রবিবার | নভেম্বর ২৯, ২০২০ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সাক্ষাৎকার

শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের পুঁজিবাজারে আসা উচিত

পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের জন্য আগামী ৮ আগস্ট সাবস্ক্রিপশন শুরু করতে যাচ্ছে ওয়ালটন গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১০০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করবে কোম্পানিটি। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ ব্যবসায়িক ও আর্থিক বিভিন্ন দিক নিয়ে সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান রাহাত

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ওয়ালটনের ব্যবসা কেমন যাচ্ছে?
কভিড-১৯-এর কারণে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশও এর ঊর্ধ্বে নয়। এপ্রিল ও মে মাসে সাধারণ ছুটির সময় আমাদের ব্যবসা অনেক কমেছে। অবশ্য জুন ও জুলাইয়ে ব্যবসা পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। মূলত দুই ঈদেই আমাদের সবচেয়ে বেশি ব্যবসা হয়ে থাকে। সাধারণ ছুটির কারণে ঈদুল ফিতরে একেবারেই ব্যবসা ছিল না। গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে এ বছর আমাদের ৪০ শতাংশের মতো ব্যবসা কমেছে। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিতে হয়েছে আমাদের। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে আমরা সপ্তম সিজনের মতো মিলিয়নেয়ার ক্যাম্পেইন চালু করেছি। ক্রেতাদের কাছ থেকে এ ক্যাম্পেইনকে ঘিরে ভালো সাড়াও পেয়েছি।

আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসছে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। আপনাদের পণ্যগুলো সম্পর্কে বলুন।
ওয়ালটন হাই-টেক মূলত পাঁচ ক্যাটাগরির পণ্য উৎপাদন করে। এর মধ্যে রয়েছে রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, স্মল হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস ও ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্সেস। স্মল অ্যাপ্লায়েন্সেসের মধ্যে ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, ব্লেন্ডার, রাইস কুকার ও গ্যাস স্টোভের মতো পণ্য রয়েছে। আর ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্সেসের মধ্যে সুইচ, সকেট, এলইডি লাইট ও ফ্যান রয়েছে। বর্তমানে দেশের রেফ্রিজারেটরের বাজারে ওয়ালটনের মার্কেট শেয়ার ৭৪ শতাংশ। আর আমাদের পোর্টফোলিওতে থাকা পণ্য বিক্রি করে যে রাজস্ব আয় হয়, তার ৮৫ শতাংশই আসে রেফ্রিজারেটর থেকে।

করোনাকালের মতো চ্যালেঞ্জিং সময়ে আপনারা পুঁজিবাজারে আসছেন। বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হাতেগোনা কয়েকটি খাতের শেয়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ অবস্থায় ওয়ালটনের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কী?
কভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও যাতে সাপ্লাই চেইন সিস্টেম ঠিক থাকে, সেজন্য আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। যদিও করোনার সঙ্গে আমাদের পণ্যের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু সামনের দিনগুলোয় আমাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে পরিচালনা করা যায়, আমরা সেভাবেই পরিকল্পনা করে রেখেছি। ফলে আশা করছি ভবিষ্যতে আমাদের ব্যবসায় তেমন কোনো সমস্যা হবে না।

আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কাট অফ প্রাইসের ২০ শতাংশ ডিসকাউন্টে শেয়ার ইস্যু করতে যাচ্ছে ওয়ালটন...
কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কথা চিন্তা করে আমরা প্রচলিত ১০ শতাংশের বাইরে আরো ১০ শতাংশ বেশি ডিসকাউন্ট দেয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে অনুমোদন চেয়েছিলাম। তাদের অনুমোদন সাপেক্ষে আমরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ২০ শতাংশ ছাড়ে শেয়ার ইস্যু করছি।

ওয়ালটনের কোন সম্ভাবনার দিকটি বিবেচনায় রেখে বিনিয়োগকারীরা এর শেয়ারে বিনিয়োগ করবে বলে আপনি মনে করেন?
ওয়ালটনের সম্ভাবনা হচ্ছে এর প্রযুক্তি ও কোয়ালিটি। ইউরোপ-আমেরিকার মতোই সর্বাধুনিক ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট রয়েছে আমাদের। আমাদের পণ্যের কোয়ালিটিও উঁচুমানের। যেহেতু আমরা বিদেশে পণ্য রফতানি করছি, তাই কোয়ালিটিতে ন্যূনতম ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। আমরা সব ধরনের প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেশন নিয়েই ব্যবসা করছি। মূলত প্রযুক্তি ও কোয়ালিটির কারণে ক্রেতারা আমাদের পণ্যের ওপর আস্থা রেখেছেন। একইভাবে বিনিয়োগকারীদেরও আমাদের প্রতি আস্থা রাখার জন্য অনুরোধ থাকবে। এটুকু বলতে পারি, আমাদের ওপর আস্থা রাখলে নিরাশ হবেন না। আমরা ভালো রিটার্ন দেব।

পুঁজিবাজার থেকে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
মূলত কমপ্লায়েন্স ও রফতানি বাজারে এগিয়ে থাকার জন্যই আমরা পুঁজিবাজারে আসছি। তাছাড়া আমরা মনে করি, ওয়ালটনের মতো শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের পুঁজিবাজারে আসা প্রয়োজন। এতে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও আইপিওতে আসতে আগ্রহী হবে। আমরা আসার কারণে পুঁজিবাজার চাঙ্গা হবে বলে আশা করছি।

পুঁজিবাজার থেকে ওয়ালটনের শেয়ারের ভ্যালুয়েশন কেমন প্রত্যাশা করছেন?
এটি বেশকিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথমত, আমরা বিনিয়োগকারীদের কেমন রিটার্ন দিলাম সেটি একটি ফ্যাক্টর। তাছাড়া সামনের দিনগুলোয় আমাদের ব্যবসায়িক ও আর্থিক পারফরম্যান্স কেমন যাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিশ্বাস করি আমাদের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং তাদের কাছ থেকে যৌক্তিক ভ্যালুয়েশন পাব।

অর্থনীতিতে করোনার নেতিবাচক প্রভাবে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আপনাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কী?
এটি ঠিক, কভিড-১৯-এর কারণে আগের তুলনায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছে। এ কারণে আমাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সেভাবেই ডিজাইন করতে হয়েছে। আমার বিভিন্ন অফার চালু করেছি, যার মাধ্যমে ক্রেতারা লাভবান হচ্ছেন। তাছাড়া ক্রেতারা যাতে কিস্তিতে সহজেই পণ্য কিনতে পারেন, সেদিকেও জোর দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে আমাদের ডিস্ট্রিবিউটর যারা রয়েছেন, তারাও গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে কিস্তির সময় বাড়ানো বা সহজ করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ওয়ালটনের সুনির্দিষ্ট কোনো পণ্যের চাহিদা কমা কিংবা বাড়ার প্রবণতা ছিল কি?
ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা বাড়া বা কমার ক্ষেত্রে কভিড-১৯ পরিস্থিতির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষ তার প্রয়োজনের কারণেই ইলেকট্রনিকস পণ্য কিনে থাকে। যেমন ঈদুল আজহার সময়ে স্বাভাবিকভাবেই রেফ্রিজারেটরের চাহিদা বেশি থাকে। অবশ্য গত এক মাসে রেফ্রিজারেটরের পাশাপাশি টেলিভিশনেরও ভালো চাহিদা ছিল। কভিড-১৯-এর কারণে আমরা মার্চে ফেস শিল্ড, গগলস ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিনা মূল্যে বিতরণ করেছিলাম। এসব পণ্য বর্তমানে আমরা বাণিজ্যিকভাবেও বিক্রি করছি। আমাদের স্টোরগুলোয় ইলেকট্রনিকস পণ্যের পাশাপাশি এসব ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীও পাওয়া যাচ্ছে।

করোনার কারণে অনেকেই বর্তমানে অনলাইন কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। ক্রেতারাও আগের তুলনায় অনলাইনেই বেশি কেনাকাটা করছেন। ওয়ালটনের অনলাইন ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা ই-কমার্স কেমন চলছে?
কভিড-১৯-এর সুযোগ ও দুর্যোগ দুটোই রয়েছে। এর কারণে অনেকেই ডিজিটাল মাধ্যমে যেতে বাধ্য হয়েছে। কভিড-১৯-এর আগের ও পরের কথা চিন্তা করলে দেখা যায়, আগের তুলনায় বর্তমানে আমাদের অনলাইন প্লাটফর্ম ই-প্লাজার কার্যক্রম ৩০০ গুণ বেড়েছে। এপ্রিল ও মে মাসে স্টোরগুলো বন্ধ ছিল, সে সময় অনলাইনে আমাদের ব্যবসা চালাতে হয়েছে। এমনকি জুনে স্টোর খোলার পরও অনলাইন ও অফলাইন দুই মাধ্যমেই সমানতালে ব্যবসা হচ্ছে।

ওয়ালটনের পণ্য এখন দেশের বাইরেও রফতানি হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে রফতানি বাজারের কী অবস্থা?
গত মাসেই আমরা প্রথমবারের মতো তুরস্কে কম্প্রেসার রফতানির ঘোষণা দিয়েছি। এরই মধ্যে শিপমেন্ট চলে গিয়েছে। আগে আমরা কম্প্রেসারের উপাদান ইউরোপে রফতানি করেছি। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কম্প্রেসার রফতানি এটাই প্রথম। এর মাধ্যমে আমরা ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করেছি। সামনে আরো আট থেকে ১০টি বড় অর্ডার আসতে যাচ্ছে। বিদেশে কম্প্রেসারের বিশাল বাজার রয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কম্প্রেসার উৎপাদনের বিজনেস হাব হতে যাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের অন্যান্য পণ্য বিশ্বের ৩৫টির বেশি দেশে রফতানি হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে ওয়ালটনের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা অনেক বেশি।

আপনারা তো ভেন্টিলেটর উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন?
ওয়ালটন ডিজিটেক ইন্ডাস্ট্রিজ মেট্রোনিকের সঙ্গে যৌথভাবে দেশেই ভেন্টিলেটর উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করছি আগামী সপ্তাহের মধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে ১০০টি ভেন্টিলেটর সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে ওয়ালটনই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা কিনা আইসিইউতে ব্যবহূত ভেন্টিলেটরের মতো স্পর্শকাতর মেডিকেল ডিভাইস দেশেই উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে।

ভেন্টিলেটর কি শুধু দেশেই সরবরাহ করা হবে, নাকি বিদেশেও রফতানির পরিকল্পনা রয়েছে?
এটি আসলে নির্ভর করছে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর। স্থানীয়ভাবে অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কাছ থেকে আমাদের ভেন্টিলেটর নিয়ে বেশ আগ্রহ দেখা গিয়েছে। আমাদের উৎপাদিত ভেন্টিলেটর আমদানীকৃতগুলোর তুলনায় দামেও কম। প্রথম ১০০টি ভেন্টিলেটর পরীক্ষামূলকভাবে সরবরাহ করার পর এগুলোর কার্যকারিতা ও কোনো সমস্যা আছে কিনা সেটি পর্যবেক্ষণ করা হবে। দেশের হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর সরবরাহ করার মতো সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। যদি কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে ভেন্টিলেটরের চাহিদা তৈরি হয়, তাহলে মেট্রোনিক আমাদের মাধ্যমেই ভেন্টিলেটর রফতানি করবে বলে আশা করছি।

ক্রেতাদের কাছে নিত্যনতুন পণ্য পৌঁছে দিতে ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদকদের সবসময় গবেষণা ও উন্নয়নের (আরঅ্যান্ডডি) ওপর জোর দিতে হয়। আরঅ্যান্ডডি খাতে ওয়ালটনের বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে...আমরা সব সময় ক্রিয়েটিভিটি, ইনোভেশন ও টেকনোলজির ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকি। ক্রেতাদের অভিরুচি অনুসারে আমাদের পণ্য তৈরি করতে হয়। আবার অনেক সময় এমন ধরনের পণ্য উদ্ভাবন করতে হয়, যেটি ক্রেতাদের অভিরুচিকেই বদলে দেবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা সব সময় গবেষণা ও উন্নয়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছি। আমাদের বর্তমানে চার শতাধিক প্রকৌশলী রয়েছেন। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও আমাদের গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ থেমে নেই। কভিড-১৯ আসার পর ভেন্টিলেটর নিয়ে কিন্তু আমাদের প্রকৌশলীরা কাজ করেছেন, যার ফলে আমরা বর্তমানে ভেন্টিলেটর উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন