সোমবার | সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ | ৬ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

একজন প্রকৃত রাষ্ট্রচিন্তক ও কলম যোদ্ধার বিদায়

মাছুম বিল্লাহ

দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রচিন্তক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম ভাইস-চ্যান্সেলর জনাব এমাজউদ্দিন স্যার গত ১৭জুলাই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। এই কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দেশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে আমরা হারিয়েছি। সকালবেলা সংবাদপত্র পড়তে বসলে বিশেষ কোন বিষয়ের ওপর কিংবা জাতীয় কোন দিবসে স্যারের বিশ্লেষণধর্মী লেখাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তাম কারণ তার লেখাগুলো ছিল বিখ্যাত মনীষীদের উক্তি ও বইয়ের রেফারেন্সে সমৃদ্ধ। লেখাগুলো পড়লেই বুঝা যেত যে রাষ্ট্রচিন্তায় তার জ্ঞান  কত গভীরে! এমাজউদ্দিন স্যারের সবকিছু ছাপিয়ে বড় পরচিয় ছিল তিনি একজন আদর্শ ও নিবেদিতপ্রান শিক্ষক। স্যার ছিলেন এ উপমহাদেশের একজন খ্যাতীমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। দেশবরণ্যে বুদ্ধিজীবী হিসেবে দলমত নির্বিশেষে তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তি।  জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হারুন অর রশীদ স্যার তার অন্যতম কৃতী ছাত্র, আদর্শিক দিক দিয়ে তারা আলাদা কিন্তু তার মন্তব্য হচ্ছে, তিনি আমার দেখা একজন আদর্শ শিক্ষক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার ক্লাস করেছি। তাকে কেউ কখনো রাগতে দেখিনি।’ আমরাও কখনও স্যারকে উচচস্বরে কথা বলতে কিংবা উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে দেখিনি। ধীর লয়ে মেপে মেপে কথা বলতেন। দলচিন্তায় তিনি নিজের স্বাধীন চিন্তাকে আচছন্ন হতে দেননি। সীমাবদ্ধতা সত্তে¡ও তিনি যে স্বকীয়তা ধরে রেখেছিলেন সেই উদাহরণ রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরল। একবার   বিএনপি নেতা আফতার আহমেদ ও অধ্যাপক হরুন  রশীদ স্যারকে  প্রণোদনা দেওযার প্রশ্ন এল। এমাজউদ্দিন আহমদ তখন উপাচার্য ও বোর্ড সদস্য। হরুনর রশীদ স্যার দেখলেন তাকেই একটি ইনক্রিমেন্ট দিয়ে এগিয়ে রাখা হলো। এটি ছিল তার মেধার স্বীকৃতি। আজকের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা অন্য যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ে  এমনটি কি দেখা যাবে কিনা আমাদের সন্দেহ হচ্ছে।বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং শিক্ষক রাজনীতির যে অবস্থা হয়েছে তাতে এই বিষয় বিশ্বাস করা কঠিন।

এমাজউদ্দিন আহমদ স্যার ১৯৩২ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের মালদা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালে অবিভক্ত মালদার গোলাপগঞ্জ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর রাজশাহী কলেজ থেকে উচচমাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন। স্নাতকে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযে পলিটিক্যাল সায়েন্সে। সেখান থেকে ১৯৫৪ সালে স্নাতকোত্তর । তারপর দুটি কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। এরই ফাঁকে ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষার প্রতি একজন মানুষের কত আকর্ষণ ও ডেডিকেশন থাকলে এটি সম্ভব! ঢাকা থেকে দূরবর্তী কোন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে (যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না) অন্য একটি বিষয়ের একজন শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে আলাদা স্নাতকোত্তর পাস করা কতটা ধৈর্য্য ও সাহস থাকলে সম্ভব! 

ড. এমাজউদ্দিন আহমদ পিএইচডি অর্জন করেন কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালে। আশির দশকে তিনি জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট কলেজ  ইউনিভার্সিটিতে সিনিয়র ফেলো ছিলেন। বর্ণাঢ্য শিক্ষা জীবনের তালিকাই বলে দিচ্ছে তার জ্ঞানের গভীরতার কথা। প্রায় আড়াই দ্শক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষযের অধ্যাপনার পাশাপাশি পালন করেন অনেক প্রশাসনিক পদের দায়িত্বও। ছিলেন বিভাগীয় প্রধান, হল প্রভোস্ট, প্রক্টর, সিনেট ও  সিন্ডিকেট সদস্য, অনুষদ অধিকর্তা, প্রোভিসি এবং সবশেষে ভিসি। 

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমরা দেখেছি সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব প্রশাসনিক কাজে যারা ব্যস্ত থাকেন তারা পড়াশোনা কিংবা একাডেমিক বিষয় নিযে তেমন একটা চিন্তা করেন না। অথচ এমাজউদ্দিন স্যারের ক্ষেত্রে দেখলাম এর ভিন্নতা। অনেক তত্ত্বজ্ঞান আর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ মানুষ গড়ার কারিগরের এ জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে তত্ত্ব তথ্যজ্ঞান বিতরণের মধ্যে দিয়ে।  ইংরেজী-বাংলা মিলিয়ে লিখেছেন পঞ্চাশটিরও বেশি বই। বিশ্লেষণধর্মী কলাম লেখা ছাড়াও দেশী ও বিদেশী জার্নালে রয়েছে শতাধিক প্রকাশনা। কীভাবে সম্ভব! জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং ১৯৯২ সালে লাভ করেন একুশে পদক। 

স্যার ১৯৯৬ সালে কর্মবিরতিতে চলে যান এবং  ২০০২ সালে যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের ভিসি পদে। শেষ পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি ফজলুল হক হলের নির্বাচিত ভিপিও ছিলেন। মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৫২পরবর্তী সময়ে ঢাবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা হিসেবে এমাজউদ্দিন আহমদ কারাবরণ করেন। ৪০ বছর ধরে এমাজউদ্দিন আহমদ তুলনামূলক রাজনীতি, প্রশাসন-ব্যবস্থা, বাংলাদেশের রাজনীতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক বাহিনী সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। এসব ক্ষেত্রে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবেই পরিচিত। তার লিখিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য  হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা, মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তা, তুলনামূলক রাজনীতি, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, বাংলাদেশে গণতন্ত্র সংকট, সমাজ ও রাজনীতি, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত, শান্তিচুক্তি ও অন্যান্য প্রবন্ধ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, জাতীয় নিরাপত্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রবন্ধ। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তার প্রাণ। তিনি ছিলেন এ বিদ্যাপীঠের ছাত্র ও শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এ সমাজে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু গৌরবের, তার সবকিছুতেই রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোঁয়া।’

তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি অহরহই বলতেন, ‘জাতীয় স্বার্থেই গণতন্ত্রের চর্চা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর ও মহত্তর হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ।’ তিনি আরও বলতেন, ‘ দলীয় স্বার্থের কারণেই দেশে হিংসাত্মক কার্যক্রমের মাত্রা আজ উচ্চতর হয়েছে। কিন্তু সবাইকে বুঝতে হবে আমরা সবাই চাই, গণতন্ত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যত।’ 

ক্ষমতাসীনদের প্রতি তার সব শেষ আহ্বান ছিল, ‘হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে উদার হোন, মানুষের কথা ভাবুন, দেশের কথা ভাবুন। সংবাদপত্রকে, গণমাধ্যমকে তার সৃষ্টিশীল স্রোতধারায় এগিয়ে যেতে দিন।’ গণতন্ত্রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তিনি একথাগুলো বলেছেন। দেশের রাজনীতির দূরবস্থা সবসময় তাকে ভাবিয়ে তুলত যা তার লেখনীতে ফুটে উঠত। তবে তিনি আশাবাদীও ছিলেন এবং তার প্রতিটি লেখায় উল্লেখ করতেন, রাজনীতির এই অসুস্থতা শিগগিরই দূর হবে। দূর হবে সমাজজীবনে অগ্রহণযোগ্য শত উপসর্গ। আবারো এ সমাজে দেখা দেবে উজ্জ্বল আলোকরশ্মি। মানুষের স্বস্তি ফিরে আসবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে থিউরি ও প্রাকটিসের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র পরিচালনা, রাষ্ট্র গঠন ও জাতি গঠনে গবেষণাভিত্তিক লেখালেখি দ্বারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা বলয়ের নীতিনির্ধারকদের ধ্যানধারণা ও স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করা। তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান রাজনীতিকদের সমৃদ্ধ করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে এমাজউদ্দিন স্যারের  অবদান নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র এবং প্রশাসন যাত্রা শুরু করলে তিনি সেগুলোতে নির্দ্বিধায় বিচরণ করে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমস্যা আলোচনা ও সমস্যার সমাধানের কৌশল দিয়েছেন গবেষণার মাধ্যমে। রাজনীতি, সমাজ রাজনীতি ও ধর্ম, উন্নয়ন, বৈদেশিক নীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনসহ প্রায় সবক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন, গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার ওপর। তার গবেষণায় উঠে এসেছে সামরিক শাসনের নেতিবাচক দিক। 

তবে তিনি কিন্তু রাজনীতিবিদ হননি, শিক্ষাবিদের পরিচয়কেই বড় রাখতে চেয়েছেন। বিএনপির কোন পদেই তিনি ছিলেন না। তিনি আওয়ামী লীগের শক্তিশালীকরণেও বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বলতেন ক্ষমতাসীন দল থেকে দেশের প্রকৃত প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে দিতে নেই। বিরোধী দলকে খুব বেশি পর্যুদস্ত বা শতবিচ্ছিন্ন রাখাটা ক্ষমতাসীন দলে পক্ষে সমূহ বিপদ। যার প্রমাণ আমরা আজেকে প্রত্যক্ষ করছি- রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি কীভাবে ডালপালা বিস্তার করে সমাজ, দেশ ও মানুষের অধিকারকে হরণ করেছে।  

তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে সেগুলো বারবার প্রকাশ করেছেন। তার বিরুদ্ধ মতের কথা শুনতেও তিনি ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাননি। স্যারের বিশ্বাস ছিল দুই বড় দলে ন্যূনতম ঐক্যই জাতি গঠনের বৃহৎ শক্তি হতে পারে যা চীন, ভারতসহ অনেক দেশ বাংলাদেশকে সমীহের চোখে দেখতে সহায়তা করবে। এই সত্য এ দেশের সাধারণ মানুষ বোঝে কিন্তু বোঝে না আমাদের রাজনীতিকেরা, তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করেছিলেন এমাজউদ্দিন স্যার।

মানুষের চিন্তাচেতনা ও আদর্শ-বিশ্বাসের ভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক- এটি প্রকৃত গণতন্ত্রের কথা।  সমাজের অলংকারও বটে। স্যারের লেখালেখি, বক্তব্য-বিবৃতি ও আমাদের জাতির বুদ্ধিদীপ্ত প্রদীপগুলোর অন্যতম। তিনি নির্দ্বিধায় বলতেন গণতন্ত্র ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করা যাবে না। দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার তিনি সব সময় আশা করতেন যে, দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে, মানুষের বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে পরিচালিত হবে এই দেশ।

এমন হাজারো স্বপ্ন দেখতেন এই ক্ষণজন্মা মানুষটি। জনমত গঠন করতে কলম ধরেছিলেন হাতে, লিখেছেন মানুষের কথা, দেশের কথা, সমৃদ্ধির করা, গণতন্ত্র ও সুশাসনের কথা। 

আমরা আশা করি দেশে একদিন সুশাসন ফিরে আসবে, সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে, রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের ওপর পশ্চিমা বা যেকোন বিদেশী শক্তির মতো আর চড়াও হবে না, দেশের সম্পদের মালিকানা কিছু দুর্বত্তের হাতে থাকবে না, দেশের মালিক হবে দল-মত নির্বিশেষে এদেশের জনগণ, রাষ্ট্রের কাছে তাদের পাওনা তারা ফিরে পাবেন।

ওপারে ভালো থাকুন স্যার। সালাম। 

মাছুম বিল্লাহ

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক 

ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত ভাইস-প্রেসিডেন্ট: বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশেন(বেল্টা) এবং সাবেক ক্যাডেট কলেজ, রাজউক কলেজ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যিালয় শিক্ষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন