শনিবার | সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আমরা কি পাগলেরও অধম?

ডা. পলাশ বসু

আমাদের হাবভাব, কাজে-কর্মে এখন মনে হয় না কভিড-১৯ বলে কোনো সংক্রামক ব্যাধি আর অবশিষ্ট আছে। আমরা ফ্রি স্টাইলে চলছি, মাস্ক ছাড়াই আমরা স্বাভাবিক নিয়মে ঘোরাফেরা করছি। আমাদের এখন আর এ নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা আছে বলে মনেই হয় না। কিন্তু এর কারণ কি? কেন এমন হলো? করোনা তো চলে যায় নি। বরং মহামারীর ইতিহাস বলছে এটার মাত্রাগত তারতম্য হতে পারে। কিন্তু এত সহজে চলে যায় না। যতদিন পর্যন্ত ভ্যাকসিন না আসছে বা ওষুধ আবিষ্কার না হচ্ছে ততদিন মহামারীকে তো একটু ‘সমঝে’ চলাই উচিত। আর করোনা হচ্ছে মারাত্মক ধরনের ছোঁয়াছে ভাইরাস। এটা শুধু ফুসফুসের ক্ষতি করে না। বরং লিভার, হার্ট, কিডনি, ব্রেনকেও অকেজো করে দিতে পারে। 

তাই আমরা যদি করোনাকে এত হেলাফেলা মনে করি, স্বাস্থ্যবিধিকে পাত্তাই না দিই তা হলে এটা যে কারো জন্যই প্রাণঘাতী হয়ে যেতে পারে। ঠিক কার প্রাণ যাবে এ রোগে তা তো আর আগেভাগে জানা যায় না। এ কারণে সাবধানতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকার দেশসমূহ, প্রতিবেশী ভারতের দিকে খেয়াল করুন। ভিয়েতনাম ছিল করোনা মোকাবেলায় সবচেয়ে সফলতম দেশ। সেখানে করোনা ছিলোই না। অথচ সেখানে সম্প্রতি ধরা পড়েছে এ রোগটি এবং একজনের  মৃত্যুও হয়েছে। এসব দেশে এখনও রোগী বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুও। তাহলে আমরা কেন এত রিল্যাক্স সবাই? অথচ বেশি কিছু কিন্তু না। প্রত্যেকেই সাবধানতা অবলম্বন করে বাইরে বের হলে এ রোগের বিস্তার সহজেই বন্ধ  হতে পারে।সেই সাবধানতাটুকু আমাদের সবাইকে নিতে হবে নিজের, পরিবারের এবং সর্বোপরি দেশের স্বার্থে।

ধরুন, আপনি নানা প্রয়োজনে বাইরে যাচ্ছেন। চাকরি, ব্যবসাসহ নানান কাজ তো আমাদের থাকেই। আপনি হয়ত বয়সে তরুণ। শারীরিকভাবে ফিট আছেন। কিন্তু হতে পারে আপনার পরিবারে বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন। আপনি সতর্ক  না হলে কিন্তু তারা বিপদে পড়ে যেতে পারেন। আবার আপনার যে কিছুই হবে না সেটা মনে করার কিন্তু যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণও নেই। অনেকে সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন ঠিকই তবে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক নানা জটিলতায় তারা ঠিকই ভুগছেন।সেই সাথে আছে মানসিক উদ্বিগ্নতা।এ অবস্থা থেকে রেহাই পেতে তাই সতর্কতার একদমই কোনো বিকল্প নেই। 

সে সতর্কতা কেমন হতে পারে তাহলে? আসুন একটু দেখি বিদ্যমান বাস্তবতায় আমাদের ঠিক কেমন ও কতটুকু সতর্ক হওয়া উচিত।

(১) প্রথম কথা হলো- বাইরে বের হলে অবশ্যই, অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। মাস্ক ছাড়া বাইরে যাওয়া যাবে না। অনেকে মাস্ক দিয়ে নাক মুখ না ঢেকে তা নামিয়ে থুতনির নীচে বা কানে ঝুলিয়ে রাখেন। এসব কাজ কিন্তু  আপনাকে করোনা আক্রান্তের ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।ফলে মাস্ক পরে বাইরে বেরোনোর পরে বাসায় আসার আগে পারতপক্ষে মাস্ক আর খুলবেন না।

(২) মাস্ক পরার আগে হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন। তারপর মাস্ক পরুন। খোলার পরে ওয়ান টাইমের জন্য ব্যবহৃত মাস্কটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। বা বাসায় এসে একটা পলিথিনের ভেতরে মাস্কটি রেখে মুখ বন্ধ করে রাখুন। পরে ফেলে দিন। হাত ধুয়ে নিন বা স্যানিটাইজ করে নিন। রিইউজেবল মাস্কগুলো ধুঁয়ে নিন। তারপর ব্যবহার করুন। 

(৩) বাইরে বের হওয়ার পর আপনার হাত দিয়ে কোনো কিছু ধরলে যত দ্রুত সম্ভব সেনিটাইজ করে নিন। সেনিটাইজ না করে বা সাবান দিয়ে না ধোয়া অবধি এ হাত দিয়ে চোখ, নাক, মুখ স্পর্শ করবেন না।

(৪) গণপরিবহনে সিটে বসার পর অবশ্যই হাত সেনিটাইজ করে নিন। বাসে থাকা অবস্থায় হাত দিয়ে আর কিছুই স্পর্শ করবেন না। টাকা লেনদেনের পর হাত স্যানিটাইজ করতে ভুলবেন না যেন।

(৫) অফিসে গিয়ে নিজের টেবিল, চেয়ার, ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিজেই হেক্সিসল বা স্যানিটাইজার দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে তারপর কাজ শুরু করুন। অন্য ডেস্ক  থেকে আসা ফাইলে কাজ করার পরে হাত স্যানিটাইজ করুন। না হয় সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সবাই মাস্ক পরুন।

(৬) কমন বাথরুম, টয়লেট ব্যবহার না করাই ভালো। করতে হলে কাজ শেষে বাইরে এসে হাত স্যানিটাইজ করে নিন। বা সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন। কমন বাথরুমের ট্যাপ প্রতিবার ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে ধুয়ে রাখুন।

(৭) বাইরে দীর্ঘ সময় থাকতে হলে খাবার নিজের সাথে করে নিয়ে যান।বাইরের খাবার খেতে হলে প্যাকেটজাত খাবারের প্যাকেট স্যানিটাইজ করে নিয়ে তারপর সেটা খুলুন।সাপ্লাই করা খাবার হলে গরম করে নিলে ভালো হয়। নিজের প্লেট, গ্লাস আলাদা রাখুন।

(৮) লিফট ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকুন। পারলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠুন।

(৯) বাইরের আড্ডাবাজি বাদ দিন। কাজ শেষে যত দ্রুত সম্ভব  বাসায় ফিরুন। বাইরে ব্যবহৃত জুতো বা স্যান্ডেল পরে বাসায় ঢুকবেন না।

(১০) শেষের এই সতর্কতাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি বাসায় আসার আগে সম্ভব হলে যিনি বাসায় আছেন তাকে বাথরুমের পাত্রে ডিটারজেন্ট গুলিয়ে রাখতে বলুন। পরিষ্কার লুঙ্গি, প্যান্ট, তোয়ালে বা গামছা রেখে আসতে বলুন। আপনি  বাসায় ঢুকেই কোনো কিছু না ধরে সোজা বাথরুমে গিয়ে জামাকাপড় খুলে ডিটারজেন্টে ভিজিয়ে দিন। তারপর সাবান দিয়ে গোসল করে ফেলুন। শেষে পানির ট্যাপ ভালো করে সাবান দিয়ে ধুঁয়ে রাখুন।

এসব সতর্কতা মানাটা কি খুব কঠিন? আমার তো মনে এটা কোনো কঠিন বিষয় না। শুধু নিজের ইচ্ছেটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত কথা না হয় বাদই দিন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথা তো ধর্মীয়ভাবেও বলা আছে। ধর্মীয় এত নিয়ম কানুনের কথা আমরা ফেসবুকে শেয়ার করি তাহলে ধর্মনির্দেশিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথাটা মানতে সমস্যা কোথায়? করোনায় এটা তো আরো বেগবান হওয়ার কথা, তাই না? 

আসলে সমস্যা ঘাপটি করে বসে আছে আমাদের মগজে। আমরা তাই যা বলি তা করি না। আর যা করি তা বলি না। ধর্মের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলি ঠিকই কিন্তু বাস্তবে ধর্ম নির্দিশত পথ মানতেও আমাদের খুবই অনীহা।  আসুন তাই এই মহামারীর সময়ে মগজটাকে একটু ভালো কাজে ব্যয় করি। নিজের ইচ্ছেটাকে ভালো কাজের জন্য উসকে রাখি। বলুন তো তাহলে এতে লাভ কার হবে? নিজের ভালো নাকি পাগলেও বোঝে! আর আমরা সুস্থ মানুষেরা কেন তা বুঝতে পারছি না? আমরা কি তাহলে পাগলেরও অধম?

শিক্ষক ও চিকিৎসক
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন