব্ধিতে আনা প্রয়োজন?

মহিউদ্দিন আহমদ: ১৫ আগস্টের ঘটনাটা কীভাবে আমরা দেখব কিংবা কীভাবে লোকজন দেখে প্রশ্নের জবাবে আমি বলতে পারি, ৪৫ বছর পর এসে ঘটনা নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। ওই সময়ের জনসাধারণের মনস্তত্ত্বের বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর আগের দিন পর্যন্তএক নেতা-এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’—এই স্লোগান দিয়ে রাস্তা কাঁপিয়েছে আওয়ামী লীগ, বাকশালের লোকেরা। কিন্তু ১৫ আগস্ট সকালের পর থেকে রাস্তা সুনসান, কারো কোনো দেখা নেই। ভোজবাজির মতো সবাই উড়ে গেল। ওই সময়ের ঘটনাগুলোকে কীভাবে দেখব, তা নিয়ে পরে কিছু ব্যাপার চিন্তায় এসেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বোন শেখ রেহানা সেদিন বিদেশে থাকায় বেঁচে গেছেন। দেশে থাকলে তারাও হয়তো হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারতেন। সুতরাং এই বেঁচে যাওয়ায় অনেক কিছু হলো। আজ শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ রেহানার কাছে ১৫ আগস্টের ঘটনাটা পারিবারিক বিপর্যয়, আওয়ামী লীগের কাছে দলীয় বিপর্যয়। কিন্তু আমরা যদি ঘটনাটাকে এভাবে দেখি, তাহলে ঠিকভাবে দেখা হবে না। ১৫ আগস্টের আগের এবং পরের তুলনাটা যদি দেখি, বাংলাদেশের চালচিত্রটা আমূল যে পাল্টে গেছে, তার প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল ১৫ আগস্ট। সুতরাং এটিকে পারিবারিক বা দলীয় বিপর্যয়ের গণ্ডিতে রেখে দিলে তার অ্যাসেসমেন্ট যথাযথ হবে না। এটি আমাদের দেশের জন্য একটি বড় ঘটনা। ঘটনার যে অভিঘাত, সেটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দলকেন্দ্রিক আলোচনার মধ্যে গেলে আমরা কোনো মীমাংসায় পৌঁছতে পারব না।

 

রাহাত মিনহাজ: তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা আন্দোলনের কারণে খুনিদের বিচার তো হয়েছে। ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, হচ্ছে। এটা নিশ্চয় বড় বিষয়, স্বস্তির বিষয়।  

মহিউদ্দিন আহমদ: ১৯৯৬ সালে মামলা দায়েরের পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু ১৫ আগস্ট ১৯৭৫- যে পালাবদল হলো, তার কোনো তদন্ত হয়নি। ১৫ আগস্টের কিলিং মিশনে মাঠ পর্যায়ে যারা অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের বিচার হয়েছে। খুনিরা নিজেরাই বলেছেন যে তারা খুন করেছেন। সুতরাং আত্মস্বীকৃত খুনির বিচার করা খুব সহজ। কিন্তু ১৫ আগস্ট শুধু দেড় ঘণ্টার একটা অপারেশন নয়। এখানে একটি বিষয় খুবই লক্ষণীয়, বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি, সংস্কৃতি সব ক্ষেত্র যদি আমরা দেখি, মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে এত নিখুঁত একটা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন আমরা আর কোনো সেক্টরে দেখিনি। এটা যারা করলেন, বিষয়টাকে শুধু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করব, নাকি এর পেছনে একটা বিশাল পরিকল্পনা আছে। এই পরিকল্পনা নিশ্চয়ই একদিনে বা একরাতে হয়নি, অনেক দিন ধরেই হয়েছে। সেটার সূত্রটা আমরা কীভাবে সন্ধান করববিষয়টি তদন্তে কখনই আসেনি। যারা নিছক দেড় ঘণ্টার কিলিং মিশনে গেছে, তাদের ফাঁসিতে ঝোলালাম, বাকি দণ্ডপ্রাপ্ত যারা বিদেশে আছেন, তাদের নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা-তদবির চলছে। কিন্তু এটা দিয়ে ১৫ আগস্টের ওই দিনটিকে বা ঘটনাটিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাবে না। আর যতদিন বিষয়টিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাবে না, ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে অনেক অমীমাংসিত বিষয় থেকে যাবে।

 

রাহাত মিনহাজ: এর আগেও বিশ্বে অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, কিন্তু পরিবারসহ এমন হত্যাকাণ্ডের নজির খুব বেশি নেই। গভীরভাবে দেখলে এই হত্যাকাণ্ড ছিল পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকেই পরিবর্তন করার একটা প্রক্রিয়া। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাতারাতি জয় বাংলার জায়গায় জিন্দাবাদ চলে আসে। সবকিছুতেই পরিবর্তন কেন, কীভাবে সম্পন্ন হলো? সব পরিকল্পিত ছিল?

মহিউদ্দিন আহমদ: ‘কতিপয় বিপথগামী কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা এটি করেছে, জাতীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র...’— গল্প গত সাড়ে চার দশক ধরে চালু আছে। দুজন মেজর, সঙ্গে কয়েকজন সাঙ্গোপাঙ্গ এবং তাদের অধীনস্থ কিছু সেপাই (সংখ্যায় ৩০০ হতে পারে) আর গোলাবিহীন কয়েকটি ট্যাংকএই দিয়ে তারা পুরো চালচিত্র পাল্টে দিল, আর পুরো রাজনৈতিক দল, বাকশাল, সরকার তার আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল বিষয়টি বিশ্বাস করা কঠিন। সবাই তো এটাকে অনুমোদন করেছে। ১৫ আগস্টের ঘটনাটিকে যদি আমরাম্যাসিভ লার্জস্কেল এন্ডোর্সমেন্টছাড়া বিচার করি, সেটি তো ঘণ্টাও টিকতে পারার কথা নয়। এরপর তো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অনেক ক্যু অ্যাটেমট হয়েছে, সেগুলো একটাও ঘণ্টা টিকতে পারেনি। সুতরাং ১৫ আগস্টের ক্যুটি কেন দেড় ঘণ্টা টিকল, আর বাকিগুলো কেন ঘণ্টাও টিকল না বিষয় অনেক ভাবনাচিন্তার দরজা খুলে দেয়।

 

রাহাত মিনহাজ: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর অনেক রক্তারক্তি হয়েছে, অনেক ক্যু হয়েছে সেনাবাহিনী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে। সেগুলোর অনেকগুলোই সফল হয়নি এটা সত্য, কিন্তু এগুলো কি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সমান্তরালে মেলানো যায়?

মহিউদ্দিন আহমদ: বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার নিয়ে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল হয়েছে ১৯৯৬ সালে। তার পরে কেটে গেল ২৪ বছর। কিন্তু এই ২৪ বছরেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের রহস্যের কিনারা হলো না। প্যান্ডোরার বাক্সটা কোনো সরকারই খুলতে চায় না। আমরা যদি এমনটা ধরে নিই যে যারা অর্ডিন্যান্স জারি করেছেন এবং যারা এতে লাভবান হয়েছেন, তাদের একটা যুক্তি আছে যে তাদের ক্ষমতার ভিত্তি ছিল ১৫ আগস্ট। সুতরাং তারা কেন এটার বিচার করবে? যারা ক্ষমতাচ্যুত হলেন বা যারা ১৫ আগস্টের ভিকটিম, তারা ক্ষমতায় এসে কেন পুরো তদন্তটা করছেন না? আগে বলেছি, যেভাবে এন্ডোর্সমেন্ট (অনুমোদন) হয়েছে, তাতে কোনোভাবেই মনে করার কারণ নেই যে কতিপয় বিপথগামী মেজর, ক্যাপ্টেন, লেফটেন্যান্টের কাজ এটি।

এখানে কিছু সূত্র দিচ্ছি, যতদূর জানা যায় ১৫ আগস্ট ভোর ৫টা-৬টার মধ্যে সব কিলিং হয়েছে। সে সময় তত্কালীন সেনাপ্রধান সফিউল্লাহকে গান পয়েন্টে ডালিম নিলেন সকাল ৯টায়। তিনি রেডিওতে বিবৃতি দিতে গেলেন সকাল ১০টায়। সকাল ৬টা থেকে ৯টাএই ঘণ্টা তিনি কী করলেন প্রশ্ন তো আসবে। আরেকটা বিষয় হলো, সাংবিধানিক ক্রাইসিস। যেমন জিয়াউর রহমানের একটা কথা আমরা শুনি, ‘So what? Vice president is there. Uphold the constitutions. কথার মাঝে কিন্তু রহস্যের গন্ধ আছে। তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। Where was he? আমি তো বললাম, বঙ্গবন্ধুর এই ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা গ্রেফতার হলেন ২৩ আগস্ট। তাহলে ১৫ থেকে ২৩ আগস্টএই আটদিন তারা কী করলেন? ৬১ জন জেলা গভর্নর ঢাকায় ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। ১৫ আগস্ট সকালে দেখা গেল তাদের সবাই গা-ঢাকা দিয়েছেন। এরপর আমরা শুনি, টাঙ্গাইলের যে গভর্নর ছিলেন আব্দুল কাদের সিদ্দিকী, তিনি প্রায়ই বলেন, ‘একমাত্র আমি এই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে অস্ত্র ধরেছিলাম।তিনি অস্ত্রটা কোথায় ধরলেন? নেত্রকোনার হালুয়াঘাট বর্ডারে গিয়ে বিএসএফের সাহায্য নিয়ে কয়েকটা বিডিআরের ক্যাম্প দখল করে? ক্ষমতার কেন্দ্র ঢাকা। আপনি এত জনপ্রিয় বলে দাবি করেন, কিন্তু হালুয়াঘাট গিয়ে ঠুসঠাস করলে কি প্রতিবাদ হয়? আমরা যেটা দেখলাম, যাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু দল করেছেন, তারা কেউ তার পাশে ছিলেন না।

 

রাহাত মিনহাজ: আপনি দলীয় প্রতিবাদ নিয়ে বলছেন। কিন্তু তখন খোদ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে, রাস্তায় ট্যাংক চলছে। একটা আকস্মিক ভয়াবহ শূন্যতা চারদিকে। এমন বিপর্যস্ত অবস্থার মাঝে, ভীতিকর অবস্থার মাঝে প্রতিবাদ করার রাজনৈতিক পরিবেশ কি ছিল?

মহিউদ্দিন আহমদ: রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিল উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী তাদের। আমি তো বলেছি, ১৫ আগস্টের পরে আটদিন তারা  গ্রেফতার হননি। এই আটদিন তো তারা ছিলেন। তার পরে আমরা যদি মনে করি সেনাবাহিনীতে যারা ছিলেন, তাদের দায়িত্ব ছিল সংবিধান আপহোল্ড করা। সংবিধান আপহোল্ড করতে হলে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করতে হয়। যেভাবে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরে আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। এখন আপনি বলতে পারেন, সবাই ভয়ে ছিল। কিন্তু ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে যে ক্র্যাকডাউনটা হলো, তখন কী অবস্থা হয়েছিল? পুলিশ কি তখন তাদের থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে রুখে দাঁড়ায়নি? বিডিয়ারের অল্প কয়েকজন বাঙালি, যাদের আগেই নিরস্ত্র করা হয়েছিল। রেজিস্ট্যান্সটা বেশিক্ষণ চলেনি। কিন্তু আমরা তো কেউ জানতাম না What Happen to Sheikh Mujibur Rahman ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে আছেন না মরে গেছেন, অ্যারেস্ট না বাইরেকেউ তো বিষয়ে তখন জানত না। এটা তো আমরা জানতে পেরেছি অনেক পরে। এপ্রিলের ১০ তারিখেদ্য ডনপত্রিকায় একটা ছবি ছাপা হলো, তখন মানুষ জানতে পেরেছে শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত আছেন। এর আগে তো কেউ জানত না। সুতরাং রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাজটা হলো ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট। এখন ক্রাইসিস মুহূর্তে যদি আপনি চুপচাপ গা-ঢাকা দিয়ে বসে থাকেন, তাহলে এত আস্ফাালন করে লাভ নেই যে আমরা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি, বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ এক।

 

রাহাত মিনহাজ: সে সময় বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাকের (তখনকার অবৈধ রাষ্ট্রপতি) সঙ্গে সৈয়দ মনসুরের একটা বৈঠকের কথা জানি। মনসুর আলী সাহেবকে মন্ত্রিসভায় আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আমরা জানি যে তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যদের কাছেও কোনো কোনো ফর্মে প্রস্তাব গিয়েছিল, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা হয়তো প্রতিবাদ করতে পারেননি, কিন্তু তারা তো খুনিদের সঙ্গে হাতও মেলাননি। তারা বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেননি।

মহিউদ্দিন আহমদ: আমি যেটুকু পেয়েছি, মনসুর আলী সাহেব ১৫ আগস্টের পরে তার এক আত্মীয়ের বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন। সেখান থেকে কেএম ওবায়দুর রহমান তাকে বঙ্গভবনে নিয়ে যান। তখন খন্দকার মোশতাক মনসুর আলীকে মন্ত্রিসভায় জয়েন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যেহেতু খন্দকার মোশতাক মনসুর আলী এর আগে একসঙ্গে রাজনীতি করেছেন। মনসুর আলী সাহেব রাজি হননি, তিনি চলে এসেছেন। তাজউদ্দীন সাহেবকেও অফার দিয়ে থাকতে পারেন তারা, কিন্তু তিনিও রাজি হননি। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় না তাজউদ্দীন সাহেবকে অফার দেয়া হয়েছিলো।  খন্দকার মোশতাক যদি ক্ষমতা নেন, তিনি তাজউদ্দীনকে অফার দেয়ার কথা না। তাদের সম্পর্ক তো সাপে-নেউলে। আমার কথা সেটা নয়। তারা অনেকেই জয়েন করেননি। যারা জয়েন করেছেন, তাদের কেউ স্বেচ্ছায় গেছেন, কেউবা গান পয়েন্টে গেছেন। কিন্তু যারা জয়েন করলেন না, তারা নিজেরা কী করলেন? তারা তো নিজেরা কোনো উদ্যোগ নিলেন না।

 

রাহাত মিনহাজ: সেনাবাহিনীতে কিছু ঘটছে এবং এই ঘটনাপ্রবাহ বঙ্গবন্ধুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, বঙ্গবন্ধুকে উত্খাতের চেষ্টা হতে পারে কথাগুলো বঙ্গবন্ধুকে জানানো হয়েছে। অফিসাররাও যে কিছু না কিছু করছেন তথ্যগুলোই আগেই বঙ্গবন্ধু জেনেছেন। এত বড় ষড়যন্ত্র হলোগোয়েন্দারা কেন সেটি ট্রেস করতে পারল না?

মহিউদ্দিন আহমদ: গোয়েন্দাদের নিয়ে বলতে গেলে একটা উদাহরণ দিলে ভালো হয়। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের অফিসে প্রতিদিন সকালে গোয়েন্দা রিপোর্ট রাখা হতো। একবার আইয়ুব খানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি গোয়েন্দা রিপোর্ট কতটুকু গ্রহণ করেন? আইয়ুব খান বলেছিলেন, চারআনা অর্থাৎ ২৫ শতাংশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, তখন ঢাকায় ডিএফআইয়ের চার্জে ছিলেন মেজর জিয়াউদ্দীন (তখন সংস্থাটির নাম ডিজিএফআই ছিল না) তিনি পরে জাসদ করেছেন, জাতীয় পার্টি করেছেন আবার আওয়ামী লীগও করেছেন। তিনি তো বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষীও ছিলেন। তার কী প্রতিবেদন ছিল ১৫ আগস্ট নিয়ে? এটা ঠিক যে বঙ্গবন্ধুকে বহু জায়গা থেকে সতর্ক করা হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধী পার্সোনালি বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করেছিলেন। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা’-এর প্রধান আরএন কাও নিজে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে বলে গেছেন। সুর্নিদিষ্ট করে বলেছেন অনেক কিছু।

বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িতে সবসময় সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট পাহারায় থাকত। পুলিশের একটা টিম ছিল। ওই ঘটনার একদিন অথবা দুদিন আগে কুমিল্লা থেকে একটি ইউনিট আনা হয়েছিল। তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়। অথবা তারা হয়তো এটার সঙ্গে প্যাসেভলি কোলাবোরেট করেছে।

এখানে দুটো বিষয় আমাদের চিন্তা করতে হবে। প্রথমত, ১৫ আগস্ট আসলেই কী হয়েছিল। কারণ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগে সেরনিয়াবাত নিহত, শেখ ফজলুল হক মনি নিহত। তাদের বাড়িতে আগে হামলা হয়েছিল। এটা বঙ্গবন্ধুর নলেজে ছিল কি ছিল না, এটা নিয়ে আমরা কখনো অনুসন্ধান করিনি। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা হওয়ার পরেও তিনি অন্তত ঘণ্টা জীবিত ছিলেন। জেনারেল সফিউল্লাহর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যে কথাবার্তা হয়েছে, তা আমরা পাচ্ছি তার বয়ানে। আমরা বঙ্গবন্ধুর ভাষ্যটা পাচ্ছি না। পাওয়ার সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধু আর কার কার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছিলেন? তিনি কাকে কাকে ফোন করেছিলেন, তা আমরা জানি না। আসলে ঘটনাটা কী হয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকে সাবধান করা সত্ত্বেও তিনি কোনো উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিনা, নিলে কী নিয়েছিলেনআমরা যদি সত্যিকারের তদন্ত করতে চাই, তাহলে প্রশ্নগুলো করা দরকার।

 

রাহাত মিনহাজ: তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, নিখুঁত ওই পরিকল্পনার এখনো অনেক কিছুই অজানা?

মহিউদ্দিন আহমদ: ১৫ আগস্ট কি একাধিক ক্যু হয়েছিল? প্রশ্নটা মাঝে মাঝেই আমার মধ্যে জাগে। কারণ কিলিং মিশনে যারা ছিলেন, তারা সবাই সবটা কি জানতেন? এটাও কিন্তু প্রশ্ন। হয়তো একজন সবটা জানতেন, বাকিরা হয়তো জানতেন না, হয়তো কিছুটা কম জানতেন। পরিকল্পনাটা ছিল একদম নিখুঁত। এটার যে মাস্টারমাইন্ড, লেফটেন্যান্ট-ক্যাপ্টেনের প্ল্যান এটা, এমনটা আমি মনে করি না। আবার খন্দকার মোশতাক এমন প্ল্যান বানিয়ে দিয়েছেন বলেও আমি মনে করি না। এটার পেছনে বিশাল একটা পরিকল্পনা ছিল। এটাকেই ষড়যন্ত্র বলতে পারেন। কিন্তু আমি মিলিটারি ল্যাঙ্গুয়েজে বলব পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনা একদিনে হয়নি। বাস্তবায়নটা আমরা দেখেছি দেড় ঘণ্টায় শেষ হয়েছে। যদি আমরা ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টকে পুরোপুরি উন্মোচন করতে চাই। পুরো তদন্তটা করতে হবে।

 

রাহাত মিনহাজ: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টার মাইন্ড কারা ছিলেন, আন্তর্জাতিক সংযোগগুলো কী ছিল, কীভাবে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলএগুলো নিয়ে কমিশন গঠনের কথা অনেক সুধীজন কিংবা রাজনীতিবিদ বলে থাকেন বিভিন্ন আলোচনায়। কিন্তু এটার বাস্তবায়ন আমরা আজও দেখি না।

মহিউদ্দিন আহমদ: মুশকিল হলো, বর্তমান সরকার এরই মধ্যে বলে দিয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আমরা করেছি। এখন যে কয়েকজন পলাতক খুনি আছেন, তাদের ফিরিয়ে আনার জোর প্রচেষ্টা চলছে। তারা ধরেই নিয়েছে বিচার হয়েছে। তারা এর বাইরে আর কী তদন্ত করবে! কিন্তু আমি মনে করি, রাষ্ট্র যদি উদ্যোগ না নেয়,   ধরনের তদন্ত প্রাইভেট লেভেলে সম্ভব নয়।

 

রাহাত মিনহাজ: আপনি ছাত্ররাজনীতি করেছেন। আপনার কাছে বঙ্গবন্ধুকে প্রথমবার দেখার স্মৃতি সম্পর্কে জানতে চাই?

মহিউদ্দিন আহমদ: বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল আর আমি একসঙ্গে ঢাকা কলেজে পড়েছি। আমরা ক্লাসমেট, এক ছাদের নিচে দুই বছর। তখন কামাল আমাদের খুবই ঘনিষ্ঠ এবং তার বাবা তখন জেলে। কামালের কাছে প্রায়ই আমরা গল্প শুনতাম। পরে ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে ছাত্রলীগ করব। ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়ে যায়। শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাকএদের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক হয়ে ওঠে। তখন পুরানা পল্টনে আওয়ামী লীগের অফিস দোতলা একটা ভবনে। একতলার এক কোনায় বাংলার বাণী অফিস, আরেক কোনায় সিটি আওয়ামী লীগের অফিস। দোতলায় এক পার্টে সেন্ট্রাল অফিস, আরেক পাশে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের অফিস। সেখানে আলাদা একটা ঘর ছিল। সেখানে টাইপ করা কাগজে লেখা ছিলনেতার ঘর এখানে বঙ্গবন্ধু বসতেন। ওই ঘরে ঢোকার জন্য তেমন কোনো প্রটোকল ছিল না। বঙ্গবন্ধুর একটা স্বভাব ছিল, কাউকে দেখলেই পিঠে একটা থাপ্পড় দেয়া, গাল টিপে দেয়াএগুলো তিনি করতেন। ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি, তখন আমাদের কিবা বয়স। এগুলো আমরা দিনের পর দিন দেখতাম। আমাদের বাবা-চাচাদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলি, সে রকমভাবে কথা বলতাম। আসলে তখন তাঁকে দেখে শুধু আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট ভাবতাম না, তিনি তো আমাদের বন্ধুরও বাবা। সে হিসাবেও এক ধরনের ভালো সম্পর্ক ছিল। আমি যতদিন বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি, কখনো তাঁকে কপাল কুঁচকানো বা ভাঁজ পড়া অবস্থায় দেখিনি। এটা আসলে বুঝিয়ে বলার মতো নয়। না দেখলে বোঝা যাবে না। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন