বৃহস্পতিবার | ডিসেম্বর ০৩, ২০২০ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

টেলিকম ও প্রযুক্তি

সাড়ে ৬ লাখ নারী ই-কমার্স উদ্যোক্তার প্লাটফর্ম ‘উই’

বকুল রায়

২০১৭ সালের অক্টোবরে যাত্রা করে নারী -কমার্স উদ্যোক্তাদের অনলাইন প্লাটফর্ম উইমেন অ্যান্ড -কমার্স ফোরাম বা উই, যা এখন দেশের ৬৪ জেলার ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের অন্যতম ভরসার প্লাটফর্ম হয়ে উঠেছে। অনলাইন প্লাটফর্মটিতে দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করছে এমন উদ্যোক্তার সংখ্যা লাখ ৪১ হাজার ছাড়িয়েছে। এছাড়া প্লাটফর্মটিতে দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী নতুন উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

বৈশ্বিক কভিড-১৯ মহামারীর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের ক্ষুদ্র-মাঝারি বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। করপোরেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ভয়াবহ মহামারী প্রভাব ফেলেছে ব্যক্তি পর্যায়ে। চাকরির বাজারে এখন ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা অনেক ক্ষুদ্র-মাঝারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান করোনা সংকট পরবর্তী অনিশ্চিত সময়ের কথা বিবেচনা করে ব্যয় সংকোচনের দিকে ঝুঁকছে। এরই অংশ হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে বেকারত্ব বাড়ছে।

বৈশ্বিক মহামারীর নতুন স্বাভাবিকতা মেনে নিয়ে ভবিষ্যতে কী করা যায়, তা কম-বেশি সবাইকে ভাবাচ্ছে। অনেকে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় মেধা, প্রশিক্ষণ সৃজনশীলতার মাধ্যমে নারীরা নিজেদের সফল অনলাইন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছেন। দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করছেন এমন নারীদের দেশ দেশের বাইরে পরিচিত করার নির্ভরযোগ্য প্লাটফর্ম উইয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেজ আছে। তবে দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করছেন এমন পুরুষদেরও প্লাটফর্মটিতে সক্রিয় উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।

উইয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার নিশা বলেন, উইকে আমরা অনন্য উচ্চতায় দেখতে চাই। লাখ লাখ মানুষের একটি প্লাটফর্ম তৈরি করা খুব সহজ নয়। মানুষ চাইলে রাতারাতি অনেক ফেসবুক গ্রুপ বা পেজ চালু করতে পারেন। কিন্তু এসব গ্রুপ বা পেজ মানুষের কাজে আসতে পারে, সে পর্যন্ত পৌঁছানো সহজ নয়, যা উই পেরেছে।

তিনি বলেন, এখানে নারী উদ্যোক্তারা গোটা দেশ থেকে সব ধরনের পণ্য নিয়ে পোস্ট দেয়। কিছু পণ্য তারা সংগ্রহ করে যেমনশাড়ি। আবার কিছু পণ্য নিজেরা বানায় যেমনখাবার হাতে তৈরি গহনা। তাদের চেষ্টার ফলে এখন আমরা অনেক পণ্যের নাম জানি। বাংলাদেশে যে কত ধরনের পণ্য তৈরি হয়, উৎপাদিত হয়, তা সম্পর্কে অনেকের ধারণা ছিল না।

উই বিষয়ে প্লাটফর্মটির উপদেষ্টা এবং -কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (-ক্যাব) সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রাজিব আহমেদ বলেন, উই ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের বিশ্বস্ত একটি প্লাটফর্ম হলেও এর পরিধি আরো অনেক বেশি বিস্তৃত। অনেক পুরুষ উদ্যোক্তা এখানে সক্রিয়। কারণ তারা দেশী পণ্য বিক্রি করেন অনলাইনে। দেশী পণ্যের -কমার্স ইন্ডাস্ট্রির ভিত উইয়ের হাত ধরে খুব অল্প সময়ে দৃঢ় হয়ে উঠেছে। উই -কমার্সে জড়িত নারী উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় অনলাইন প্লাটফর্ম কোনো সন্দেহ নেই।

উই প্লাটফর্মে যে কেউ যুক্ত হতে এবং পোস্ট দিতে পারেন। পণ্য বিক্রির আগে কিংবা পরে কাউকে এক টাকাও চার্জ/ফি/কমিশন দিতে হয় না। এটিই মূলত উইয়ের দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণ। উইতে বিক্রির থেকেও -কমার্স নিয়ে শেখার জানার দিকে গুরুত্ব দেয়া হয় বেশি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সমর্থনে দেশব্যাপী পর্যন্ত প্রায় ৮০০ জন -কমার্স উদ্যোক্তার জন্য বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে পেরেছে উই। এজন্য তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

উই সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্লাটফর্মটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মাসে মোট বিক্রির নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। তবে টাকার অংকটা কয়েক কোটি হবে সন্দেহ নেই। বিক্রির পর প্রচুর রিভিউ পোস্ট আসে। করোনার মধ্যে যেখানে বেশির ভাগ -কমার্স ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ আর গ্রুপে হতাশা দেখা যাচ্ছে। উই এদিকে পুরোই ব্যতিক্রম। বিভিন্ন অঞ্চলের বিখ্যাত যেসব পণ্য হারিয়ে যেতে বসেছে, সেসব পণ্যের পাশাপাশি আরো অনেক পণ্য নিয়েই ব্যবসা করছেন উইয়ের উদ্যোক্তারা। কভিড-১৯ মহামারীর মধ্যেও গত কয়েক মাসে উইয়ের সদস্যদের মধ্যে শতাধিক লাখপতি খেতাব পেয়েছেন। যাদের অনেকেরই লকডাউনের মধ্যে পণ্য বিক্রি টাকার অংকে ১৬-১৭ লাখ ছাড়িয়েছে। লাখপতি উদ্যোক্তারা কখনো মনোবল হারাননি। তারা দেশজুড়ে লকডাউনের মধ্যেও থেমে থাকেননি। বাসায় থেকে উইয়ের গাইডলাইন মেনে নিয়মিত ছিলেন উই প্লাটফর্মে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি উইয়ের সঙ্গে যুক্ত বিদেশে থাকা অনেক উদ্যোক্তাও ব্যবসা করছেন। এছাড়া বিদেশে থাকা সদস্যরা অন্য উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে কেনাকাটাও করছেন। নভেল করোনাভাইরাসের সময় নিজেরা দেশে আসতে না পারলেও আত্মীয়দের মাধ্যমে কেনাকাটা করেছেন।

রাজিব আহমেদ বলেন, অর্ধযুগ ধরে নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছি ফেসবুককে মানুষের কাজে লাগাতে। তাই আমি চাই দেশী পণ্যের উদ্যোক্তাদের জন্য উই সব সময় কাজ করুক। ঢাকার বাইরে ছোট শহর এবং গ্রাম পর্যায়ে দেশী পণ্যের উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, লেখাপড়া যেন উইয়ের প্রথম প্রধান কাজ হয়। উই সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, গত ছয় বছরে -কমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি যে মানসম্মত লেখাপড়া এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। উইয়ের মাধ্যমে দেশী পণ্য দেশের পাশাপাশি প্রবাসীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক প্রবাসী এখন বাংলাদেশে থাকা তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে উইয়ের উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন

×