শনিবার | সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

শেষ পাতা

সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বাণিজ্যিক স্থাপনা

ম্লান হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের উদ্যান ও উন্মুক্ত স্থান

ওমর ফারুক চট্টগ্রাম ব্যুরো

২০১৬ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর পরই বিলবোর্ড উচ্ছেদ পরিচ্ছন্নতায় চমক দিয়ে দায়িত্ব শুরু করেছিলেন নাছির উদ্দীন। তবে শেষ পর্যন্ত তা ম্লান হয়ে যায় সৌন্দর্যবর্ধনের নামে উন্মুক্ত উদ্যান, সড়ক ফুটপাতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণে।

চট্টগ্রাম নগরীর উন্মুক্ত কয়েকটি স্থানের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে বিপ্লব উদ্যান। নগরীর দুই নম্বর গেট এলাকার উদ্যানটি আধুনিকায়নের নামে দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দোকান নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। শুধু তা- নয়, সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ২০ বছরের জন্য প্রতিষ্ঠান দুটিকে ইজারা দেয়া হয়েছে উদ্যান। ফলে আগের সেই উন্মুক্ত উদ্যানে এখন গড়ে উঠেছে ২৫-৩০টি দোকান।

গতকাল সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উদ্যানের স্মৃতিস্তম্ভকে কেন্দ্র করে জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে মাটি ভরাটের কাজ শেষ। উদ্যানের পূর্বপাশে নির্মাণ করা হয়েছে বাণিজ্যিক স্থাপনা।

উদ্যানটি আধুনিকায়নের দায়িত্ব পাওয়া স্টাইল লিডিং আর্কিটেক্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান স্থপতি মিজানুর রহমান বলেন, উদ্যানের সৌন্দর্যবর্ধন আধুনিকায়নে প্রায় কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। উদ্যানের এক পাশেফুড কোর্টে৩০টি দোকান থাকবে। আধুনিকায়নের কাজ শেষ। করোনা পরিস্থিতির জন্য পার্ক বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দু-এক মাসের মধ্যে উদ্যান সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্যানে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই স্বস্তিতে ঘুরতে পারবেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সিসি ক্যামেরা থাকবে।

শুরু থেকে নগরীর উন্মুক্ত উদ্যানে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের সমালোচনা করে আসছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদ বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, এতে উন্মুক্ত স্থান সংকুচিত হয়ে যাবে। নষ্ট হবে পরিবেশ। মূলত তা- ঘটছে এখন।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক রাশিদুল হাসান বলেন, নগরের দুই নম্বর গেটের বিপ্লব উদ্যানের চারপাশে প্রচুর দোকান রয়েছে। এর পরও উদ্যানের ভেতর বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করে উদ্যানের পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে। দোকান নির্মাণের মাধ্যমে উদ্যানের উন্মুক্ত পরিসরের জায়গা কমে গেছে। আবার খাবারের দোকানের ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকবে। অনেক সময় দোকানগুলোতে ক্রেতাদের আসা-যাওয়ার কারণে কিছু জায়গা অবরুদ্ধ হয়ে যাবে।

নগরীর আরেকটি উন্মুক্ত উদ্যান পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার জাতিসংঘ পার্ক। পার্কটির দুটি সুইমিংপুল মেয়রের চার বছর মেয়াদেও চালু করতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এখন তা একপ্রকার পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

নাছির উদ্দীন মেয়রের দায়িত্ব নেয়ার পর ২০১৬ সালে জাতিসংঘ পার্ককে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ২৫ বছরের জন্য ইজারা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এলিট পার্ক লিমিটেড নামের ওই প্রতিষ্ঠান সেখানে কমিউনিটি সেন্টার গেস্ট হাউজসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু তাতে বাধা দেন তত্কালীন গৃহায়ন গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন পাঁচলাইশ আবাসিক সমিতি। এরপর থেকে উদ্যানটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম জাতিসংঘ পার্কের এক একর জায়গার ওপর দুটি সুইমিংপুল একটি জিমনেশিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর ২০১৫ সালের জুনে এগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয় কোটি টাকা। সুইমিংপুল জিমনেশিয়াম নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সময় সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে পরিবর্তন আসে। নতুন মেয়র হয়েছিলেন নাছির উদ্দীন। তাই তিনি সুইমিংপুল জিমনেশিয়াম চালু করার পরিবর্তে বাণিজ্যিকভাবে কমিউনিটি সেন্টার গেস্ট হাউজ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, জাতিসংঘ পার্কে নির্মিত দুটি সুইমিংপুলের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১২০ ফুট প্রস্থে ৫০ ফুট। এর একটির গভীরতা আট ফুটআরেকটির সাড়ে আট ফুট। জিমনেশিয়াম ভবনটি সাত হাজার বর্গফুট জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে। এর ভেতরে শরীরচর্চার কোনো সরঞ্জাম নেই।

গতকাল বিকালে সরেজমিনে দেখা যায়, জাতিসংঘ পার্কের অভ্যন্তরীণ রাস্তায় নালার উপচে পড়া ময়লা পানি জমে আছে। এর উত্কট দুর্গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে হাঁটার কোনো পরিবেশ নেই। মাটি ভরাট করে উঁচু করা হয়েছে পার্কটি। তবে সেখানে ঘুরে বেড়ানোর তেমন সুযোগ নেই। অস্থায়ীভাবে কয়েকটি বসার আসন রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা বলেন, বিপ্লব উদ্যানের আধুনিকায়নের যারা দায়িত্ব নিয়েছেন তারা স্থপতি। উদ্যানে যারা ঘুরতে আসবেন মূলত তাদের জন্য দোকান করা হয়েছে। সেখানে হালকা খাবারের দোকান, শোপিস জাতীয় দোকান থাকবে। লাইব্রেরিও থাকার কথা। এভাবে করা হলে পার্কের পরিবেশ বিঘ্ন ঘটার কথা না।

জাতিসংঘ পার্ক আমি করপোরেশনে যোগদানের আগেই প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল। শুনেছি বিভিন্ন জটিলতায় পার্কটির সুইমিংপুল জিমনেশিয়াম চালু করা যায়নি। এর মধ্যে কমিউনিটি সেন্টার রেস্ট হাউজ নির্মাণের প্রকল্প নিয়েও করপোরেশন বাধার মুখে পড়ে। এরপর থেকে পার্কটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তবে এখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়েরসেন্টার ফর ইনক্লুসিভ অ্যান্ড আরবানিজমকেপার্কটি দৃষ্টিনন্দন করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের কাছ থেকে নকশা পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

চট্টগ্রামে যে কয়টি খেলার মাঠ আছে তার মধ্যে অন্যতম কাজীর দেউড়ি আউটার স্টেডিয়াম মাঠ। যেই মাঠ থেকে উঠে এসেছে জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাবেক ক্যাপ্টেন আকরাম খান, বর্তমান জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন (ওয়ানডে) তামিম ইকবাল খান বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাবেক হার্ট হিটিং ব্যাটসম্যান আফতাব আহমেদের মতো খেলোয়াড়। কিন্তু সৌন্দর্যবর্ধনের নামে মাঠের পাশে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে সেই মাঠকেও খেলার অনুপযোগী করে তুলেছে সিটি করপোরেশন। আগে যেখানে মাঠে একসঙ্গে আট-দশটি গ্রুপে শিশু-কিশোররা খেলা করত, এখন সেখানে জমে আছে বৃষ্টির পানি।

বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউটের (বিআইপি) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আবু ঈসা আনছারী বলেন, উন্মুক্ত পরিসর মানুষের নাগরিক চাহিদা। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দড়ি টানাটানিতে জনগণ যদি নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তা হচ্ছে দুর্ভাগ্যজনক। এমনিতেই নগরে উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ কমছে। যতটুকু আছে, সেটুকুও ঠিকভাবে সংরক্ষণ করে সবার জন্য ব্যবহার উপযোগী করা উচিত। তা না করে পার্কের ভেতর বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ কিংবা অরক্ষিত অবস্থায় যদি ফেলে রাখা হয়, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভোগের কিছু হতে পারে না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন