বুধবার | সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭

খবর

সরকারি দপ্তরের অফিস সহকারীই নারী পাচারকারী

নিহাল হাসনাইন

সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে যেতে হয় প্রবাসী কল্যাণ বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দপ্তর ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কার্যালয়ে। সেখানে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তির আবেদনপত্র জমা নেয়ার জন্য রয়েছে একটি বিশেষ ডেস্ক। এই ডেস্কে দায়িত্ব পালনের সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যে নারী পাচার করে আসছিলেন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অফিস সহকারী নিপুন চন্দ্র গাইন। সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

তদন্তে আরো জানা গেছে, নিপুন চন্দ্র গাইন কামরাঙ্গীর চরে সেফ হাউজ তৈরি করে নারীদের আটকে রেখে পাচার করতেন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তথ্য জানার পর দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাকে আসামি করে মামলা করেছে জেলা কর্মসংস্থান জনশক্তি অফিস।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সুপারিশের ভিত্তিতে ঢাকা জেলা কর্মসংস্থান জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক জান্নাতুল ফিরদাউস রূপা বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলাটি দায়ের করেন। গত ৩০ জুলাই দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয়েছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিপুন চন্দ্র গাইনসহ পাঁচজনকে। বাকিরা হলেন সাতক্ষীরার রবিউল মোড়ল, রিক্রুটিং এজেন্টি এয়ারওয়ে ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, আইনুর করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী নূর মোহাম্মদ এবং ফাস্ট সার্ভিসের অন্যতম স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন। 

গুলশান থানার ওসি এসএম কামরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে ঢাকা জেলা কর্মসংস্থান জনশক্তি অফিসের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কাজের জন্য সৌদি আরব গিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সাতক্ষীরার আবিরন বেগম। গত বছরের অক্টোবরে তার মরদেহ দেশে আনা হয়। এর পর থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তথ্যানুসন্ধান শুরু করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর কমিশনের পক্ষ থেকে পাঁচজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের জন্য জেলা কর্মসংস্থান জনশক্তি অফিসে ১৩ দফা সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অফিস সহকারী নিপুন চন্দ্র গাইনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবিরন বেগমকে ভালো উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে তার খালার বাড়ির প্রতিবেশী রবিউল মোড়ল ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকায় আসার পর প্রথমে কয়েক দিন আবিরনকে একটি বাসায় আটকে রাখা হয়। পরে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অফিস সহকারী নিপুন চন্দ্র গাইনের কাছে আবিরনকে তুলে দেন রবিউল। নিপুন চন্দ্র গাইন ভাসানটেকে ঘর ভাড়া নিয়ে মেয়েদেরকে রাখেন এবং আবিরনও সেখানে ছিলেন। 

নিপুন চন্দ্র গাইনের সঙ্গে নারী পাচার কাজে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে জেলা কর্মসংস্থান জনশক্তি অফিসের দায়ের করা মামলার এজাহারে। বলা হয়েছে, এয়ারওয়ে ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম তার রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নূর মোহাম্মদের কাছে ভাড়া দেন। আর আবিরনকে পাচারের জন্য জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র অর্থাৎ স্মার্টকার্ড গ্রহণ পাইয়ে দেন। নিয়ম অনুযায়ী যে রিক্রুটিং এজেন্সির নামে কর্মীর স্মার্টকার্ড ইস্যু হবে, তাকেই কর্মীর সব দায়দায়িত্ব নিতে হবে। এর কিছুদিনের মধ্যেই আবিরনকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে পাঠানোর আগে আবিরনকে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ না দেয়ায় তিনি আরবি ভাষা বুঝে উঠতে পারেন না। এর পর থেকে তার ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। 

নির্যাতনের বিষয়টি কৌশলে আবিরন তার পরিবারকে জানান। পরে পরিবারের সদস্যরা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অফিস সহকারী নিপুন চন্দ্র গাইনকে জানালে তিনি সহায়তা না করে উল্টো আবিরনের পরিবারকে হুমকি দেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন