সোমবার | সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ | ৫ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

‘স্বর্গীয় সত্যের’ সন্ধান ও পরিত্যায্য পৃথিবী কথন

মোতাহার হোসেন চৌধুরী

গত ৩০ জুলাই ‘তিয়ানওয়েন-১’ নামে একটি মহাকাশযান হাইনান প্রদেশ থেকে মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়েছে চীন। এরই মধ্যে মঙ্গলে আমেরিকা নাসার মাধ্যমে পাঠিয়েছে ‘পারসিভেরান্স’ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জাপান থেকে পাঠিয়েছে ‘আল আমাল’ নামের নভোযান। পৃথিবী নামক গ্রহটির স্মরণাতীত কালের মহাদুর্যোগের সময়ে এইসব মঙ্গল অভিযান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

চীনের পাঠানো ‘তিয়েনওয়েন’ এর অর্থ ‘স্বর্গীয় সত্যের সন্ধান’। অতিশয় চমকপ্রদ অর্থবহ নামের মহাকাশযান! চীনের চন্দ্রাভিযানের প্রধান বিজ্ঞানী ওউইয়াং জিউয়ান এবারের মঙ্গলাভিযান নিয়ে বলেছেন- ‘অনেকদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা মানুষ স্থানান্তরের জন্য দ্বিতীয় গ্রহ খুঁজছেন। উদ্দেশ্য হলো, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত পৃথিবীর মনুষ্য প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিকল্প আবাসস্থল গড়ে তোলা। সম্ভাবনা শুধু মঙ্গলগ্রহ-এটি প্রয়োজন।’ হয়তো তাদের মঙ্গল গ্রহের খুব প্রয়োজন এখন!

এই মঙ্গল গ্রহ অভিযান নতুন নয়, অনেকদিন ধরেই চলছে। আমেরিকা তার নাসা’র মাধ্যমে এগিয়ে আছে কথিত সফল-অসফল এসব অভিযানে। অতি ধনীরা মানে বিলিয়নরেরা ওখানের বসত-ভিটার জন্য নাকি আগাম বুকিং দিয়েও রাখছেন! করোনাকালের পর্যুদস্ত পৃথিবী হয়তো আরো অনিরাপদ ভেবে ধনীদের- ক্ষমতাবানদের শীর্ষ দেশ আমেরিকা ও চীন মঙ্গলে মহাকাশযান পাঠানোর জন্য এই সময়কে উপযুক্ত মনে করেছে। আর আরব আমিরাত চোখ ধাঁধানো বিলাসী জীবনের অভ্যস্ততার মধ্যে করোনা বিপত্তিতে পড়ে জাপানকে দিয়ে ‘আমাল’ মহাকাশযান মঙ্গলে পাঠিয়ে সুউচ্চ আকাংখা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।

এই ভিন্ন ভিন্ন মহাকাশ অভিযানের সূত্রগুলো বলছে, আমিরাতের ‘আমাল’ মঙ্গলের কক্ষপথ পরিভ্রমণ করতে পারবে ও ছবি তুলতে পারবে। চীনের ‘তিয়েনওয়েন’-১ রোভার সমৃদ্ধ হওয়ায় মঙ্গলের পৃষ্ঠে নেমে চলতে পারবে। এটি ছবি, তথ্য, নমুনা সংগ্রহ করবে। আমেরিকার ‘পারসিভেরান্স’ আরো উন্নত ! এটি’র আবার ৬টি পা, মানে হেঁটে হঁটে সব খুঁটিনাটি সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে পারবে। 

অতএব মঙ্গলে বসতি দূর অস্ত নয়? আগেই নাকি বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন মঙ্গলে ৩০০-৪০০ কোটি বছর আগে নদী বা হৃদ ছিল, এখন ভয়ানক শীতল এই গ্রহটি মাত্র ৩০০ বছর আগেও উষ্ণ ছিল। এই যে নদীর খবর, উষ্ণতার হাতছানি ধনীদের ডাকছে মঙ্গলে বসতি গড়ার জন্য, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে একটু জলের আশায়, একটু উষ্ণতার খোঁজে, ‘স্বর্গীয় সত্যের সন্ধানে’! কারণ কী?

বিজ্ঞানীদের বক্তব্য অনুযায়ী মনুষ্য প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্যই নাকি মঙ্গল গ্রহের প্রয়োজন। তাই কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে মঙ্গলে পাড়ি জমানোর স্বর্গীয় সত্যের আশায়!

তাহলে পৃথিবীটা কি নরক হয়ে গেছে বা যাচ্ছে? এখানে মনুষ্য প্রজাতির টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে? পৃথিবী নামক একসময়ের অনিন্দ্য সুন্দর মর্ত্যটি আর বাসযোগ্য থাকছে না; পরিত্যায্য! পৃথিবীর সেই বিপুল জলরাশি, পরিমিত উষ্ণতা-শীতলতা, বন, সমতল, বায়ু, প্রাণপ্রাচুর্য সব কি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে?   

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বহু সমস্যায় জর্জরিত এই পৃথিবী। আরো বলছেন বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় এই মঙ্গল অভিযান যথার্থ।  

এই পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন, বরফ গলে যাওয়া, মরু অঞ্চল বেড়ে যাওয়া, উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বনাঞ্চল ধ্বংস, নদী-জলাশয় ভরাট,প্রকৃতি বিনষ্ট- এ দায় কার?

বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষতা মানুষের জন্য কতটা কল্যাণীয় ভূমিকা রেখে চলেছে এই পৃথিবীতে? আমেরিকার এবারের মঙ্গলমুখী নভোযানটির জন্য ব্যয় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। চীন ও আমিরাতের দু’টির ব্যয়ও খুব কম হওয়ার কথা নয়। মঙ্গলগ্রহসহ নভোমন্ডল পরিভ্রমণে-পর্যবেক্ষণে-গবেষণায় বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার মহড়ার ব্যয় এ যাবত শত শত বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করার কথা।

এর বাইরেও বিজ্ঞান বহু কাজ করেছে, করে চলেছে। লাগাতার যুদ্ধাস্ত্র-ক্ষেপণাস্ত্র-রণতরী-পারমানবিক বোমা তৈরির বৈজ্ঞানিক ব্যয়ের হিসাব করার ক্ষমতা হয়তো কোনো অংকবিদেরও নেই। তবে এসব টাকার যৎসামান্য দিয়ে পৃথিবীকে যে বাসযোগ্য রাখা যেতো, সব ক্ষুধার্ত মানুষকে খাইয়ে রাখা যেতো, আশ্রয়হীন মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা যেতো, করোনা মহামারীসহ যে কোন স্বাস্থ্য সংকটের একটা কূলকিনারা পাওয়া যেতো, পৃথিবীর সব মানুষের শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতো, জলবায়ু পরিবর্তনের ধকল সামলে নেয়া সম্ভব হতো- এই হিসাব অনেকেই করে দিতে পারবেন।

মানুষকে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি হিসাবে দেখতে চায় ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহে,আজ্ঞাবহ বিজ্ঞানী ও তার প্রভুরা।তারাও জানে এই পৃথিবী অস্তিত্ব সংকটে-তাদেরই কারণে। পৃথিবীকে রক্ষা করার ও মানুষকে বাঁচানোর কোনো বিজ্ঞান ও তত্ত্বে তারা আস্থাশীল নয়। কারণ এমনটি হলে পশ্চিম আফ্রিকা-সাব সাহারা-আরব অঞ্চলের কোটি শিশু অপুষ্টি-ক্ষুধা-মৃত্যু থেকে বেঁচে যাবে। ঐ অঞ্চলসহ তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশ জাতি মানুষ মানবিক জীবন পেয়ে যাবে। আগামী দুই থেকে তিনদশকে সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে বহু দেশ। বর্ধনশীল মরুময়তা কেটে যাবে বহুস্থানে। মহামারী-যুদ্ধ-দুর্যোগ না থাকলে ওইসব প্রভুদের জীবন মানের কাছাকাছি চলে যাবে পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের জীবন। 

সেজন্যই শক্তিমানরা সংকল্পবদ্ধ এই পৃথিবীর কল্যাণে কিছু করা যাবে না। ফলে পৃথিবীর ভয়ানক এই দুঃসময়েও মহাকাশ পরিভ্রমণ, অযোধ্যায় গেরুয়ার ভূমিশয্যার ‘ভিত্তি পূজা’ সহ সব নিষ্ঠুর তামাশা বলবৎ থাকে! মানুষ যেন ক্ষুধা নিবারণ, চিকিৎসা প্রাপ্তিসহ সকল ন্যায্য চাওয়া থেকে দূরে থাকতে পারে। জলবায়ু দূষণ-যুদ্ধ-দুর্যোগসহ সব দূষণে পৃথিবী অচিরেই যেন একটি বিশাল ভাগাড়ে পরিণত হতে পারে। আজ্ঞাবহ বিজ্ঞান ও ভন্ডামি চলুক হাতধরে-এসব জিতে যাক প্রভুদের তরে! প্রভুরা ‘স্বর্গীয় সত্যের সন্ধান’ করে মঙ্গল গ্রহে বা অন্য কোন নভোগৃহে বাসভূমি গড়ে তুলুক!

তবু এই পৃথিবীর দরিদ্র হতচ্ছাড়াদের সঙ্গে আর নয়! যদি সেটি সত্যি করা যায়, সেখানে দম্ভ-কর্তৃত্ব-প্রভূত্ব   না থাকলেও কৌলিন্য হয়তো রক্ষা যাবে!

মঙ্গলেই তাদের মঙ্গল হোক।

লেখক: কলামিস্ট
[email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন