শনিবার | সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা হ্রাস

ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়বে

করোনার নমুনা পরীক্ষা করার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। উপসর্গ ছাড়া পরীক্ষা না করা, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা লোকজনকে পরীক্ষার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির নেগেটিভ জানতে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা না করাএমন বেশকিছু শর্ত আরোপের কারণে নমুনা সংগ্রহের পরিমাণও কমে গেছে। এছাড়া পরীক্ষা করাতে যে দুর্ভোগ, সে কারণেও মানুষের মধ্যে ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখা দিয়েছে।  নমুনা কমলেও এখনো পরীক্ষার ফল পেতে বেশ দেরি হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই, সেসব জেলার মানুষের কমপক্ষে এক সপ্তাহ লেগে যাচ্ছে তার করোনার পরিস্থিতি জানতে। সর্বোচ্চ ১৪ দিন, এমনকি ২১ দিনও লাগছে ফল পেতেএমন ঘটনাও ঘটছে। ফলে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের কথা জানার আগেই কারো কারো মৃত্যু ঘটছে, আবার অনেকেই সুস্থ হয়ে উঠছে। করোনার নমুনা পরীক্ষা কমলেও শনাক্ত মৃত্যুর হার কিন্তু কমেনি; বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে দেশীয় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা করোনার প্রকোপ কমাতে পরীক্ষার আওতা বৃদ্ধি এবং আইসোলেশনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে করোনার নমুনা পরীক্ষা কমে যাওয়া উদ্বেগজনক বৈকি। উপসর্গ থাকলেও অনেক সন্দেহভাজন রোগী পরীক্ষা করাতে পারছে না। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। অবস্থায় করোনার নমুনা পরীক্ষায় সরকারিভাবে ফি আরোপ অমানবিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে আসছে, ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে প্রধান কাজ হচ্ছে পরীক্ষা। একদিকে কিট দক্ষ জনবল সংকটে পরীক্ষার ধীরগতি, অন্যদিকে ফি নির্ধারণে সাধারণ মানুষের মাঝে আগ্রহ কম। জীবন-জীবিকা কঠিন হয়ে যাওয়ায় বড় শহর থেকে মানুষ গ্রামে ফেরত যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ৪৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। তিনবেলা আহারে যাদের কষ্ট হচ্ছে, সেখানে টাকা দিয়ে পরীক্ষা করানোকে তারা কতটা গুরুত্ব দেবে। এছাড়া রয়েছে নমুনা সংগ্রহে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা। যেসব হাসপাতাল বা বুথে পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেখানকার পরিবেশ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। কোথাও গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আবার কোথাও একই ঘরের মধ্যে নমুনা পরীক্ষা করতে যাওয়া সবাইকে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা যখন অব্যাহত রয়েছে, তখন পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখা উচিত আমরা কোন কোন ক্ষেত্রে কী কী ভুল করছি, সীমাবদ্ধতাগুলো কী ছিল। পৃথিবীজুড়ে চেষ্টা চলছে এই মহামারী মোকাবেলার জন্য। সবাই দিনে দিনে উন্নতি করছে। আমরা পিছিয়ে পড়ছি।

আমাদের মানতেই হবে যে সন্দেহভাজন সব আক্রান্তকে পরীক্ষা করাই হচ্ছে ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলা করার সবচেয়ে কার্যকর পথ। কেউ আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হলে তাকে যেমন সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সম্ভব, তেমনি তার সংস্পর্শে আসা লোকজনকেও সম্ভাব্য আক্রান্ত হিসেবে বিবেচনা করে বাড়িতে কোয়ারেন্টিন করা যাবে। তাতে অন্য লোকজনকে সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচানো যাবে। পরীক্ষার ঘাটতি থাকায় করোনার লক্ষণ আছে এমন অনেক রোগী চরম বিপদে পড়েছে। করোনাকবলিত বিশ্বের অন্য দেশগুলোয় কী হারে পরীক্ষা হচ্ছে, তার ওপর দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ শুরু থেকেই খুব খারাপ অবস্থায়। করোনা পরীক্ষায় পদে পদে হয়রানি যাতনা বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। পরীক্ষাকেন্দ্র কম হওয়ায় দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, পরীক্ষার জন্য টাকা জমা দেয়া, রসিদ সংগ্রহ, নমুনা দেয়াসহ প্রতিটি জায়গায় দীর্ঘ লাইন ধরতে হয়। সকাল ৬টায় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় নমুনা দেয়া যায় না। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে নমুনা দিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকে। আরো রয়েছে নমুনা পরীক্ষার ফল পেতে দীর্ঘসূত্রতা। অধিক পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা গেলে এত ভোগান্তি পোহাতে হতো না। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক উপসর্গহীন করোনা রোগী রয়েছে। এই নীরব করোনার বাহক শনাক্ত করা এবং তাদের আইসোলেশনে পাঠানোই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। দুইভাবে সংক্রমণ কমানো যায়। এক. কঠোরভাবে শাটডাউন কার্যকর করা; দুই. করোনা পরীক্ষার হার বাড়িয়ে সংক্রমিত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করা এবং তাদের আইসোলেশনে পাঠানো। করোনা পরীক্ষার ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সংক্রমণ প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

যেহেতু আমাদের এখানে অর্থনৈতিক কাজকর্ম পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত হচ্ছে, সেক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা আমাদের প্রেক্ষাপটে অনেক। কারণ একটা ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করেন, এখন যদি জানা যায় তাদের মধ্যে কতজনের করোনা হয়েছিল, তাহলে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে। এক্ষেত্রে কতজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে গেছে, এটি জানাও দরকার। কার করোনা হয়েছে, কার হয়নি, এটি জানলেই আমাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু করাটা সহজ হতো। করোনার বিস্তার এখন গ্রাম পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে প্রতিটি জেলায় করোনা পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। সহজেই করোনা থেকে পরিত্রাণ মিলছে না, এটি নিশ্চিত বলা চলে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি রোগ হিসেবে এটি পরীক্ষার সুযোগ বিস্তৃত করা প্রয়োজন। মোট শনাক্তের হার ২০ দশমিক ১৬ শতাংশ। মে মাস পর্যন্ত তা কম ছিল। জুনে গিয়ে শনাক্তের হার বেড়ে যায়। জুলাইয়ে নমুনা পরীক্ষা কমে যায়। তবে শনাক্তের হার বেড়ে যায়। আবার মৃত্যুহার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মে মাসে মৃত্যুহার দশমিক ৩৭ শতাংশ ছিল। জুনে কিছুটা কমে আসে। আবার জুলাইয়ে আগের অবস্থানে চলে যায়। তবে সুস্থতার হার মে মাসের তুলনায় জুনে দ্বিগুণ বাড়ে। জুলাইয়ে আরো বাড়ে। এই সুস্থতার হার বেড়ে যাওয়ার কারণ ছিল সুস্থতার সংজ্ঞায় পরিবর্তন। একই সঙ্গে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির দ্বিতীয়বার তৃতীয়বার করোনা নমুনা পরীক্ষা না করানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে পজিটিভ থাকা অনেক ব্যক্তি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে নেগেটিভ বলে বিবেচিত হয়। এসব কারণে সুস্থতার হার বেড়ে যায়। সুতরাং নমুনা পরীক্ষা কম হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি কম শনাক্ত হয়েছে। তবে শনাক্তের হার ছিল বেশি। এতে বলা যায়, দেশে করোনার সংক্রমণ কমেনি। এক্ষেত্রে পরীক্ষা আরো বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন