বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ০১, ২০২০ | ১৬ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

বাংলাদেশের অর্থনীতি কি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে?

মামুন রশীদ

সম্প্রতি সিটিব্যাংক এনএ আয়োজিত এক ওয়েবিনারে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের প্রধান বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ল্যারি সামার্স বলছিলেন যে  করোনাকালে সরকার রাষ্ট্রগুলো কীভাবেশক্তিশালীহয়ে এগিয়ে এসেছে। তিনি যেখানে উত্তরণের জন্য ব্যাপক সামাজিক বিনিয়োগ সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে রক্ষণশীল জাতীয় রাষ্ট্রের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেনতখন আমারও কেন জানি মনে হচ্ছিলএই আকালের দিনে সব দুর্বলতা নিয়েও আমাদের এখানে সরকারই যেন ছিল সবচেয়ে এগিয়ে; উন্নয়ন সহযোগী বা তৈরি পোশাকের নামিদামি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান নয়। রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা বা দুর্নীতি নিয়ে আমরা হাস্য-কৌতুক করতে পারি কিন্তু দিন শেষে তারা যেভাবেই হোক ঠিকই বুঝতে পেরেছেন প্রণোদনার টাকা কোথায় বেশি  দিতে হবে।

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের অনেক আগে থেকেই প্রবাসী আয় ছাড়া অর্থনীতির প্রায় সব সূচক খারাপ অবস্থায় ছিল। তবে বিভিন্ন অনুমিত কারণেই করোনার মধ্যেও ধীরে ধীরে আমদানিতে ইতিবাচক ধারা দেখা গেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বছরের জুনে আমদানিতে প্রায় ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের পুরো সময়ে আমদানি প্রায় সাড়ে শতাংশ কমলেও অর্থনীতির প্রীতিকর সূচকে প্রবাসী আয়ের সঙ্গে কিছুটা হলেও যুক্ত হলো আমদানি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে ফেব্রুয়ারি, মার্চ এপ্রিলে অনেক দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ ছিল। বিশেষ করে চীনের বাজার। ঋণপত্র খোলা হলেও জাহাজীকরণের সমস্যায় বেশ কিছুদিন পণ্য আসেনি। এসব পণ্য জুনে এসেছে। অন্যদিকে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সুরক্ষাসামগ্রীর আমদানিও বেড়েছে।

অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে গত অর্থবছরে রফতানি কমে প্রায় ১৭ শতাংশ। শুধু জুনেই আগের বছরের জুনের তুলনায় আড়াই শতাংশ কম রফতানি হয়। করোনার কারণে সরকারের রাজস্ব আদায়ও মন্থর হয়ে পড়ে। ফলে গত মে মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায় কমে প্রায় ৩৫ শতাংশ। বছর শেষে রাজস্ব আদায় প্রাক্কলনের চেয়ে প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রিও কমে গেছে। ফলে ব্যাংকঋণমুখী হয়ে পড়েছে সরকার। গত অর্থবছরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে শতাংশ কমে যায়।

করোনার মধ্যেও বিভিন্ন কারণে ভালো প্রবাসী আয় আসছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে। গত অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে প্রায় ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। পুরো অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসে হাজার ৮২০ কোটি ডলার। জুলাইয়ে সেটা আবার আগের সব রেকর্ড ভেঙে ২৬০ কোটি ডলারে পৌঁছে। জুলাই শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে হাজার ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা দিয়ে প্রায় সাত মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

আমরা জানি, অর্থনীতির গতি ফেরাতে হলে রফতানির পাশাপাশি আমদানিতেও ভালো প্রবৃদ্ধি হতে হবে। কারণ তৈরি পোশাকের, ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের সিংহভাগ আমদানিনির্ভর। কাঁচামাল না এলে পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হবে, যার প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানসহ অর্থনীতির নানা সূচকে।

বিমানবন্দর প্রায় বন্ধ থাকলেও আমাদের সমুদ্রবন্দর কর্মচঞ্চল ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুনে বিভিন্ন দেশ থেকে ৪৮০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা গত বছরের জুনের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি। গত বছরের জুনে ৩৮৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল। আর গত মে মাসে এসেছিল ৩৫৩ কোটি ডলারের পণ্য। ফলে মে মাসের চেয়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে জুনে। এপ্রিলে এসেছিল মাত্র ২৮৫ কোটি ডলারের পণ্য, যা মাস হিসেবে এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মে মাসে ৩১ শতাংশ, এপ্রিলে ৪৪ শতাংশ, মার্চে ১৩ শতাংশ জানুয়ারিতে প্রায় ১৩ শতাংশ কম আমদানি হয়। যদিও ফেব্রুয়ারিতে আমদানিতে দশমিক ৪৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ওই মাসে ৪৭২ কোটি ডলারের পণ্য এসেছিল।

গত অর্থবছরে বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার ৪৭৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে দশমিক ৫৬ শতাংশ কম। ওই অর্থবছরে পণ্য আমদানি হয়েছিল হাজার ৯৯১ কোটি ডলারের। যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্য আমদানিতে দশমিক ৭৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিশেষ করে বর্ধিত চাল ভোগ্যপণ্য আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় ২৫ শতাংশ।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে অনেক দেশে রফতানি বন্ধ ছিল, যা এখন খুলে দেয়া হয়েছে। কারণে যেমনটি কাঁচামাল আমদানি বাড়ছে, রফতানিও নিশ্চয়ই বাড়বে। এছাড়া সুরক্ষাসামগ্রী তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালও আমদানি হচ্ছে। ওষুধের কাঁচামাল আমদানিও বাড়ছে। কারণে সামগ্রিক আমদানি বেড়ে গেছে। তবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি এখনো চাঙ্গা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভোক্তাপণ্য ছাড়া সব ধরনের আমদানিতে নেতিবাচক ধারা ছিল। মূলধনি যন্ত্রপাতি সাড়ে শতাংশ, জ্বালানি দশমিক ৬৭ শতাংশ, শিল্পের কাঁচামালে দশমিক ৪২ শতাংশ অন্যান্য পণ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ কম ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়। আগের অর্থবছরের চেয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে দশমিক ৭৭ শতাংশ কম ভোক্তাপণ্য আমদানি নিষ্পত্তি হয়।

আলোচনায় এসেছে, অর্থনীতি কি তাহলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে? উত্তর সম্ভবত হ্যাঁ। যদিও সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি স্বাস্থ্যনিরাপত্তা দিতে আমরা অন্য বেশির ভাগ গরিব দেশের মতোই পিছিয়ে ছিলাম কিংবা অনেকটা ব্যর্থ হয়েছি, তবে স্বাস্থ্য খাতে অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়েও আগে কলকারখানা খুলে দিয়ে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ফিরিয়ে এনে ভালোই করেছি বলে অন্তত আমার কাছে মনে হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে তৈরি পোশাক ছাড়া প্রায় সব শিল্প খাতে প্রণোদনা বণ্টনে সরকার বা ব্যাংকগুলো পিছিয়ে আছে। তাই হয়তো তৈরি পোশাক খাত সবার আগে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। চীনের সঙ্গে সম্প্রতি সম্পাদিত রফতানি চুক্তি কার্যকর করা গেলে আরো ভালো ফল আসবে। সুরক্ষাসামগ্রী, মিঠা পানির মাছসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের রফতানির সুযোগ কাজে লাগানো গেলে অর্থনীতিতে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। 

আমাদের বেসরকারি খাতের সামনে সব সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে হবে। এমনকি নীতি কাঠামোর সংস্কারে হাত দেয়ারও সময় বোধহয় এগিয়ে এসেছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তথা অর্থনীতির দিকে নতুন করে ফিরে তাকানো, গ্রামাঞ্চলে কর্মরত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার সময়ও এখনই। স্বাস্থ্যসেবায় দায়বদ্ধতার কথা বারবার না-হয় না-ইবা বললাম।

 

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন