বুধবার | সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭

আন্তর্জাতিক ব্যবসা

ইইউর লকডাউনে অস্তিত্ব সংকটে ইউক্রেনের শামুক খামারিরা

বণিক বার্তা ডেস্ক

পাঁচ বছর আগে যখন ইউক্রেনে প্রথম শামুকের খামার খোলা হয়, তখন স্থানীয় গ্রামবাসী তাদের কৌতূহল চেপে রাখতে পারেনি। রাজধানী কিয়েভের দক্ষিণে ভোয়নিভকার বাসিন্দারা প্রায়ই সেই খামারের বেড়ার ওপর দিয়ে উঁকি দিত। ব্যবস্থাপক ইউলিয়া কোরেতস্কাকে জিজ্ঞেস করত, সত্যিই মানুষ এই শামুক খায় কিনা। আর সবুজ ক্ষেতে শামুকভর্তি কাঠের বাক্সে পরিবেষ্টিত ইউলিয়াকে তারা বলত শামুকের জননী।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনে শামুকের খামার এখন আর কোনো অভিনব কিংবা অপরিচিত বিষয় নয়। বলতে গেলে স্বল্প সময়েই দেশটিতে শামুক শিল্পের অভাবনীয় বিস্তার ঘটেছে। একে একে গড়ে উঠেছে প্রায় ৪০০ খামার, যেখান থেকে শামুক রফতানি করা হয় ইতালি স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশে। কিন্তু মহামারী নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জারি করা বিধিনিষেধ বর্তমানে বৈশ্বিক খাদ্য পরিষেবা শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে, যার প্রকোপ থেকে মুক্ত থাকতে পারছেন না ইউরোপের অন্যতম দরিদ্র দেশ ইউক্রেনের শামুক খামারিরাও।

মূলত ইউক্রেনে খাদ্য হিসেবে শামুক এখনো খুব একটা জনপ্রিয় নয়। ফলে সংশ্লিষ্ট খামারিদের পণ্যটি বিক্রির জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে ইউরোপের অন্য দেশগুলোর রেস্তোরাঁর ওপর। কিন্তু সমস্যা হলো, করোনার প্রভাবে পুরো ইউরোপের অর্থনীতিই এখন বিপর্যস্ত। জারীকৃত লকডাউনসহ অন্য বিধিনিষেধ বহুলাংশে থমকে দিয়েছে ব্যবসা কার্যক্রম। এতে বিশেষ করে ভুগতে হচ্ছে হসপিটালিটি রেস্তোরাঁ ব্যবসাকে।

ভোয়নিভকার র্যাভলিক-২০১৬ খামারের মালিক সের্গেই ড্যানিলেইকো বলেন, গত বছর শামুকের বিক্রি দুর্দান্ত ছিল। কিন্তু বছর পরিস্থিতি একেবারেই বিপরীত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয় ক্রয়াদেশ হারানোয় এরই মধ্যে তার ক্ষতি হয়েছে ৫৫ হাজার ইউরোর। অন্যদিকে যেসব শামুক সরবরাহের কথা ছিল, সেগুলো এখন রেফ্রিজারেটরে নষ্ট হচ্ছে।

পশ্চিম কিয়েভের ঝিতোমির অঞ্চলের র্যাভলিকোভা খাতা খামারের পরিচালক ইউলিয়া নাসতাসিভনাকেও এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার শামুকের মজুদ নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে। তার মতে, ইউরোপে রফতানি না হওয়ায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা দেশীয় বিক্রি দিয়ে পুষিয়ে ওঠা যাবে না। তাছাড়া অধিকাংশ ইউক্রেনিয়ানের জন্য শামুক বেশ ব্যয়বহুল। একই সঙ্গে খাবারে এখনো তারা ঠিক অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। রফতানি এভাবে বন্ধ থাকলে সংশ্লিষ্ট কৃষক খামারিরা তাদের খামার টিকিয়ে রাখতে পারবেন না।

নাসতাসিভনার শঙ্কা, ভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধির ফলে ফ্রান্স স্পেন ফের লকডাউনে গেলে পরিস্থিতি আরো শোচনীয় রূপ নেবে। তিনি বলেন, আমাদের টিকে থাকতে হবে। আমাদের এতদিনের প্রচেষ্টার ফল এভোবে নষ্ট হতে দিতে পারি না।

মহামারীর আগে ইউক্রেনের শামুক শিল্প রীতিমতো দারুণ প্রবৃদ্ধির মধ্যে ছিল। উৎপাদকরা গত বছর ইউরোপে শামুক রফতানি করেছেন প্রায় আড়াইশ টন। এর আগের বছর রফতানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৯৩ টন। দেশটির উৎপাদকদের একটি জাতীয় সংগঠন জানিয়েছে, চলতি বছর এক হাজার টন শামুক উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী পুরো পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাসতাসিভনা বলেন, ইউক্রেনের শামুকের উচ্চ চাহিদার মূলে রয়েছে এর ভালো মান এবং তুলনামূলক কম দাম। বহু বিদেশী রয়েছেন, যারা এমনকি বিশ্বাসও করতে চান না যে ইউক্রেনে শামুকের খামার রয়েছে। কিন্তু যখন জানতে পারেন তখন তাদের আগ্রহ বেড়ে যায়। শামুক উৎপাদন রফতানিতে ইউক্রেনের প্রধান প্রতিপক্ষ পোল্যান্ড। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় রফতানিতে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ফলে ক্রেতা আকর্ষণে ইউক্রেনের কৃষকরা শামুকের দাম প্রায় ১০ শতাংশ কমিয়ে দেন। পরিকল্পনা বেশ কাজেও দিয়েছে। দাম কম হওয়ায় চলতি বছর প্রথমবারের মতো ফ্রান্সে বিক্রি নিশ্চিত করতে পেরেছেন নাসতাসিভিনা। এছাড়া মহামারীর আগে ইতালির ক্রেতাদের সঙ্গেও আলোচনা চলছিল।

এদিকে সের্গেই ড্যানিলেইকো তার ব্যবসায়িক অংশীদাররা শামুক রফতানি নিয়ে এশিয়ার বাজারগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি মনোযোগ দিয়েছিলেন শামুকভিত্তিক এসকারগো, পেস্ট্রি হিমায়িত ফিলেটের মতো পণ্য উৎপাদনেও।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন