সোমবার | সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ | ৫ আশ্বিন ১৪২৭

শেষ পাতা

খুলনা-মোংলা ৬৫ কিলোমিটার রেললাইন

তিন বছরের কাজ ১০ বছরে ৬৯% সম্পন্ন

তবিবুর রহমান

খুলনা থেকে মোংলার যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য ৬৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প নেয়া হয় ২০১০ সালে। তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত তিন দফা সময় বাড়িয়ে অগ্রগতি মাত্র ৬৯ শতাংশ। প্রকল্পের কার্যক্রমে শেষ পর্যায়ে ৯০ একর জমি নিয়ে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিরোধ দেখা গেছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যালোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। খুলনা থেকে মোংলা পোর্ট পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ (প্রথম সংশোধনী) প্রকল্পটির ওপর সম্প্রতি নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা করেছে সংস্থাটি। যার প্রাথমিক রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাজের শুরুর দিকে মোংলা বন্দরের মধ্যে কিছু রেল স্ট্যাক করার কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ইরকনের মধ্যে সংকট তৈরি হয়। এতে আটকে যায় প্রকল্প কাজের অগ্রগতি। প্রকল্পটি তিন বছরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তবে গত ১০ বছরের বেশি সময় পার হলেও প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে প্রকল্পের মূল কাজ রেলপথ নির্মাণে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫৪ শতাংশ। এরই মধ্যে তিন দফা বাড়ানো হয়েছে কাজের ব্যয় মেয়াদ। এর মাধ্যমে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২১ শতাংশ। তবে নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতিসহ অন্যান্য জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় আবারো ব্যয় মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। এতে জমি নিয়ে বিরোধ ছাড়াও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার তথ্যও উঠে এসেছে।

বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, জমির জটিলতা প্রকল্পের কাজের ক্ষেত্রে নানা সময়ে বিপত্তি তৈরি করেছে। নতুন করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। নিয়ম অনুসারে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীন জমিগুলো রেলপথ মন্ত্রণালয়ে দ্রুত হস্তান্তর করা হলেই আমরা কাজ সম্পন্ন করতে পারব। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জানা গেছে, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের জমিসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটি প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির সভায় আলোচনা হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে বা প্রকল্প কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভবিষ্যতে ডিপিপি সংশোধনকালে মোংলা বন্দরের ৯০ দশমিক ১২ একর ভূমি মূল্য কিংবা রেল মজুদকরণের ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থের সংস্থান রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে বলে বিভিন্ন সময়ে পিইসি সভার আলোচনায় উঠে এসেছে। যদিও প্রকল্প অফিস পরবর্তী সময়ে জমির মূল্য পরিশোধের অর্থ সংস্থান রাখবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু রেল মজুদকরণের ভাড়া বাবদ অর্থ পরিশোধ করবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ইরকন।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেল কাজের অগ্রগতির জন্য জমিসংক্রান্ত সমস্যা মিটিয়ে ফেলা দরকার, প্রয়োজনে রেল মন্ত্রণালয়ের বিষয়টি নিয়ে সমাধান করা খুব জরুরি। এছাড়া মোংলা পোর্টের জমির মূল্য পরিশোধ মোংলা বন্দরের ভেতরে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এছাড়া কাজের গুণগত মান পরিমাণ যথাযথভাবে আদায়ে ভারতীয় কোম্পানি ইরকন সাব-কন্ট্রাক্টরদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি রেলপথ মন্ত্রণালয়কে আরো কঠোর নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

বিষয়ে জানতে চাইলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মো. গিয়াস উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, চলমান খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণ কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। জমিসংক্রান্ত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্টরা গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। ফলে জমি নিয়ে তেমন কোনো বিরোধ নেই।

জানা গেছে, খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল হাজার ৭২১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় ঋণ ছিল হাজার ২২ কোটি ৩১ লাখ টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৫১৯ কোটি লাখ টাকা সরবরাহের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবায়নে বিলম্ব বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন শেষে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়। এতে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে হাজার ৪৩০ কোটি ২৬ লাখ টাকা ভারতীয় ঋণ পাওয়া যাবে হাজার ৩৭১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। ফলে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে গেছে হাজার ৮০ কোটি ২২ লাখ টাকা। পাইলিংয়ে জটিলতাও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। আটটি স্টেশনের মধ্যে দুটি স্টেশন বিল্ডিংয়ের (আরাংঘাট মোহাম্মদপুর নগর) ছাদ করা হয়েছে। অন্যান্য রেল স্টেশনের পাইলিংয়ের কাজ চলছে। তবে ট্র্যাক নির্মাণ সিগন্যালিংয়ের কাজ এখনো শুরু হয়নি। এছাড়া অনভিজ্ঞ সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগ করায় প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বাড়ছে।

প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে বেশকিছু সুপারিশ দিয়েছে আইএমইডি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রকল্পের রেললাইনের পিছিয়ে থাকা কাজ এগিয়ে নিতে যথাযথ জনবল নিয়োগ দেয়া; টার্গেট অনুযায়ী ঠিকাদারদের কাছ থেকে কাজ আদায়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ, একই সঙ্গে জনবল নিয়োগে বরাদ্দ কাজের ব্যয় নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সার্বক্ষণিক মনিটর করা; কাজের গুণগত মান ঠিক রেখে কাজের গতি বাড়িয়ে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চুক্তিপত্রের শর্তানুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঠিকাদারের আইপিসি পরিশোধ পরামর্শকদের বিলও সময়মতো পরিশোধ করতে সুপারিশ করেছে আইএমইডি। এছাড়া প্রকল্পের আগের পরিকল্পনা সংযুক্ত করে নতুন রেললাইন হিসেবে ট্রেন অপারেশন, স্টেশন মাস্টার, স্থাপন রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জমি নিয়ে জটিলতা প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বণিক বার্তাকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খুলনা থেকে মোংলা পর্যন্ত রেললাইন প্রকল্প। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট বিদেশীরা আসতে পারছেন না। ফলে প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি থেমে গেছে। সেটি কাটিয়ে উঠতে এরই মধ্যে বিকল্প উদ্যোগ নেয়া শুরু হয়েছে। তবে প্রকল্পের জমি কিংবা অন্য বিষয়গুলো সমাধানে আলোচনা করে সমাধান করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পটি শেষ করা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন