সোমবার | সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ | ৫ আশ্বিন ১৪২৭

ফিচার

পর্যটনে ধস, সেইসঙ্গে বিপন্ন বন্যপ্রাণির অভয়াশ্রয়

বণিক বার্তা ডেস্ক

দুই দশক আগে বেনি নদীর তীরে ছোট্ট রুরেনাবাক গ্রামে ৪ হাজার হেক্টর (৯ হাজার ৮৮৫ একর) জমি কেনেন রোজা মারিয়া রুজ। তার উদ্দেশ্য ছিল বলিভিয়ান অ্যামাজনের এই জমিকে বন্যপ্রাণির ব্যক্তিগত সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা।

ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির মতে, নিকটবর্তী মাদিদি ন্যাশনাল পার্ক বিশ্বের সবচেয়ে জীববৈচিত্র্যময় সুরক্ষিত অঞ্চল, যা গড়ে তোলার পেছনে অন্যতম সেনানি ছিলেন রুজ। কিন্তু মাদিদির সুরক্ষায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে সরব কণ্ঠের কারণে তিনি পড়েন তোপের মুখে। তাকে বের করে দেয়া হয়।

হাল না ছেড়ে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে নদীর তীরে ব্যক্তিগত রিজার্ভটি গড়ে তোলেন এবং নীলরঙা ঠোঁটের পাখির নামে এটির নামকরণ করেন ‘সিরিয়ার’। ২০২০ পর্যন্ত সিরিয়ার ইকো রিজার্ভে তিনশরও বেশি প্রজাতির পাখি এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিরল স্তন্যপায়ী সব প্রাণি যেমন: ছোট চিতাবাঘ, বানর, জাগুয়ার, শুকরের মতো স্তন্যপায়ী জন্তু আর নানা পোকা-মাকড়ের নিরাপদ আবাস ছিল এটি। 

অ্যামাজনের ছোট্ট এই ভূমিকে রিজার্ভ হিসেবে সফল করে তোলার পেছনে বিদেশী ইকো-টুরিস্টদের বিরাট অবদান রয়েছে, যারা দিনপ্রতি অন্তত ১০০ ডলার করে দিতেন এবং অনেকেই রাত্রিযাপন করে প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করতেন এবং সেখানকার বাগান থেকে আহরিত সবজি দিয়ে রান্না করা ঘরোয়া স্টাইলের খাবার খেতে পছন্দ করতেন।

এরপর আঘাত হানল মহামারী। ফলে ২৩ মার্চ থেকে একজনও পর্যটককে স্বাগত জানানোর সুযোগ মেলেনি সিরিয়ারের। আয় বন্ধ, সঞ্চয়ও তেমন নেই। ফলে রুজকে বাধ্য হয়েই স্টাফের সংখ্যা ৪০ থেকে কমিয়ে সাতজনে নামিয়ে আনতে হয়। কিন্তু এই সাতজন দিয়ে পুরো অঞ্চলটি পাহারা দেয়া কিংবা তদারক করা অসম্ভব। অ্যামাজনের এ অঞ্চলে চোরাকারবারি আর দখলদারদের দৌরাত্ম্য। এরই মধ্যে সিরিয়ারের ৭ একর জমি বেদখল হয়ে গেছে।

রুজ বলেন, ‘এখন অন্য কোনো সহযোগিতা ছাড়া আর চলতে পারছি না।’ গোফান্ডমির কথা ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আমরা যদি নজরদারি বাড়াতে না পারি কিংবা সিরিয়ারকে সুরক্ষা দিতে না পারি, তবে যারা কষ্টে দিনযাপন করে তারা গাছ কেটে নেবে এবং সহজে অর্থ উপার্জনের জন্য এসব কাঠ হিসেবে বিক্রি করবে।’     

উন্নয়নশীল বিশ্বের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এই সংরক্ষণ প্রকল্প বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেটি ২০২০ সালে এসে কভিড-১৯-এর কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে তার বন্যপ্রাণিদের রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে। 

হুমকির মুখে ওয়াইল্ডলাইফ ট্যুরিজম

মহামারীর শুরুর দিকে ইন্টারনেট দুনিয়ায় একটা ঘটনা নিয়ে হৈচৈ পড়ে যায়। বার্সেলোনা শহরে বুনোশুকর, চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে বনবিড়াল আর ভেনিসের খালে ডলফিনের দেখা মিলেছে (যদিও শেষেরটি ভুয়া সংবাদ প্রমাণিত হয়েছে)। করোনাভাইরাসে সংক্রমণ বিস্তার রোধে লকডাউনের সময় বন্যপ্রাণিরা অবাধে ঘোরাফেরা করার সুযোগ পায়। বন্যপ্রাণিদের স্বাধীনভাবে চলাফেলার এসব ‘ভালো সংবাদ’ আমরা পেলেও আছে কিছু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতাও। ট্যুরিজম এখন ভঙ্গুর এক পিলার যার উপরই মূলত দশকের পর দশক ধরে দাঁড়িয়েছিল বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ প্রকল্পগুলো। তারা বন্যপ্রাণি, পাচার হওয়া প্রাণি, বাস্তুহারা প্রাণিদের রক্ষার জন্য কাজ করতো, তাদের আবাস গড়ে তুলতো এবং মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে টেকসই সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা করতো। 

বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে যখন পিলার এক রাতের মধ্যেই ভেঙে পড়ল, তখন গোটা ব্যবস্থাটিও ভেঙে পড়ল।

ইউএস ন্যাশনাল পার্কের মতো চিত্র সর্বত্র নয়। ওয়াইল্ডলাইফ রিজার্ভগুলো এখন খালি। প্রচলিত কথার উল্টোভাবে বললে, এটা প্রাণিদের জন্য ভালো কিছু নয়। কেন? ইকো-টুরিস্টরা ভ্রমণ করলে কাঠ চোরাকারবারীরা দূরে থাকে। এছাড়া পর্যটকদের পয়সায় যে তহবিল হয় সেটি দিয়ে স্টাফদের বেতন দেয়া সম্ভব, যারা রিজার্ভের সব প্রাণি ও গাছপালার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন। এই অর্থে অ্যানিম্যাল রেসকিউ সেন্টার ও পশু হাসপাতালও সচল রাখা সম্ভব হয়। এছাড়া এটা গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের আয়েরও একটি উৎস।

২০১৯ সালে ওয়াইল্ডলাইফ ট্যুরিজম সেক্টরে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার রাজস্বের পূর্বাভাস দিয়েছিল ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (ডব্লিউটিটিসি)। এ খাতে ২ কোটি ১৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। যদিও কভিড-১৯ মহামারীর কারণে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা এখন চরম ঝুঁকির মুখে।

সূত্র: সিএনএন

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন