শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

প্রথম পাতা

করোনাকালে মজুরি কমেছে কৃষি শ্রমিকের

সাইদ শাহীন ও তবিবুর রহমান

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার কৃষি শ্রমিক সৈয়দ উল্লাহ। গত বছর বোরো মৌসুমে ধান কাটার কাজে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি পেতেন। এবার পেয়েছেন সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। শুধু সিলেট নয়, দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলের মধ্যে ৯টিতেই কৃষি শ্রমিকের মজুরি কমেছে করোনাকালে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা মহামারীর কারণে কাজ হারিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন অনেক শ্রমিক। জীবিকার তাগিদে তাদের বড় অংশই গ্রামে কৃষি শ্রমিকের কাজে যুক্ত হয়েছেন। ফলে কৃষি শ্রমিকের সংকট ছিল না এবার। এছাড়া আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় বছর হাওড় অঞ্চলের বোরো ধান কাটার ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। কৃষি শ্রমিকের অভাব পূরণ করেছে হারভেস্টার রিপার মেশিন। যার প্রভাব পড়েছে কৃষি শ্রমিকের মজুরিতে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এক গবেষণা বলছেকরোনাকালে বোরো মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের মজুরি সবচেয়ে বেশি কমেছে সিলেট, রাজশাহী রংপুর অঞ্চলে। অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম কুমিল্লায় বিভিন্ন মাত্রায় মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। মজুরি অপরিবর্তিত ছিল যশোর রাঙ্গামাটি অঞ্চলে।কভিড-১৯ যুগে খাদ্যনিরাপত্তা: বাংলাদেশ কি শিগগিরই খাদ্য সংকটে পড়ছে?’ শীর্ষক গবেষণায় ২০১৯ সালের বোরো মৌসুমের তুলনায় চলতি বছরের বোরো মৌসুমের কৃষি শ্রমিকের মজুরির পার্থক্য তুলে ধরেছে ব্রি।

সারা দেশের কৃষি অঞ্চলকে সাধারণত ১৪টি অঞ্চলে বিভক্ত করে পরিচালিত গবেষণায়  দেখা গেছে, সিলেট রাজশাহী অঞ্চলে কৃষি শ্রমিকের মজুরি কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। এছাড়া রংপুর অঞ্চলে ১৫, বগুড়ায় ১৩, দিনাজপুরে ১১, ফরিদপুরে ১০, বরিশালে , ময়মনসিংহে এবং খুলনা অঞ্চলে শতাংশ হারে মজুরি কমেছে।

কৃষি শ্রমিকের মজুরি কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে হাওড় পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার সিলেট বিভাগের সভাপতি কাসমীর রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, এবার গ্রামে কৃষি শ্রমিক অনেক বেশি ছিল। করোনাভাইরাসের প্রভাবে শহর থেকে অনেকেই গ্রামে ফিরে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন। আবার বালি পাথর শ্রমিকসহ অন্য শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে ধান কাটায় যুক্ত হয়েছেন। শ্রমিক বেড়ে যাওয়ার কারণে শ্রমের মূল্য কমেছে। অন্য যেকোনো খাতের শ্রমিকদের থেকে অনেক কম মজুরি পান কৃষি শ্রমিকরা। অন্যদের পক্ষে কথা বলার মানুষ থাকলেও আমাদের কৃষি শ্রমিকদের পক্ষে কেউ নেই।

দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে কৃষি শ্রমিদের মজুরি কমলেও বেড়েছে তিন অঞ্চলে। মজুরি হার বৃদ্ধির তালিকার প্রথমে অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম। সেখানে মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩ শতাংশ হারে। শতাংশ মজুরি বেড়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কুমিল্লা অঞ্চল। অন্যদিকে ঢাকা অঞ্চলে মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে শতাংশ। তবে মহামারীতে কৃষি শ্রমিকের মজুরির ওপর প্রভাব ফেলতে পারেনি যশোর রাঙ্গামাটি অঞ্চলে। সেখানে মজুরি অপরিবর্তিত ছিল।

ব্রির মহাপরিচালক . মো. শাহজাহান কবীর বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড-১৯ শুরু হওয়ার পর পরই শহর থেকে চাকরি হারিয়ে বা নিরাপত্তার কারণে গ্রামে চলে যায়। আর এই সময়টি ছিল মূলত বোরো মৌসুমের ধান কাটার পিক সিজন। ফলে অন্যান্যবারের চেয়ে চলতি বোরো মৌসুমে ধান কাটার শ্রমিক সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। এতে গ্রামে কৃষি শ্রমিকের মজুরি অনেকটাই কমে যায়। তাছাড়া গ্রাম অঞ্চলে এবারের মৌসুমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কার্যক্রম ব্যাপকভাবে পরিচালনা করা হয়েছে। ফলে একদিকে শ্রমিকের উদ্বৃত্ত সরবরাহ, অন্যদিকে যন্ত্রের মাধ্যমে ধান কাটা যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা। এতে অধিকাংশ এলাকায় মজুরি কমে গেছে। তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম কুমিল্লা অঞ্চলে শ্রমিকের সংকট থাকার কারণেই মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল স্ট্যাটিসটিকস ২০১৮শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে কোটি ৪৩ লাখ ৯২ হাজারের বেশি মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ৮৭ লাখ ৬৫ হাজার ১০৭ জন বা প্রায় ৩৫ দশমিক ৯০ শতাংশই পারিবারিক হেলপার। এছাড়া স্ব-কর্মসংস্থান হয়েছে ৮১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৭ জনের বা প্রায় ৩৩ দশমিক ৫২ শতাংশের। আর কৃষি শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন ৭২ লাখ ৯১ হাজার ৮৪০ জন বা প্রায় ৩০ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্যভাবে নিয়োজিত রয়েছেন লাখ ৬৮ হাজার শ্রমিক। যারা কোনো না কোনোভাবে মজুরি বৈষম্যের শিকার। এই খাতে বেশি বৈষম্যের শিকার হন নারী কৃষি শ্রমিকরা। পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় অর্ধেকের কম মজুরিতে কাজ করেন তারা। ফলে করোনাকালে নারী শ্রমিকরাও সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দেশে নারী শ্রমিক রয়েছেন প্রায় ৭৭ লাখ।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন