বুধবার | সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭

শেষ পাতা

তথ্য সংশোধন না হওয়া

শর্ট শিপমেন্টের পণ্য রফতানিতে জটিলতা

রাশেদ এইচ চৌধুরী চট্টগ্রাম ব্যুরো

বন্দর দিয়ে রফতানি কার্যক্রমে শর্ট শিপমেন্টের তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে হালনাগাদ করা হচ্ছে না। ফলে তথ্য সংশোধন ছাড়া রফতানিকারকদের পক্ষে পরবর্তী সময়ে শর্ট শিপমেন্টের অবশিষ্ট পণ্য রফতানিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। রফতানি মূল্য আংশিক অপ্রত্যাবাসিত হিসেবে প্রদর্শিত হওয়ায় নগদ সহায়তা ইডিএফ লোন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। অন্যদিকে রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি সংক্রান্ত পরিসংখ্যানে তারতম্য বাড়ছে। কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবে গত ছয় মাসে শর্ট শিপমেন্টের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।

কাস্টমসের রফতানি তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রফতানি প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার রফতানি চালানের বিপরীতে বিল অব এক্সপোর্ট শুল্কায়ন হয়। পণ্যের চালান লিয়েন ব্যাংক কর্তৃক ইস্যু হওয়া ইএক্সপি (এক্সপোর্ট পারমিশন) অনুযায়ী পণ্যের শুল্কায়ন পূর্বক জাহাজীকরণের আগে বিভিন্ন অফডকে কাস্টমস কর্মকর্তারা পণ্যের কায়িক পরীক্ষার সময় শিপিং বিলে ঘোষিত পণ্যের চেয়ে কম পাওয়া গেলে কাস্টমস কর্তৃক শর্ট শিপমেন্ট সার্টিফিকেট ইস্যু করে পণ্য জাহাজীকরণ (শিপমেন্ট) করা হয়। পরে শর্ট শিপমেন্ট সংশ্লিষ্ট লিয়েন ব্যাংকে সরবরাহ করে ইএক্সপি সংশোধন করা হয়। কিন্তু শর্ট শিপমেন্ট সার্টিফিকেটের তথ্য এনবিআরের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে আর হালনাগাদ করা হচ্ছে না।

বিজিএমইএর সহসভাপতি এএম চৌধুরী সেলিম প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্দর দিয়ে আমার যে পরিমাণ পণ্য কম যাচ্ছে অর্থাৎ শর্ট শিপমেন্ট হচ্ছে তা অ্যাসাউকুডা ওয়ার্ল্ডে হালনাগাদ করা হচ্ছে না। শর্ট শিপমেন্ট হলে এর আগে আমরা কাস্টমসের কাছ থেকে একটি শর্ট শিপমেন্ট সার্টিফিকেট নিতাম। ইএক্সপিতে কী তথ্য আছে আর চালানে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু পণ্য রফতানি হচ্ছে তা এতে উল্লেখ করা হতো। রফতানি করা পণ্যের প্রকৃত তথ্য এতে উল্লেখ থাকায় ব্যাংকে নিয়ে জটিলতা তৈরি হতো না। তবে এখন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী শর্ট শিপমেন্টের তথ্য এনবিআরের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে আপলোড হবে। আমরাও এতে আপত্তি করিনি। এখন অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে অপশনটি চালু না করায় তা আপলোড করা যাচ্ছে না। প্রস্তুতি ছাড়া নতুন নিয়ম চালু করায় বাস্তবে যে কম পরিমাণ ভ্যালুর পণ্য রফতানি হচ্ছে সেটার কোনো ডকুমেন্টস হচ্ছে না। ফলে ব্যাংক কোনো ধরনের ডকুমেন্টস ছাড়া এখন এক্সপি সংশোধন করে দিচ্ছে না। এতে ফিজিক্যাল ওভারডিউ না হলেও ডকুমেন্টসে ওভারডিউ থাকার কারণে ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে। এখন ব্যাংক বায়ারের কাছে যে মূল্যের ডকুমেন্টস পাঠাচ্ছে, বাস্তবে কিন্তু সে পরিমাণ ভ্যালুর পণ্য রফতানি হচ্ছে না। তাই অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে আপলোড দেয়ার সুযোগ না হওয়া পর্যন্ত আগের সিস্টেমে ফিরে রফতানি কার্যক্রমকে স্বাভাবিক রাখতে এনবিআরকে অনুরোধ করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সম্প্রতি পোশাক রফতানিকারকদের পক্ষ থেকে দেয়া চিঠিতে বলা হয়, তৈরি পোশাক রফতানি প্রক্রিয়ায় ন্যূনতম সময়ে রফতানি কার্যক্রম সম্পাদন করতে হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের প্রতিদিনের শর্ট শিপমেন্টের তথ্য পরবর্তী দিন সকালে এনবিআরের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে এন্ট্রি দেয়া হলে কার্যক্রম সহজীকরণ হবে। পণ্য স্টাফিং হওয়ার পর বিল অব এক্সপোর্ট অ্যাসেসমেন্টের জন্য দাখিল করা হলে বিল অব এক্সপোর্ট সংশোধনের পরিমাণ শতাংশে নেমে আসবে। শতাংশ সংশোধনের প্রয়োজন হলে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সংশোধনীতে ক্ষমতা দেয়া হলে শর্ট শিপমেন্ট সার্টিফিকেট ইস্যু করার তেমন প্রয়োজন হবে না। বিষয়টি এনবিআরের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।

রফতানিকারকদের পক্ষ থেকে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, রাতের বেলা সাধারণত বেসরকারি অফডকগুলোতে সার্বক্ষণিক কাস্টমস কর্মকর্তাদের উপস্থিতি থাকে না। ফলে স্টাফিং পরবর্তী সময়ে শুল্কায়নে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণসহ জটিলতায় ক্রেতার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট জাহাজে রফতানি চালান তুলে দেয়া সম্ভব হবে না। এতে রফতানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। রফতানি চালান স্টাফিং পরবর্তী সময়ে শর্ট শিপমেন্ট হলেও ইএক্সপি সংশোধন করে বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করতে হবে। এতে সময়ক্ষেপণ দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হবে। এছাড়া বেসরকারি ওয়্যারহাউজগুলোতে থাকা রফতানি পণ্য চালানের বিল অব এক্সপোর্ট শুল্কায়নে বিলম্ব হলে এসব অফডকে স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে অতিরিক্ত রফতানি পণ্য চালান সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে না। বেসরকারি অফডকগুলোতে দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কর্তৃক অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে শর্ট শিপমেন্টের তথ্য হালনাগাদ করা হলে রফতানি কার্যক্রম সহজে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমানে প্রস্তাবিত পণ্য চালান স্টাফিং পরবর্তী সময়ে পরীক্ষণপূর্বক শুল্কায়নে রফতানি কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে।

এর আগে ইপিবি বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি পরিসংখ্যানের তারতম্যের বিষয়টি নিষ্পত্তিবিষয়ক একটি সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রথম সচিব (কাস্টমস পলিসি) একেএম নুরুল হুদা আজাদ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ শর্ট শিপমেন্টের ক্ষেত্রে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে সংশোধনের বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিল অব এক্সপোর্ট ইস্যুর পর তা সংশোধনের ক্ষমতা অর্পণের বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। তিনি সেখানে জানান, প্রতিদিন পাঁচ হাজার বিল অব এক্সপোর্ট ইস্যু এবং এর প্রায় ৬০ শতাংশ ইস্যুর পর সংশোধন করতে হয়। বর্তমান অফিস ম্যানুয়াল অনুযায়ী সহকারী কমিশনার তার ওপরের কর্মকর্তারা এটা সংশোধন করতে পারেন। কিন্তু বিপুলসংখ্যক সংশোধন দুই থেকে তিনজন সহকারী কমিশনারের পক্ষে সম্পাদন বেশ দুরূহ। এজন্য বিল অব এক্সপোর্ট সংশোধন যেন করা না লাগে সে ব্যবস্থা করতে হবে অর্থাৎ পণ্য স্টাফিং করার পর অ্যাসেসমেন্ট সম্পাদন করতে হবে। এতে সংশোধনের পরিমাণ শতাংশে নেমে আসবে। শতাংশ সংশোধনের প্রয়োজন হলে সে ক্ষমতা রাজস্ব কর্মকর্তাদের অর্পণ করা যেতে পারে। তারা বর্তমান পদ্ধতিতে অ্যাসাইকুডাতে সংশোধনী সম্পন্ন করবেন।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, যত মূল্যের পণ্য রফতানি হবে, তার সমপরিমাণ শিপিং বিল ইএক্সপি সনদ নিতে হয়। নানা কারণে ক্রেতারা বিভিন্ন সময়ে অর্ডারের চেয়ে কম পণ্য পাঠাতে বলেন। আবার এখানকার রফতানিকারকরাও কাঁচামাল সংকট বা ভিন্ন কোনো কারণে ইএক্সপিতে থাকা তথ্যও চেয়ে কম পণ্য পাঠাতে বাধ্য হন। এক্ষেত্রে আগে কাস্টমস থেকে শর্ট শিপমেন্ট সার্টিফিকেট নিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে ফেলা যেত কিন্তু হঠাৎ করে শর্ট শিপমেন্ট সার্টিফিকেট কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে আপলোড নির্দেশনা দেয়ায় বেকায়দায় পড়েছে রফতানিকারকরা। কারণ প্রযুক্তি সিস্টেম শর্ট শিপমেন্ট সার্টিফিকেট আপলোডের জন্য প্রস্তুত করা হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোও প্রকৃতপক্ষে কত ডলারের পণ্য কম রফতানি হয়েছে, তা সমন্বয় করতে পারছে না। আগে যখন ম্যানুয়াল সিস্টেম ছিল তখন কাস্টমস থেকে শর্ট শিপমেন্ট সার্টিফিকেট নিয়ে গেলেই ব্যাংক সেটি সঙ্গে সঙ্গে সমন্বয় করে দিত। এতে করে রফতানিকারক যখন পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট থাকা পণ্য রফতানি করতে উদ্যোগ নেন, তখন ব্যাংক থেকে বলা হচ্ছে রফতানির কোটা শেষ। এতে প্রত্যাশিত বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছেন তারা। দেশে রফতানির বিপরীতে যথাযথ অর্থ দেশে না আসার বিভিন্ন কারণের মধ্যে শর্ট শিপমেন্ট একটি অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন