বুধবার | সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

কৃষিতে করোনা, আম্পান ও বন্যার অভিঘাত

মো. আবদুল লতিফ মন্ডল

২০২০ সালটি -যাবৎ বাংলাদেশের জন্য শুভ হয়নি। বছরটির তৃতীয় মাসে অর্থাৎ মার্চে বৈশ্বিক নভেল করোনাভাইরাস বাংলাদেশে আঘাত হানে। দেশে সংক্রমিত প্রথম রোগী শনাক্ত হয় মার্চ। ভাইরাসে প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। এর পর থেকে দেশে সংক্রমণ মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে নভেল করোনাভাইরাসে শনাক্ত মৃত ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে লাখ ২১ হাজার ১৭৮ এবং হাজার ৮৭৪ জন। বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭তম। নভেল করোনাভাইরাসে শুধু মানুষ প্রাণ হারায়নি, এতে কৃষি, শিল্প, সেবা খাতসহ দেশের অর্থনীতির সব খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। করোনার আক্রমণ চলাকালীন মে মাসের ২০-২১ তারিখে উপকূলীয় জেলাগুলো এবং উপকূলীয় নয় এমন ১৭টি জেলায় ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানে। আম্পানের তাণ্ডবে বাঁধ, সড়কপথ, ব্রিজ-কালভার্ট ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের সার্বিক কৃষি খাত (শস্য, মত্স্য, প্রাণিসম্পদ বন নিয়ে গঠিত সার্বিক কৃষি খাত) এই যখন অবস্থা, তখন জুনের শেষ দিকে উত্তরাঞ্চল পূর্বাঞ্চলে দেখা দেয় বন্যা। এরই মধ্যে বন্যা দেশের মধ্যাঞ্চলকেও গ্রাস করে ফেলেছে। তাছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও বিশেষ করে বরিশালে কয়েকটি নদ-নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশের প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনের তথ্য সরকারিভাবে প্রকাশ করা না হলেও বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক একাধিক কারণে ওই অর্থবছরে চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমর্থ হয়নি। প্রথমত, ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারলেও চাল উৎপাদনে শীর্ষে থাকা বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ( কোটি লাখ টন) অর্জনে সক্ষম হয়নি। ২০১৭-১৮ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে বোরো ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় কৃষক ২০১৯-২০ অর্থবছরে কম জমিতে বোরো আবাদ করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরের বোরো মৌসুমে জমি আবাদ লক্ষ্যমাত্রা প্রায় এক লাখ হেক্টর কম অর্জিত হয়েছে (বণিক বার্তা, ১৪ এপ্রিল) দ্বিতীয়ত, নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে পল্লী এলাকায়  হাটবাজারের দোকানপাট বন্ধ থাকায় কৃষকরা সময়মতো সার সরবরাহ পাননি। এতে বোরোর ফলন ব্যাহত হয়েছে। তৃতীয়ত, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ৪৭ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এর উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া করোনা আতঙ্ক দীর্ঘায়িত খরার কারণে এবার আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা -১৫ শতাংশ কমার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। খাদ্যমন্ত্রী . মুহাম্মদ রাজ্জাক সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, এবার আউশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (৩৬ লাখ টন) অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। 

গত অর্থবছরের মে মাসে খাদ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ওই অর্থবছরে আমন, বোরো আউশ মিলে কোটি ৭০ লাখ টন চাল উৎপাদন হবে; যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে লাখ ৪১ হাজার টন বেশি (বণিক বার্তা ১০ মে) এদিকে একই মাসে মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) পূর্বাভাসে বলা হয়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে চালের মোট উৎপাদন দাঁড়াবে কোটি ৬০ লাখ টনে। অর্থাৎ ইউএসডিএর হিসাব অনুযায়ী সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে চাল উৎপাদন আগের অর্থবছরের (১৯১৮-১৯) তুলনায় প্রায় সাত লাখ টন কম হয়েছে। এদিকে এক বছরে কমপক্ষে ২০ লাখ নতুন মুখ আমাদের খাদ্যে ভাগ বসিয়েছে।     

করোনা মহামারীতে যখন দেশের অর্থনীতি পর্যুদস্ত, তখন ২০-২১ মে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো আঘাত হানল ঘূর্ণিঝড় আম্পান। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত রিপোর্ট সরকার প্রকাশ করেছে বলে জানা নেই। তবে ঘূর্ণিঝড়ের পর পরই প্রকাশিত সরকারি প্রাথমিক হিসাবে হাজার ১০০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০টির বেশি ব্রিজ-কালভার্ট, কয়েক হাজার কিলোমিটার বাঁধ সড়কপথ, অন্তত ৩০ হাজার ঘরবাড়ি, হাজার হাজার গাছপালা এবং ২৩৩টি স্থানীয় সরকার কার্যালয়। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সার্বিক কৃষি খাত। খাতে ক্ষতির মধ্যে রয়েছে দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল, যার মধ্যে বোরো ক্ষেতের পরিমাণ ৪৭ হাজার হেক্টর। কোথাও বাঁধ ভেঙে আবার কোথাও বাঁধ উপচে ঘূর্ণিঝড়ের বায়ুতাড়িত জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে পুকুর ঘেরের মাছ। এর মধ্যে কেবল সাতক্ষীরা জেলায় চার হাজার মাছের ঘের ভেসে গেছে।

তাছাড়া মাছের ঘের ভেসে যায় পটুয়াখালী, বরগুনা, বাগেরহাট, হাতিয়াসহ আরো কয়েকটি জেলায়। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় ভেসে যায় আউশের বীজতলা, মুগ ডাল, মরিচ, আলু, তরমুজ, বাঙ্গিসহ বিভিন্ন ধরনের রবিশস্যের মাঠ। মরে যায় খামারের মুরগি। নষ্ট হয় শাকসবজির ক্ষেত। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার ৩৮৪ হেক্টর জমির আমবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেঙে পড়ে অনেক পানের বরজ কলাবাগান।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বরাবরই ঢাল হয়ে দেশকে আগলে রাখে সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে গাছপালার পাশাপাশি ভেঙেছে বিভিন্ন স্থাপনা বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের অবকাঠামো। বন বিভাগ সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সুন্দরবনের আড়াই কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়।

সম্প্রতি জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনিসেফ যথার্থই বলেছে, বাংলাদেশে এমন সময় বন্যা এসেছে, যখন দেশটি ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যাচ্ছে এবং এরই মধ্যে সম্প্রসারিত জরুরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে -যাবৎ দেশের উত্তরাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল মধ্যাঞ্চল বন্যার কবল গ্রাসে পড়েছে। এসব অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের ঘরবাড়ি বন্যায় তলিয়ে যাওয়ায় তারা তাদের খাদ্যশস্য, হাঁস-মুরগি গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে। তবে উত্তরাঞ্চল মধ্যাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দুই অঞ্চলের মানুষের বিপদ বেড়েই চলেছে। আর কৃষি খাতে চরম ক্ষতিতে পড়তে পারে উত্তরাঞ্চল। বণিক বার্তার ১৬ জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় উত্তরাঞ্চলের ৪২ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পানি বন্যা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এবারের বন্যা আগস্ট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। জাতিসংঘ বলেছে, ১৯৮৮ সালের পর বাংলাদেশে এবারের বন্যা সবচেয়ে দীর্ঘায়িত হতে পারে। আর ব্রিটিশ  সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপার সাইক্লোন আম্পানের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার মধ্যেই কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি মৌসুমি বন্যার কবলে পড়েছে বাংলাদেশ। কারণে বাংলাদেশে মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে বলে পত্রিকাটির ওই প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশে আঘাত হেনে আসছে, সেগুলোর মধ্যে যেটি বারবার সংঘটিত হয়ে আসছে, সেটি হলো বন্যা। এটি কখনো দেশের এক বা একাধিক এলাকায় এবং কখনো প্রায় পুরো দেশে সংঘটিত হয়। স্বাভাবিক বন্যা অনেক সময় দেশের সার্বিক কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় শস্য উপখাতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও প্রলয়ঙ্করী বন্যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এবারের বন্যাও প্রলয়ঙ্করী রূপ নেবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। দেশের মানুষ ১৯৮৮ ১৯৯৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যা মোকাবেলা করেছে। দুটি প্রলয়ঙ্করী বন্যা একদিকে যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতির ভয়াবহ ক্ষতি করেছে এবং মানুষের চরম দুর্ভোগ বয়ে এনেছে, তেমনি অন্যদিকে মানুষকে শিখিয়েছে বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে এবং বন্যার ক্ষয়ক্ষতি সামলে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে। এবারের বন্যা প্রলয়ঙ্করী রূপ নিলে আগের দুই প্রলয়ঙ্করী বন্যার মতো সেটি মোকাবেলা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে এবারের বন্যা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

চলতি বন্যার অবনতি না হলে এবং আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এটি স্থায়ী হলে চলমান আমন ফসলের তেমন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে এটি  প্রলয়ঙ্করী রূপ নিয়ে আগস্টের তৃতীয় বা শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হলে এবং দেশের দক্ষিণ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলও বন্যাগ্রস্ত হলে তা আমন উৎপাদনের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ তখন রোপণের জন্য চারা পাওয়া যাবে না এবং কিছু পরিমাণে পাওয়া গেলেও অনেক দেরিতে রোপণের ফলে ফলনের পরিমাণ খুব কম হবে। দেশে চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আমন ফসলটির উৎপাদন (দেশে মোট উৎপাদিত চালের কমবেশি ৩৮ শতাংশ  আমন থেকে পাওয়া যায়) অনেকটা প্রকৃতিনির্ভরশীল। প্রলয়ঙ্করী বন্যা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলটির দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজিরের অভাব নেই। দেশে করোনা মহামারীর অবস্থান আগামী ডিসেম্বর বা তার বেশি সময়ের জন্য দীর্ঘায়িত হলে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তায় আমনের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই চলমান আমন আবাদ থেকে যাতে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়, সেজন্য সরকারের উচিত হবে আমনচাষীদের সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেয়া।

বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়ানোয় বাংলাদেশের মানুষের রেজিলেন্স সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের দক্ষতা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশকে হার মানিয়েছে। করোনার মতো মহামারী, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার দেশে হানা দেবে এবং  এসব দুর্যোগ মোকাবেলা করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবেএই বিশ্বাস মনোবল নিয়ে আমাদের আগামী দিনের চলার পথকে মসৃণ করে তুলতে হবে। আমাদের প্রতিপালক আমাদের সহায়ক হবেন।

 

মো. আবদুল লতিফ মন্ডল: সাবেক সচিব

[email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন