শনিবার | সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

ইউট্যাব: সাধারণ শিক্ষকদের স্বার্থ রক্ষা নাকি প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শের পুনর্বাসন?

মো. মাহবুব আলম প্রদীপ, মো. ফজলুল হক, হাসান মোহাম্মদ রোমান, মো. মশিউর রহমান, সাব্বীর আহমেদ চৌধুরী

ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) একটি ভার্চুয়াল প্লাটফর্ম (ফেসবুক), যা বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণা ও বিভিন্ন একাডেমিক ব্যাপারে মতামত আদান-প্রদান এবং আলোচনার উদ্দেশ্যে ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করে। প্রাথমিক উদ্দেশ্য শিক্ষা ও গবেষণা হলেও পরবর্তীতে এটি শিক্ষকদের অধিকারবিষয়ক আলোচনার প্লাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। দীর্ঘ প্রায় এক যুগের পথ চলায় ইউট্যাব কয়েকটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রায় সব শিক্ষককে একত্র করতে সক্ষম হয়। তার মধ্যে অষ্টম বেতন স্কেল অন্যতম। অষ্টম বেতন স্কেলে শিক্ষকদের মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ায় প্রায় সব শিক্ষকই এর প্রতিবাদ করেন। ইউট্যাব একটি কমন প্লাটফর্ম হওয়ায় দলমত নির্বিশেষে প্রায় সবাই নিজেদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারে মতামত প্রদান করেন। বছরখানেক আগে সরকার কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হলে আবারো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ইউট্যাবে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে থাকেন। ঠিক তখনই ইউট্যাবের উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে। তখন লক্ষ করা গেছে যে অভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালার পক্ষে যারা মত দিয়েছেন, তাদেরকে অশালীন ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে নাজেহাল করা হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষকই ইউট্যাবে নিজেদের মতামত দেয়া থেকে বিরত থাকেন। যেহেতু অভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালার কিছু ভালো দিক ছিল, সেহেতু অনেক শিক্ষকই এর পক্ষে মত দেন। ভালো দিকের মধ্যে ছিল শিক্ষা ছুটির ব্যাপারে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমান সুযোগ প্রদান করা। বর্তমান নিয়মে শিক্ষা ছুটির ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে সবাই সমানভাবে শিক্ষা ছুটি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতেন। এমনকি পদোন্নতির ব্যাপারেও একই রকম অবস্থা লক্ষণীয়। এ অবস্থায় কোনো কোনো শিক্ষক অভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালার স্বপক্ষে অবস্থান নেন। যেসব শিক্ষক এই নীতিমালার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী দ্বারা দলবাজ, দলকানা, দলদাস, ধান্ধাবাজ, চাটুকার এবং অন্যান্য মানহানিকর শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে অপমান, অপদস্থ করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের দালাল বলেও গালিগালাজ করা হয়েছে। সরকারের একটি নীতির ব্যাপারে সবাই যেমন একমত হবেন না, ঠিক তেমনি সবাই একযোগে ভিন্ন মতও পোষণ করবেন না। তাই বলে সরকারি নীতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করলেই দলবাজ হয়ে যান? কোন যুক্তিতে? উল্লেখ্য, এসব ব্যাপারে বারবার অ্যাডমিন প্যানেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার প্রতিকার পাওয়া যায়নি; বরং ক্ষেত্রবিশেষে অ্যাডমিন নিজেই এসব শব্দ প্রয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। 

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও জাতীয় চার নেতার একজন ক্যাপ্টেন এমএ মনসুর আলীর সন্তান মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দুজন শিক্ষকের অশালীন মন্তব্যের জেরে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে এই ইউট্যাব প্রতিক্রিয়াশীল রাজননৈতিক আদর্শের আঁতুড়ঘর। এবারো বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ভিন্ন মত দেখা দেয়। ভিন্ন মতের মূল কারণ মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে শিক্ষকদের উল্লাস এবং অশালীন ভাষা প্রয়োগ। প্রগতিশীল শিক্ষকরা মনে করেন মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এমন নগ্ন উল্লাস এবং কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার অনভিপ্রেত এবং শিক্ষকসুলভ নয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকসমাজ এরই মধ্যে মত ব্যক্ত করেছে যে শিক্ষকদের অশালীন ভাষা প্রয়োগ এবং গ্রেফতার কোনোভাবেই সমর্থন করে না। এ ইস্যুতে একজনের মতের সঙ্গে অন্যদের ভিন্ন মত থাকতেই পারে। কিন্তু এবারো প্রত্যক্ষ করা গেছে যে প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষকরা অশালীন ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রগতিশীল শিক্ষকদের থামানোর চেষ্টা করেছেন। মতের বিরোধিতা কি সুন্দর ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে করা যায় না? যুক্তিতর্কের মাধ্যমে কি যুক্তির যথার্থতা তুলে ধরা যায় না? প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী মতাদর্শে বিশ্বাসী হলে যদি দলবাজ হয়, তাহলে বিএনপি-জামায়াত মতাদর্শে বিশ্বাসী হলে তাকে কী বলা যায়? এসব শব্দ প্রয়োগে বিরত থাকার ব্যাপারে বারবার অনুরোধ করা হলেও অ্যাডমিন প্যানেল থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যেহেতু অ্যাডমিন প্যানেল থেকে কোনো প্রকার প্রতিকার পাওয়া যায়নি, সেহেতু প্রগতিশীল শিক্ষকরা প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। এই অব্যাহত প্রতিবাদকে সিনিয়র শিক্ষকদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার না করার অভিযোগে প্রগতিশীল শিক্ষকদের স্ট্যাটাস দেয়া এবং মন্তব্য প্রদান করা থেকে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়। এমনকি অ্যাডমিন প্যানেল থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রগতিশীল শিক্ষকদের রাজনৈতিক আদর্শ নিশ্চিত হওয়াসাপেক্ষে তাদের ব্যাপারে মানহানিকর পোস্ট দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই পোস্টগুলোয় কোনো প্রকার কমেন্ট করার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ বা ব্যবস্থা রাখা হয়নি। অ্যাডমিন প্যানেল থেকে যেসব সিনিয়রের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেসব সিনিয়র শিক্ষকই বরং অন্যদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। অথচ তাদের ব্যাপারে ইউট্যাব থেকে কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রগতিশীল শিক্ষকরা কিন্তু তাদেরকে দলবাজ কিংবা দলকানা বলেননি। অথচ চাইলেই খুব সহজে রাজাকার কিংবা রাজাকারের উত্তরাধিকার হিসেবে অভিহিত করা যেত। প্রসঙ্গত, যেসব শিক্ষক এসব বাজে ভাষা প্রয়োগ করেছেন, তাদের ব্যক্তিগত প্রোফাইল ঘেঁটে এবং তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেছে যে তারা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবলিক) জামায়াত-বিএনপি মতাদর্শে বিশ্বাসী শিক্ষকসমাজের নিবন্ধিত সদস্য। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কয়েকজন শিক্ষক অতিমাত্রায় আক্রমণাত্মক আচরণ করেছেন, তাদের অধিকাংশই ছাত্রজীবনে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।   

ইউট্যাবে সাধারণ শিক্ষকদের অধিকারের চর্চার চেয়ে বরং সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রদান, আওয়ামী লীগের প্রতি কুত্সা রটনা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে অভিহিত করাসহ নানা রকম অশালীন ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অপপ্রচার অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ ব্যাপারে অ্যাডমিন প্যানেল কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। বরং অ্যাডমিন প্যানেল এই প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শে বিশ্বাসী শিক্ষকদের বরাবর উত্সাহিত করছে। শিক্ষকদের অধিকার রক্ষা করার অর্থ এই নয় যে কথায় কথায় সরকারের নীতির বিরোধিতা করতে হবে। সরকারি নীতির সমালোচনা করা আর সরকার ও আওয়ামী লীগকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা এক নয়। শিক্ষকদের অধিকার রক্ষার নামে ইউট্যাব প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক আদর্শের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের কাজ করছে। এ কাজ করতে গিয়ে বহু বেনামি ও ভুয়া আইডি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রগতিশীল আদর্শকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকেও কটাক্ষ করতে পিছপা হচ্ছে না। একাত্তরে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও এবং লুণ্ঠনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের দমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। ঠিক একইভাবে ইউট্যাবে এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের নামে আজ অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রগতিশীল আদর্শের চর্চাকে রুখে দিতে বদ্ধপরিকর। 


লেখক:

মো. মাহবুব আলম প্রদীপ: সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 

মো. ফজলুল হক: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 

হাসান মোহাম্মদ রোমান: সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

সাব্বীর আহমেদ চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ 
বেগম রোকেয়া বিশ্ববদ্যালয়

মো. মশিউর রহমান: সহকারী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন