মঙ্গলবার | সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ | ১৪ আশ্বিন ১৪২৭

শেষ পাতা

আইপিও অনুমোদনে আগের কোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি চায় না বিএসইসি

মেহেদী হাসান রাহাত

প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে প্রসপেক্টাস আর্থিক প্রতিবেদনে অতিরঞ্জিত মিথ্যা তথ্য দেয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। এর আগে অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে অনেক কোম্পানি পুঁজিবাজারে এসেছে, যেগুলো পরবর্তী সময়ে মন্দ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। তবে আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় না দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গত মে মাসে নতুন চেয়ারম্যান কমিশনাররা দায়িত্ব নেয়ার পর আগের কোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি না করতে অবস্থান নিয়েছে কমিশন।

অতীতে আইপিওতে আসা কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেশকিছু কোম্পানির পারফরম্যান্স হতাশাজনক। কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নেয়া অর্থ লগ্নি করেও ব্যবসায় উন্নতি করতে পারেনি। উল্টো কোম্পানির খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে লোকসান গুনতে হয়েছে বিনিয়োগকারীদের। ২০১০ সালে ধসের পর গত নয় বছরে পুঁজিবাজার থেকে ৯২টি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে নয়টি কোম্পানি রয়েছে, যেগুলো বাজার থেকে ৪৯৯ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করেও ব্যবসায়িক অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি, উল্টো পুঁজিবাজারের সবচেয়ে মন্দ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে আইপিওতে আসার সময় আর্থিক প্রতিবেদন প্রসপেক্টাসে অতিরঞ্জিত তথ্য উপস্থাপনের পাশাপাশি টেকসই ব্যবসায়িক মডেলের বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই না করার কারণেই পরবর্তী সময়ে তাদের পারফরম্যান্স খারাপ হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইপিওর অর্থ কাজে লাগিয়ে ব্যবসায় উন্নতি করতে না পারা এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে জাহিনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স, ফারইস্ট ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ফ্যামিলিটেক্স (বিডি), এমারাল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ, তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডায়িং এবং সি অ্যান্ড টেক্সটাইল। এর মধ্যে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, ফ্যামিলিটেক্স, ফারইস্ট ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, অ্যাপোলো ইস্পাত, এমারাল্ড অয়েল, সি অ্যান্ড টেক্সটাইলের তালিকাভুক্তির বিষয়ে কমিশনের কাছে নেতিবাচক সুপারিশ করেছিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এমনকি তত্কালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিএসইসির কাছে চিঠি পাঠিয়ে অ্যাপোলো ইস্পাতের আইপিও অনুমোদন না দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তাছাড়া ২০১০ সালে সম্পদ বাড়িয়ে দেখানোর কারণে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনসের আইপিও বাতিল করেছিল বিএসইসি। অথচ পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটিকেই আবার আইপিও অনুমোদন দেয়া হয়। তাছাড়া রাইট শেয়ারের অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের কারণে গত বছর কোম্পানিটিকে জরিমানাও করেছে বিএসইসি। বিতর্কিত কিছু কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেয়ার কারণে বিগত কমিশনকে বিভিন্ন সময় সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একসময় কমিশনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান কমিশন আইপিও অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে বেশ সতর্ক রয়েছে। বিতর্কিত দুর্বল কোম্পানি যাতে আইপিও অনুমোদন না পায়, সে বিষয়ে সচেষ্ট রয়েছে কমিশন।

দায়িত্ব নেয়ার পর আইন বিধি-বিধান পরিপালন না হওয়ায় বেশকিছু কোম্পানির আইপিও আবেদন বাতিল করে দিয়েছে নতুন কমিশন। অন্যদিকে ভালো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিচ্ছে। আইপিওর ক্ষেত্রে আইন পরিপালনের বিষয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন বিএসইসির কর্মকর্তারা।

নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর পর্যন্ত আল ফারুক ব্যাগস ইন্ডাস্ট্রিজ, বেকা গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল, এসএফ টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ, জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং, বিডি পেইন্টস বি ব্রাদার্স গার্মেন্টসের আইপিও আবেদন বাতিল করেছে। বিভিন্ন ধরনের সিকিউরিটিজ আইন হিসাবমান লঙ্ঘনের দায়ে কোম্পানিগুলোর আইপিও আবেদন বাতিল করা হয়।

আল ফারুক ব্যাগস ইন্ডাস্ট্রিজ তাদের আইপিও প্রসপেক্টাসে একই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আর্টিসানকে দিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করার পাশাপাশি করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড পরিপালনসংক্রান্ত সনদ প্রত্যয়ন করেছে। অথচ সিকিউরিটিজ আইনানুসারে আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড পরিপালনসংক্রান্ত সনদ প্রত্যয়নের সুযোগ নেই। কারণে কোম্পানিটির আইপিও আবেদন বাতিলের পাশাপাশি কোম্পানিটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি এর ইস্যু ব্যবস্থাপক আইআইডিএফসি ক্যাপিটাল বিএমএসএল ইনভেস্টমেন্টকে ১০ লাখ এবং নিরীক্ষক আর্টিসান চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসকে লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

সম্পদ আয় বাড়িয়ে দেখানোর প্রমাণ পাওয়ায় বেকা গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল এসএফ টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজের আইপিও আবেদন বাতিল করে বিএসইসি। একইভাবে মাস্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় আলোচিত জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের আইপিও আবেদন বাতিল করেছে বিএসইসি। কোম্পানিটি আইপিও প্রসপেক্টাসে অবচয় কম ধার্য করে বেশি মুনাফা দেখিয়েছে। রিসিভেবল বা পাওনা বেশি দেখিয়ে বিক্রির পরিমাণ বাড়িয়ে দেখিয়েছে।

কোম্পানিটির ৩০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের কাছে। অথচ একই সঙ্গে আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট আইপিও প্রক্রিয়ায় জেএমআই হসপিটালের ইস্যু ব্যবস্থাপক হিসেবে যৌথভাবে জনতা ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের সঙ্গে কাজ করছে। পাবলিক ইস্যু রুলস অনুসারে ইস্যুয়ার কোম্পানির সঙ্গে ইস্যু ব্যবস্থাপকের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। কোম্পানিটির আন্তঃগ্রুপ পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বড় ধরনের লেনদেন রয়েছে। কোম্পানিটির মোট বিক্রির ৪৪ শতাংশই আসে স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। ১০৯ কোটি টাকা আন্তঃকোম্পানি ঋণ দিয়েছে জেএমআই হসপিটাল। ফলে আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটির ৭৫ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা দেখছে না কমিশন।

বিডি পেইন্টস আর্থিক প্রতিবেদনে অবচয় খরচ কমিয়ে মুনাফা বাড়িয়ে দেখিয়েছে। একই সঙ্গে পণ্য বিক্রি নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানিটির সম্পদ অতিমূল্যায়িত করে দেখানো হয়েছে। তাছাড়া কোম্পানিটির তিনজন উদ্যোক্তার কনসেন্ট লেটারের লকইন শেয়ার বিক্রি সংক্রান্ত শর্ত লঙ্ঘন করেছে। এসব কারণে কমিশন কোম্পানিটির আইপিও বাতিল করেছে।

সর্বশেষ বি ব্রাদার্স গার্মেন্টসের আইপিও আবেদন বাতিল করেছে বিএসইসি। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে প্লেসমেন্ট শেয়ারের বিপরীতে পাওয়া অর্থ একাধিক ব্যাংক হিসাবে নিয়ে যাওয়া, কমিশনের সম্মতি ছাড়াই শেয়ার মানি ডিপোজিটের বিপরীতে শেয়ার ইস্যু করা, অবচয় কম দেখিয়ে নিট মুনাফা বেশি দেখানো, সংঘবিধিতে (মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক অন্য পরিচালকদের বেতন নেয়ার বিধান না থাকলেও নিয়মিত বেতন-ভাতা নিয়েছে। তাছাড়া কোম্পানির ইকুইটির তুলনায় ঋণ অনেক বেশি। এতে সুদব্যয় তুলনামূলক বেশি থাকায় অস্তিত্ব সংকটের ঝুঁকি রয়েছে। এসব বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে কমিশন কোম্পানির আইপিও আবেদন বাতিল করেছে।

আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিএসইসির মনোভাব জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আইন বিধি-বিধান পরিপালন না করে কেউ পুঁজিবাজারে আসতে পারবে না। আমরা কোনোভাবেই এমন কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেব না। মন্দ কোম্পানি বাজারে এলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি হয় এমন কিছু আমরা অনুমোদন করব না। তাছাড়া অনেক কোম্পানির ব্যবসায়িক মডেলই এমন যে এটি দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে না। এমন কোম্পানিকেও আমরা পুঁজিবাজারে আনব না। যারাই পুঁজিবাজারে আসবে তাদের সবকিছু পরিপালন করেই আসতে হবে। পাশাপাশি ভালো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির আইপিও অনুমোদনের বিষয়ে কমিশন কাজ করছে বলে জানান তিনি।

এদিকে আইপিও নিয়ে কমিশনের কঠোর অবস্থানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন যারা আইপিও নিয়ে নয়ছয় করে, তাদের প্রতি ধরনের কঠোর বার্তার প্রয়োজন ছিল।

বিষয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আইপিওর বিষয়ে কমিশনের অবস্থানকে আমরা শতভাগ সমর্থন জানাচ্ছি। যে কোম্পানিগুলোর আইপিও আবেদন বাতিল করা হয়েছে, এগুলো অনেকদিন ধরেই ঝুলে ছিল। আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করার বিষয়ে আমরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছি। বর্তমান কমিশনের উদ্যোগ আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে সহায়ক হবে। যেসব কোম্পানি আইপিওর জন্য আবেদন করবে, তারা পুঁজিবাজারে আসার যোগ্য হলে অনুমোদন পাবে আর অযোগ্য হলে তাদের আবেদন বাতিল করে দেয়া হবে। পরবর্তী সময়ে তারা সংশোধন করে যদি আসতে পারে আসবে। আইপিওর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেয়া হলেও মার্চেন্ট ব্যাংকের কাজও সহজ হয়। আর আইপিও অনুমোদনের বিষয়ে কমিশনের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি বিনিয়োগকারীসহ বাজারসংশ্লিষ্ট সবার জন্যই ইতিবাচক বলে মনে করছেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন