মঙ্গলবার | সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ | ১৪ আশ্বিন ১৪২৭

শেষ পাতা

লেবানন ছাড়ার আকুতি প্রবাসী বাংলাদেশীদের

আবু তাহের

মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে সময়টা খারাপ যাচ্ছিল লেবাননে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের। এর মধ্যেই বৈরুতে ঘটে গেল ভয়াবহ বিস্ফোরণ। ফলে আরো বেড়ে গেছে অনিশ্চয়তা। অবস্থায় দেশে ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন প্রবাসীরা।

বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যমতে, লেবাননে বর্তমানে দেড় লাখের বেশি বাংলাদেশী রয়েছেন। এসব বাংলাদেশীর সিংহভাগই নারী কর্মী, যারা দেশটির বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাদের মধ্যে ঠিক কতসংখ্যক বাংলাদেশী অবৈধ হয়ে পড়েছেন, তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি দূতাবাস থেকে। তবে লেবাননে সক্রিয় প্রবাসী সংগঠনগুলো জানিয়েছে, কাগজপত্রহীন ৪০ হাজারের মতো বাংলাদেশী দেশটিতে বসবাস করছেন। মূলত দেশে ফেরার তাড়া তাদের মধ্যেই বেশি।

বৈরুতে বর্তমানে বেকার অবস্থায় জীবনযাপন করছেন গৃহকর্মী জলি তার স্বামী। পাঁচ বছর আগে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে লেবাননে গেলেও অবৈধ হওয়ায় আট মাস ধরে কর্মহীন আছেন তিনি। তার স্বামী ক্লিনারের কাজ করতেন। তিনিও পাঁচ মাস ধরে বেকার। অবস্থায় দেশে ফেরার জন্য দূতাবাসে নিবন্ধন করেছেন তারা। এখন উড়োজাহাজের টিকিটের অপেক্ষায় রয়েছেন দম্পতি।

বৈরুত বিস্ফোরণের পর থেকেই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন লেবাননের সাইদা জেলায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশী মো. আব্দুস সবুর। তার ভাষায়, প্রায় লাখ টাকা খরচ করে দেশে এসেছিলাম। কোনো টাকাই ওঠাতে পারিনি। এর বাইরে দেশ থেকে আরো দেড় লাখ টাকা এনে খরচ করে ফেলেছি। এখন এলাকায় নিজের দোকান বন্ধক রেখে দেশে ফেরার জন্য ফ্লাইটের টিকিট কেটে রেখেছি।

আব্দুস সবুরের মতোই দেশে ফিরে যেতে চান প্রবাসী কর্মী জুয়েল রানা, অপু খান, শুভ শিকদার মোশাররফ হোসেনও। বেকার অবস্থায় জীবন কাটানোর পর বিস্ফোরণে সহকর্মীদের বেঁচে থাকার আকুতি দেখেছেন তারা।

বাংলাদেশীদের দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে দূতাবাস বলছে, বৈরুত বিস্ফোরণের আগে থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সর্বশেষ করোনা পরিস্থিতির কারণে স্থবির হয়ে পড়ে লেবাননের অর্থনীতি। এসব কারণে এক বছর আগে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আর্থিক মন্দায় দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে একের পর এক কাজ হারাতে থাকেন বিদেশী শ্রমিকরা। বিশেষ করে যারা অবৈধ রয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তখন থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানাতে থাকেন। তবে বিস্ফোরণের পর এক মুহূর্তও তারা থাকতে চান না লেবাননে।

গত মঙ্গলবার রাজধানী বৈরুত বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। ঘটনায় মারা গেছে ১৩৭ জন, যার মধ্যে চারজন বাংলাদেশী রয়েছেন। এছাড়া নিখোঁজ আছেন ৩৭ বাংলাদেশী। বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন শতাধিক বাংলাদেশী, যাদের মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২১ সদস্যও রয়েছেন।

রাজধানী বৈরুতের ঝিমমাইজি, সাবরা, সাইদা এলাকায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের সঙ্গে কথা হলে বৈরুত বন্দরের বিস্ফোরণের পর আতঙ্কের কথা জানান তারা। সেদিনের সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণের স্মৃতি ভুলতেই পারছেন না প্রত্যক্ষদর্শীরা।

বৈরুতের যে এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটে, তার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে থাকেন প্রবাসী বাংলাদেশী ওবায়দুর রহমান জনি। বিস্ফোরণের সেই দৃশ্য ভুলতে পারছেন না তিনি। বিস্ফোরণের পর লেবাননে থাকা তার খালাতো ভাই নিখোঁজ রয়েছেন।

জনি বলেন, গত তিনদিনেও ভাইয়ের সন্ধান পাইনি। এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছি। দেশ থেকে পরিবারের সদস্যরা বারবার ফোন দিচ্ছে। তার ভাষায়, লেবাননে দীর্ঘদিন বসবাস করলেও এমন আতঙ্ক নিজের ভেতর কখনো বিরাজ করেনি। দিন দিন লেবাননের পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে এখানে থাকাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি ভালো না হলে হয়তো দেশে চলে যাব।

বিস্ফোরণের পর থেকে লেবাননে প্রবাসী বাংলাদেশীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশে ফেরার জন্য সরব হয়ে উঠেছেন।বাবু সাহা দর্শক ফোরাম, লেবানন’, ‘লেবানন প্রবাসী’, ‘লেবানন প্রবাসী বাংলাদেশী হেল্প সেন্টারসহ বিভিন্ন ফেসবুক পেজে বিস্ফোরণের ভিডিও শেয়ার হওয়ার পর সেখানকার শত শত প্রবাসী দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন। তাসলিমা বেগম নামে একজন লেখেন, ‘আমরা দেশে যেতে চাই, কেন কোনো ব্যবস্থা হচ্ছে নামাহবুব আলম নামে একজন লেখেন, ‘আমরা অনেক কষ্টে আছি, দেশে ফিরতে চাই

এদিকে লেবাননে দেয়া বাংলাদেশ সরকারের চিকিৎসা সহায়তা নিয়ে অনেকে প্রশংসা করলেও অনেকে সমালোচনা করতেও ছাড়ছেন না। আবদুল আওয়াল নামে এক লেবানন প্রবাসী লেখেন, ‘আমরা সাহায্য চাই না, টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দেশে যেতে চাই

লেবাননে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর আব্দুল্যাহ আল মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, বিস্ফোরণের কারণে দেশে ফিরতে চাচ্ছেন মূলত অবৈধরা। যারা পাঁচ-ছয় বছর ধরে লেবাননে অবৈধ হয়ে আছেন। যদিও তাদের ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু বিস্ফোরণের কারণে তা আবার হয়তো পিছিয়ে যাবে। তিনি বলেন, বৈধ প্রবাসীরা কেন যাবেন? তারা তো চাইলেই যেকোনো মুহূর্তে চলে যেতে পারেন। তাদের বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় হাজার ৭৪৫ জন বাংলাদেশী নাম নিবন্ধন করেন। নিবন্ধন প্রক্রিয়ার আওতায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথম ধাপে ৪৫০ বাংলাদেশী দেশে ফেরেন। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ বিরতির পর আগস্ট থেকে কাগজপত্রবিহীন প্রবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে আগস্ট দেশটির ডিটেনশন সেন্টারে আটকে থাকা ৬৪ জন বাংলাদেশী কাতার এয়ারওয়েজে করে দেশে ফেরেন। এরপর আগস্ট আরো একটি ফ্লাইটের মাধ্যমে ৬২ বাংলাদেশী দেশে ফেরেন এবং এক সপ্তাহের মধ্যে অসুস্থ ২৫ বাংলাদেশীসহ আরো অন্তত পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশীর নিজ দেশে ফেরার কথা ছিল।

জনশক্তি রফতানি কর্মসংস্থান উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, লেবাননে ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত লাখ ৬৭ হাজার বাংলাদেশী কর্মী গিয়েছেন। তাদের মধ্যে নারী কর্মী গেছেন লাখ হাজার। দেশটিতে ২০১৭ সালে হাজার ৩২৭ জন, ২০১৮ সালে হাজার ৯৯১ ২০১৯ সালে হাজার ৮৬৩ জন বাংলাদেশী গিয়েছেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন