শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

শেষ পাতা

ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি-২০২০ প্রণয়ন প্রক্রিয়া শুরু

এক দশকে প্লাস্টিক পণ্যের বাজার দাঁড়াবে ১০ বিলিয়ন ডলারে

বদরুল আলম

বাংলাদেশে প্লাস্টিক পণ্যের বাজার বিকশিত হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিকের প্রয়োজনীয় জগ, মগ থেকে শুরু করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের প্যাকেট, ইনজেকশন সিরিঞ্জ, রক্ত সংগ্রহের ব্যাগ, চোখের মণি, ক্রোকারিজ, ঘরের দরজা, জানালা, স্যানিটারি, ইলেকট্রিক দ্রব্যাদি, কম্পিউটার, টেলিফোন সেটসহ বিভিন্ন ধরনের খেলনা। বর্তমানে বাংলাদেশী প্লাস্টিক পণ্যের বাজারের আকার দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সাল নাগাদ বাজারের আকার হবে ১০ বিলিয়ন ডলার।

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, বাংলাদেশে তৈরি আধুনিক প্লাস্টিক পণ্য সামগ্রীগুলো আন্তর্জাতিক মানের। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে বাংলাদেশে। সরকারি তথ্য-উপাত্ত বলছে, ২০০৭ থেকে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে প্লাস্টিক পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা। প্লাস্টিকের বৈশ্বিক ব্যবহার মাথাপিছু ৫০ কেজি। যুক্তরাষ্ট্রে হার মাথাপিছু ১০৯ কেজি। চীন ভারতে যথাক্রমে ৩৮ ১১ কেজি। বাংলাদেশে মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার পাঁচ থেকে সাত কেজি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তৈরি ন্যাশনাল প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২০ বলছে, বৈশ্বিক প্লাস্টিক শিল্পের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ হওয়ার সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের। বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের বৈশ্বিক বাজার ৫৭০ বিলিয়ন ডলার। বাজারে বাংলাদেশের অংশ মাত্র দশমিক শতাংশ। গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের বরাতে শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, ২০২৫ সালে প্লাস্টিক পণ্যের বৈশ্বিক বাজারের আকার হবে ৭২১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে তৈরি প্লাস্টিক পণ্যের বাজারের আকার বর্তমানে দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। যার ৮৩ দশমিক শতাংশ স্থানীয় বাজার। আর বাকি ১৬ দশমিক শতাংশ বৈশ্বিক।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি বছর প্লাস্টিক খাতের প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ হারে হবে বলে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্লাস্টিক শিল্প খাতের নতুন উদ্যোগগুলো যেসব বাধার সম্মুখীন হচ্ছে তা নিশ্চিহ্ন করা হবে ২০২২ সালের মধ্যে। ২০২৬ সালের মধ্যে ৫০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জিডিপিতে অবদান হবে ন্যূনতম শতাংশ। এত কর্মযজ্ঞের পর ২০৩০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক ব্যবহার বিবেচনায় শূন্য বর্জ্যের জাতি হিসেবে রূপান্তর হবে বাংলাদেশ। আর বর্তমান দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার আকারের বাংলাদেশে তৈরি প্লাস্টিক পণ্যের বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে হবে ১০ বিলিয়ন ডলারের।

গত জুলাই ন্যাশনাল প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি-২০২০-এর সপ্তম খসড়া প্রকাশ করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়েছে বিপুল সম্ভাবনার খাত হলেও বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্পের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার সুচিন্তিত নকশা কৌশলের ঘাটতি রয়েছে। খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধার মধ্যে আছে মান নিয়ন্ত্রণ, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, ছাঁচ, ছাঁচ তৈরির ব্যবস্থা, প্লাস্টিক বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা, ব্যবসাবান্ধব কর শুল্কের ব্যবস্থা। জাতীয় কৌশলগত পদ্ধতির এবং স্বতন্ত্র প্রতিযোগিতামূলক শক্তি ছাড়া বাংলাদেশে তৈরি প্লাস্টিক পণ্যগুলোর বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সরকারি বেসরকারি প্লাস্টিক খাতসংশ্লিষ্টরা।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, প্লাস্টিক শিল্প বিকাশের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা প্রতিকূলতা বিবেচনা করেই একটি জাতীয় প্লাস্টিক শিল্প উন্নয়ন নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক শিল্পের কাঠামো গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিতে স্থানীয় আন্তর্জাতিক দুই ধরনের বাজারই নীতিমালাটির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, উন্নত প্রযুক্তি থেকে শুরু করে শিল্পটির সার্বিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নীতিমালাটির ওপর মতামত গ্রহণও শুরু হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব কেএম আলী আজম বণিক বার্তাকে বলেন, প্লাস্টিক খাতের নীতিমালাটি মতামত গ্রহণ পর্যায়ে আছে। খাতের উন্নয়নে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। দ্রুতই নীতিমালাটি নিয়ে মন্ত্রী মহোদয়ের উপস্থিতিতে আমরা আলোচনা করব। সেখানে পরিবেশ সার্বিক কমপ্লায়েন্সকে গুরুত্ব দিয়ে প্লাস্টিক শিল্পনগরীসহ প্লাস্টিক শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াসংক্রান্ত কৌশলগত বিষয়গুলো নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করে যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্লাস্টিক খাতের ওপর প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে ১২ লাখেরও বেশি মানুষ নির্ভরশীল। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন বিপণন হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্লাস্টিক খাতের অবদান প্রায় সাড়ে হাজার কোটি টাকা। প্লাস্টিকের তৈরি প্রচ্ছন্ন রফতানি পণ্যের পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বেশি, আবার সরাসরি রফতানির পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি।

প্লাস্টিক খাতে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে পাঁচ হাজারেরও বেশি শিল্প গড়ে উঠেছে। এর অধিকাংশ বা সাড়ে তিন হাজারের মতো ক্ষুদ্র, প্রায় দেড় হাজার হলো মাঝারি। বড় শিল্প-কারখানা আছে অর্ধশত। দেশের বাজারে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন বিপণন করে এমন বড়দের মধ্যে আছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, বেঙ্গল গ্রুপ, এন মোহাম্মদ, এসিআই, তানিন বেস্টওয়্যার আকিজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।

জানতে চাইলে বেঙ্গল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্সের (বিপিজিএমইএ) সভাপতি জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করা যায় যে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সমান্তরালভাবে বাড়বে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার। বাংলাদেশের মানুষের জিডিপি বাড়ছে, ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। প্লাস্টিক প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়ালের ব্যবহারও বাড়ছে। উৎপাদন প্রক্রিয়া পুনর্ব্যবহারের উপযোগিতা বিবেচনায় সার্বিকভাবে প্লাস্টিক শিল্প পরিবেশবান্ধব শিল্প। সব প্রেক্ষাপটে শিল্পটিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগটি ইতিবাচক। আমরাও নীতিমালা প্রণয়নের সহযোগীর ভূমিকা পালন করছি। তবে প্লাস্টিক নিয়ে নীতিমালা হলেও প্লাস্টিক সংশ্লিষ্ট প্যাকেজিং নীতিমালারও খুব প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিকল্পিত প্লাস্টিক শিল্প বিকাশে সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলোতে সমতা নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামাল কামরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, যেকোনো শিল্পের সঠিক বিকাশে সরকারি নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্লাস্টিক শিল্পের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগকেও আমরা তাই স্বাগত জানাই। আশা করছি শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নীতিমালাটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন