মঙ্গলবার | সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ | ১৪ আশ্বিন ১৪২৭

করোনা

কভিড-১৯ নিয়ে আজ অবধি আমার যা জেনেছি

বণিক বার্তা ডেস্ক

আমরা ভয়ংকর বিভ্রান্তিকর এক মহামারীর মাঝে অবস্থান করছি। সব সময় এই মহামারী সম্পর্কিত নতুন সাংঘর্ষিক তথ্য আমাদের সামনে এসেছে। শুরুর দিকে বেশির ভাগ স্বাস্থ্য পরামর্শ ছিল অতীতের প্রাদুর্ভাবের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু নতুন এই করোনাভাইরাস কাজ করে একেবারে অপ্রত্যাশিত পদ্ধতিতে, যাকে বুঝতে পারা বেশ কঠিন। সাধারণত মানুষ নতুন বিষয় সম্পর্কে ধারণা তৈরিতে প্রথমে শেখা বিষয়গুলো মনে রাখে, যাকে বলা হয় অ্যাঙ্করিং বায়াস আর সেজন্য নতুন তথ্য দিয়ে পুরনো তথ্যকে প্রতিস্থাপন করা মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশ চ্যালেঞ্জিং। এখানে গত সাত মাসে করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমাদের শেখা নয়টি বিষয় তুলে ধরা হলো।

কভিড-১৯-এর সংক্রমণ যেকোনো জায়গায় হতে পারে: শুরু থেকে কভিড-১৯ সম্পর্কে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে এটা অন্য মানুষের সমস্যা। মহামারীর প্রথম দিকে বিষয়টা এমন ছিল যে চীনের মানুষ আক্রান্ত হয়েছে তাদের বন্যপ্রাণী কেনাবেচার অভ্যাসের কারণে। ইতালি আক্রান্ত হয়েছে একে অন্যের গালে শুভেচ্ছামূলক চুমু খাওয়ার কারণে। ক্রুজ শিপে আক্রান্ত হয়েছে বুফের কারণে। নার্সিং হোম আক্রান্ত হয়েছে রোগীরা দুর্বল বলে। নিউইয়র্ক শহর আক্রান্ত হয়েছে কারণ সেখানে ভিড় বেশি। কিন্তু এখন আমরা জানি কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব শহর গ্রাম যেকোনো জায়গায় হতে পারে এবং যেকোনো সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে এটি ছড়াতে পারে।

যে কেউ আক্রান্ত মারা যেতে পারে: মহামারীর প্রথম শিকার ছিল বৃদ্ধ এবং যাদের অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল তারা। বয়স দুর্বলতা এখনো মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়া মৃত্যুর কারণ কিন্তু এখন আমরা জানি যে রোগটি তরুণ স্বাস্থ্যবানদেরও মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তরুণ, কিশোর এবং এমনকি শিশুদেরও এটি হত্যা করতে পারে।

কেবল সংক্রমিত পৃষ্ঠতলই বিপজ্জনক নয়: শুরুতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন বারবার হাত ধোয়ার জন্য। পাশাপাশি স্থান বস্তুসমূহ জীবাণুমুক্ত করা হাত দিয়ে মুখ স্পর্শ না করার জন্যও বলেন তারা। এটা প্রস্তাব করা হয় মূলত কীভাবে অন্যান্য ভাইরাল রোগ ছড়ায় তার ওপর ভিত্তি করে, যেমন করোনাভাইরাস এবং সাধারণ সর্দিজ্বরের জন্য দায়ী ভাইরাস। এটা এখনো ভালো পরামর্শ যে নিয়মিত হাত ধোয়া এবং হাত মেলানো এড়িয়ে চলা। যদিও এখন আমরা জানি যে পৃষ্ঠতলই সার্স-কোভ--এর প্রধানতম ভেক্টর না।

বাতাসে চলাচল করে: শুরুতে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন এই ভাইরাস ছড়ায় হাঁচি-কাশিতে নির্গত ড্রপলেটের মাধ্যমে। তাদের ধারণা ছিল যে এই ড্রপলেট এতটাই ভারী যে তা বাতাসে ভেসে থাকতে পারে না। কিন্তু পরে একাধিক গবেষণায় দেখা গেল এটি বাতাসে ভেসে থাকতে এবং অবস্থায় যে কাউকে আক্রান্ত করতে সক্ষম।

অসুস্থ না হয়েই সংক্রামক হতে পারেন অনেকে: শ্বসনতন্ত্রের অন্যান্য রোগ মানুষের মাঝে হাঁচি-কাশির সৃষ্টি করে। প্রথম সার্স প্রাদুর্ভাব মানুষকে বাজেভাবে দ্রুত আক্রান্ত করে, যাদের অনেককেই আবার হাসপাতালে নিতে হয়। তাপমাত্রা পরিমাপ করে এবং সংক্রমণ শনাক্ত করে, মানুষকে ঘরে থাকতে বলে লক্ষণসমৃদ্ধ রোগের বিস্তৃতি রোধ করা যায়। মহামারীর শুরুর দিকে অনেক দেশ সীমান্তে স্ক্রিনিং করে কেস শনাক্ত করে। কিন্তু কভিড-১৯-এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে স্বাস্থ্যবান লোকজন রোগ ছড়ায় কোনো ধরনের উপসর্গ ছাড়াই কিংবা উপসর্গ দেখা দেয়ার আগেই অনেকে কথা বলা এবং নিঃশ্বাস নেয়ার মাধ্যমে অন্যদের মাঝে ভাইরাস স্থানান্তরিত করে থাকে।

গরম আবহাওয়া করোনাভাইরাসকে থামাতে পারে না: শ্বাসতন্ত্রের মৌসুমি রোগ ইনফ্লুয়েঞ্জা যা কিনা শীতকালে চূড়ায় ওঠে এবং অনেক বিশেষজ্ঞ আশা করেছিলেন যে কভিড-১৯-এর বিস্তৃতিও একই প্যাটার্নে ঘটবে এবং উত্তর গোলার্ধের জায়গাগুলোতে বসন্ত গ্রীষ্মে এর প্রকোপ কমে আসবে। কিন্তু এখন আমরা জানি, যেকোনো মৌসুমে রোগ ছড়াতে পারে। মানুষের সচেতনতাই কেবল এর গতিকে শ্লথ রাখতে পারে।

মাস্ক কার্যকর: মহামারীর শুরুর দিকে মাস্ক কেনার হিড়িক পড়ে যায়। সে সময় অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, গণহারে সবাই মাস্ক পরা শুরু করলে তা স্বাস্থ্যকর্মী এবং অন্য যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের জন্য এর ঘাটতি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি তারা এটাও সন্দেহ করেন যে মাস্কের ব্যবহার মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং এই ধারণা তৈরি করতে পারে যে কাগজ বা কাপড়ের তৈরি এই মাস্ক ক্ষুদ্র ভাইরাল কণাকেও আটকে দিতে পারে। কিন্তু এখন আমরা জানি, মানুষের কথা বলার সময় নির্গত ভাইরাস কণার বড় অংশকে মাস্ক ব্যাপক হারে কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি যারা এটি পরে পুরোপুরিভাবে না হলেও, যথেষ্ট পরিমাণে রোগের বিস্তৃতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।

জাতি নয়, বর্ণবাদই ঝুঁকির কারণ: কভিড-১৯ সামঞ্জস্যহীনভাবে অশ্বেতাঙ্গ লোকদের হত্যা করেছে। এটা কোনো জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে হয়নি। এটি হয়েছে পদ্ধতিগত বর্ণবাদের কারণে। কৃষ্ণাঙ্গ লাতিন মানুষরা যে ধরনের কাজ জীবন যাপন করে তাতে তাদের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। পাশাপাশি তাদের উদ্বেগের বোঝাও বেশি থাকে এবং স্বাস্থ্যসেবায় তাদের প্রবেশাধিকারও সীমিত।

ভুল তথ্যও হত্যাকারী: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, অন্যান্য রাজনীতিবিদ, ভ্যাকসিনবিরোধী আন্দোলনকারী এবং ডানপন্থী মিডিয়ার লোকজন লজ্জাজনকভাবে মহামারীকে বর্ণবাদের প্রচার, ভুল তথ্য ছড়ানো এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করেছে। তাদের অনুসারীরা আবার স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের হুমকিও দিয়েছে। তারা মাস্ক পরতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যান্য নীতিও মেনে চলেনি। এগুলো ভাইরাসের বিস্তৃতিতে ভূমিকা রেখেছে এবং সাধারণ মানুষকে ভুল দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন