মঙ্গলবার | সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ | ১৪ আশ্বিন ১৪২৭

প্রথম পাতা

করোনার প্রভাব

অর্ধেকে নেমে এসেছে ব্যাংকিং লেনদেন

হাছান আদনান

জীবন সংহারের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি করেছে কভিড-১৯। স্থবিরতা নেমে আসে ব্যবসা-বাণিজ্যে। এর প্রভাব পড়েছে আর্থিক লেনদেনেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, করোনাভাইরাসের ধাক্কায় দেশের ব্যাংকিং লেনদেন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। চেক, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ডসহ সব ধরনের মাধ্যমেই কমেছে লেনদেন।

উন্নত দেশগুলোতে চেকের মাধ্যমে লেনদেন প্রায় বিলুপ্ত হতে চললেও দেশের ব্যাংকিং লেনদেনের সিংহভাগই এখনো চেকনির্ভর। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ার আগের মাস তথা ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকগুলোতে চেক ক্লিয়ারিং হয়েছে ২০ লাখ ১৫ হাজার ৪৯টি। কিন্তু এপ্রিল মাসে চেক ক্লিয়ারিংয়ের সংখ্যা কমে মাত্র লাখ ৭৬ হাজার ৭০৩টিতে নেমে আসে। সে হিসেবে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর চেক ক্লিয়ারিংয়ের পরিমাণ কমেছে ১৫ লাখ ৩৮ হাজার ৩৬৪টি। চেক ক্লিয়ারিং কমার হার ৭৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

ফেব্রুয়ারিতে চেকের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল লাখ ৮৬ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। আর এপ্রিলে লেনদেনের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৭২২ কোটি টাকায় নেমে আসে। হিসেবে চেকের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন কমেছে ৪৯ দশমিক ১৪ শতাংশ।

চেকের মাধ্যমে অর্থের লেনদেন করতে হলে গ্রাহকদের ব্যাংকের শাখায় যেতে হয়। চলাচলে নানা বিধিনিষেধ এবং সংক্রমণ আতঙ্কে ব্যাংকে মানুষের যাতায়াত সীমিত হয়ে পড়ে। কারণেই লেনদেন কমেছে বলে মনে করেন ব্যাংকাররা।

ব্যাংকিং লেনদেন কমে যাওয়াকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রকাশ বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলাফল ব্যাংকিং লনদেনের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। করোনার ধাক্কায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা ব্যাংকিং লেনদেনের চিত্র দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর লেনদেনে বড় বিপর্যয় হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতি হলেও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে অনেক সময় লাগবে।

ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন কমেছে ৫৭ শতাংশ: দেশের রিটেইল ব্যাংকিংয়ের অন্যতম উপকরণ হলো ক্রেডিট কার্ড। উচ্চ মধ্যবিত্তের কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ ছোট ঋণ নেয়ার জন্য জনপ্রিয়তা পেয়েছে ক্রেডিট কার্ড। দেশের প্রায় প্রতিটি ব্যাংকই বাজারে বিভিন্ন নামে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে এসেছে। কিন্তু মহামারীর আঘাত পড়েছে ক্রেডিট কার্ডের বিপণন লেনদেনে। দেশের ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকের সংখ্যা ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮২৩। করোনা সংক্রমণের আগে ফেব্রুয়ারিতে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছিল ২২ লাখ ৮৬ হাজার ৮০০টি। এপ্রিলে লেনদেন ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৬৩৫টিতে নেমে এসেছে। হিসেবে এক মাসের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন কমেছে ১২ লাখ ২২ হাজার ১৫৬টি। ফেব্রুয়ারিতে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল হাজার ২১৮ কোটি টাকা। এপ্রিলে লেনদেন ৫২৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ, করোনার তাণ্ডবে ক্রেডিট কার্ডে টাকার লেনদেন কমেছে ৫৭ দশমিক শূন্য শতাংশ।

সাধারণত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা কেনাকাটার বিল পরিশোধেই ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেশি করেন। বিল পরিশোধ করা হয় পিওএস মেশিনের মাধ্যমে। পরিসংখ্যান বলছে, এপ্রিলে ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের কেনাকাটায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। ফেব্রুয়ারিতে পিওএসের মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন ছিল ৭৯৫ কোটি টাকা। এপ্রিলে লেনদেন মাত্র ২৮২ কোটি টাকায় নেমে আসে। বর্তমানে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ রয়েছে হাজার ৪১২ কোটি টাকা।

ক্রেডিট কার্ড বিপণনের জন্য ব্যাংকগুলো বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। নিয়োগ দেয়া কর্মীদের বড় অংশই অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেন। ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বিপণন কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর রিটেইল বিভাগের কর্মীরা চাকরি হারাতে শুরু করেছেন। অনেক ব্যাংকই এরই মধ্যে অস্থায়ী কর্মীদের বিদায় জানিয়েছে।

ডেবিট কার্ডে লেনদেন কমেছে ৪৪ শতাংশ: করোনা সংক্রমণের ভয়ে অনেক গ্রাহকই ব্যাংকের শাখায় না গিয়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলেছেন। চেকের মাধ্যমে লেনদেন কমায় ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন বাড়ার কথা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এক্ষেত্রেও কমেছে লেনদেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির তুলনায় এপ্রিলে ডেবিট কার্ডে প্রায় ৯০ লাখ লেনদেন কম হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ডেবিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে কোটি ৯৩ লাখ ৫৯ হাজার ৭৩টি। কিন্তু এপ্রিলে লেনদেন কোটি লাখ ২৫ হাজারে নেমে এসেছে।

ফেব্রুয়ারিতে ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। কিন্তু এপ্রিলে কার্ডের মাধ্যমে মাত্র হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। সে হিসেবে করোনায় ডেবিট কার্ডেও লেনদেন কমিয়েছে ৪৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের পাশাপাশি গ্রাহকরা পিওএস মেশিনের মাধ্যমে কেনাকাটার বিল পরিশোধ করেন। ফেব্রুয়ারিতে পিওএসের মাধ্যমে ডেবিট কার্ডের লেনদেন ছিল ৪৭৮ কোটি টাকা, এপ্রিলে লেনদেন মাত্র ১৪০ কোটি টাকায় নেমেছে। বর্তমানে দেশের সব ব্যাংকের ডেবিট কার্ডধারী গ্রাহকের সংখ্যা কোটি ৯৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭৯১।

প্রিপেইড কার্ডে লেনদেন মাত্র ৬১ কোটি টাকা: দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ব্যাংকের কার্ডভিত্তিক সেবাগুলোর মধ্যে একটি প্রিপেইড কার্ড। ব্যাংকগুলোর প্রিপেইড কার্ড গ্রাহকের সংখ্যাও লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু করোনার ধাক্কায় কার্ডের লেনদেন তলানিতে নেমে এসেছে। এপ্রিলে প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে মাত্র ৬১ কোটি টাকা। অথচ ফেব্রুয়ারিতে কার্ডের মাধ্যমে ১৪২ কোটির টাকা লেনদেন হয়েছিল।

ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে লেনদেন কমছে ২৬ শতাংশ: লকডাউনে গৃহবন্দি মানুষের কেনাকাটা লেনদেনে সহজ সমাধান হতে পারত ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা। কিন্তু করোনার ধাক্কায় ঘরে বসে লেনদেন করার মাধ্যমটিও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। দেশের ব্যাংকগুলোর ইন্টারনেট ব্যাকিং সেবার গ্রাহকসংখ্যা ২৬ লাখ ৮৭ হাজার ৩০৪। করোনার আগে ফেব্রুয়ারিতে সেবা ব্যবহার করে লেনদেন হয়েছিল হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। কিন্তু এপ্রিলে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের লেনদেন মাত্র হাজার ৬৬৪ কোটি টাকায় নেমেছে।

৩০ শতাংশ কমেছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন: দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এমন সেবাগুলোর শীর্ষে রয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস। করোনাকালে দুস্থ, অসহায় মানুষের জন্য সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিতরণ করা হয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতনের টাকাও। তার পরও দেশে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন কমেছে। ফেব্রুয়ারিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ৪১ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এপ্রিলে লেনদেন ২৯ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় লেনদেন কমেছে ২৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিং লেনদেন ৪৩ শতাংশ কমেছে: করোনার ধাক্কায় গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিও যে থমকে গেছে তার জানান দিচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ব্যাংকিং সেবার লেনদেন কমেছে ৪৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন ছিল ২০ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। এপ্রিলে সেবার মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ১১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।

ব্যাংকিং লেনদেন কমলেও গত ছয় মাসে দ্য সিটি ব্যাংকের প্রায় হাজার কোটি টাকার আমানত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী মাসরুর আরেফিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সিটি ব্যাংকের আমানত নতুন হিসাব সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু ধসে গেছে ক্রেডিট কার্ড ব্যবসা এটিএমে লেনদেন। খাতে আমরা বিপুল জনবল নিয়োগ দিয়েছি। রিটেইল ব্যবসার পরিস্থিতি এমন থাকলে কর্মীদের ধরে রাখা কঠিন হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন