শনিবার | আগস্ট ০৮, ২০২০ | ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর

১২৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাবের ৬০ শতাংশই দেশীয় উদ্যোগ

বদরুল আলম

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজার) আওতায় চট্টগ্রামের মিরসরাইতে ৩০ হাজার একর জমির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। দেশী-বিদেশী মিলিয়ে এখন পর্যন্ত মোট ৬৪টি প্রতিষ্ঠান সেখানে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ হাজার ২৮১ কোটি ডলার। চূড়ান্ত পর্যায়ে জমি ইজারা চুক্তি। তবে বিনিয়োগের ৬০ শতাংশই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো করছে বলে জানিয়েছে বেজা। বাকি ৪০ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে বিনিয়োগ প্রস্তাব দেয়া বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হচ্ছে চীনের ইয়াবাং গ্রুপ। চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৫০০। তাদের পরিচালন আয় ৪৫০ কোটি ডলার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে টেক্সটাইল অন্যান্য রাসায়নিক শিল্প স্থাপনের জন্য বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে এই গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইয়াবাং ইনভেস্টমেন্ট হোল্ডিংস গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড। প্রস্তাবিত এই বিনিয়োগ বাস্তবায়নে ১০০ একর জমি ইজারা চাইছে প্রতিষ্ঠানটি। ওই জমিতে ৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ডাই এবং পেইন্ট, পিগমেন্ট, ফার্মাসিউটিক্যালস, ভেটেরিনারি ড্রাগ, কীটনাশক, ফটোভোলটাইকস পণ্য উৎপাদন করবে চীনা প্রতিষ্ঠানটি, যা  স্থানীয় বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি রফতানিও হবে।

বেজা সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে প্রস্তাবিত ৬৪টি প্রকল্পের মধ্যে বর্তমানে ১০টির কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে ভারতের এশিয়ান পেইন্টস, জাপানের নিপ্পন, চীনের জুজুই জিনইয়ান কেমিক্যাল, দেশীয় উদ্যোগের ম্যাকডোনাল্ড স্টিল বিল্ডিং, বসুন্ধরা কেমিক্যাল, বসুন্ধরা প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড, মডার্ন সিনট্যাক্স, এসকিউ গ্রুপের টেকনো ইলেকট্রিক্যালস ভিকার ইলেকট্রিক্যালস। বর্তমানে এসব প্রকল্প অবকাঠামো উন্নয়ন পর্যায়ে আছে। ন্যূনতম দুই মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে উৎপাদনে আসার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে প্রস্তাবিত সবচেয়ে বড় ১০টি বিনিয়োগ প্রকল্পের মধ্যে প্রথমেই আছে পিএইচপি স্টিল ওয়ার্কস লিমিটেড। ইস্পাত পণ্য উৎপাদনে প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৪০০ কোটি ডলার। দ্বিতীয় বড় প্রকল্প প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠান হলো হ্যাংঝু জিনজিয়াং গ্রুপ কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫২ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। তৃতীয় বৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্পটি রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ১২০ কোটি ডলার।

অন্য বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন লিমিটেড ৪৮ কোটি ডলার, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড ৪০ কোটি, এসিআই লিমিটেড ৩১ কোটি, বেইজিং জেনইউয়ান হেংঘুই ইঞ্জিনিয়ারিং কনসাল্টিং কোম্পানি লিমিটেড ৩০ কোটি, চীনের ইয়াবাং ইনভেস্টমেন্ট হোল্ডিংস গ্রুপ ৩০ কোটি, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ২৬ কোটি এবং অনন্ত অ্যাপারেলস লিমিটেড ২২ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব করেছে।

এছাড়া চিটাগং পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ২১ কোটি ডলার, মেট্রো নিটিং ডায়িং লিমিটেড ২১ কোটি, বিএসআরএম স্টিল মিলস লিমিটেড ১৮ কোটি, যমুনা স্পেকটেক জেভি লিমিটেড ১৩ কোটি, রাকুয়েফ অ্যাপারেলস ওয়াশিং প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড ১১ কোটি ৩৬ লাখ এবং আসওয়াদ কম্পোজিট মিলস লিমিটেড ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে।

চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জমি চিহ্নিতকরণের শুরু থেকে বেজার পক্ষ থেকেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যাপক প্রচারণা দেখা যায়। ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন বিনিয়োগকারীরা। সেই আগ্রহ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াতেই এখন পর্যন্ত ৬৪টি প্রতিষ্ঠান, পোশাক শিল্প মালিক সংগঠন বিজিএমইএ ও বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেপজা) আনুমানিক ৬ হাজার একরের বেশি জমি ইজারার পরিকল্পনা চুড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আরো  হাজার ২৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাবের বিপরীতে জমি ইজারা চুক্তির পাশাপাশি ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে পারলেও অর্থনৈতিক অঞ্চলের যে অগ্রগতি তা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা বলছে, গ্যাস সংযোগের নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও বিদ্যুৎ, পানি সংযোগ নিয়ে এখনো কালক্ষেপণ হয়। আবার অনেক বিনিয়োগকারী বন্দর উন্নয়নের অপেক্ষায় থাকলেও বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। ক্ষেত্রবিশেষে বিনিয়োগকারীরা নিয়ম অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করলেও উন্নয়ন করা জমি বরাদ্দ পাননি এখনো। শুরু থেকে যে ধরনের নীতি সহায়তা নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছিল, সেই নীতিনির্ধারণী বাধা অতিক্রমে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছে না বেজা। সার্বিকভাবে অগ্রগতি ত্বরান্বিত না হলে অচিরেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বেন বলে বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

এই শিল্পনগরে বিনিয়োগ প্রস্তাব দেয়া বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন লিমিটেডের কো-অর্ডিনেটর মো. ফয়জুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর উন্নয়নে অগ্রগতি আছে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা যতটা দ্রুতগতিতে কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছেন বা নিতে চান সেই গতি আর বেজার গতি এক না। গ্যাস, বিদ্যুতের নিশ্চয়তার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বর্তমানে কিছু নীতিসংক্রান্ত সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলো এখনো সমাধান হয়নি। আমাদের বিনিয়োগ প্রকল্পে অবকাঠামো উন্নয়ন পূর্ণ গতিতে চলছে।

একই ধরনের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছে বিএসআরএম গ্রুপও। প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বণিক বার্তাকে বলেন, মিরসরাইয়ে শিল্প পরিচালনার জন্য প্রয়োজনগুলো বা সার্বিক অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিনিয়োগের সফল বাস্তবায়নের জন্য ছয়টি প্রয়োজন মেটাতে হয়। এগুলো হলো জমি, সড়ক, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি বন্দর। এর মধ্যে জমির প্রয়োজন মিটলেও অন্যান্য অবকাঠামোগত প্রয়োজন গড়ে ওঠেনি। ফলে শিল্পের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। অবকাঠামো গড়ে উঠলে দ্রুত বিনিয়োগ অগ্রসর হবে।

এদিকে বেজা সূত্র জানিয়েছে, শিল্পনগরের বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোতে এরই মধ্যে গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগেও সহযোগিতা করছে বেজা। আবার সড়ক উন্নয়নের কাজেও তদারকি চলছে। বিনিয়োগকারীদের সহায়তা হিসেবে সরকারি সংস্থা এবং বেজার অর্থায়নে প্রায় হাজার কোটি টাকার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের মাধ্যমে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের আকর্ষণ করার চেষ্টা অব্যাহত আছে।

বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ অগ্রগতি নিয়ে সংকট উদ্বেগ প্রকাশ করলেও বেজা বলছে, সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী করোনা সংকটের মধ্যেও গতিশীল হয়েছে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কার্যক্রম। বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে হাজার ২৮০ কোটি নয়, আরো ৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। আর ৬৪টি প্রতিষ্ঠান নয়, বিজিএমইএর অর্থনৈতিক অঞ্চল বিবেচনায় নিলে ১২৬টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করবে। বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ দেড় শতাংশের বেশি না। এই করোনার মধ্যেও প্রতিদিনই দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তাব পাচ্ছি।

অনেক বড় বিনিয়োগ প্রকল্পও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে আছে এমন তথ্য উল্লেখ করে পবন চৌধুরী বলেন, শুধু বসুন্ধরারই বিনিয়োগ দেড়শ কোটি ডলার হবে। আমরা গ্যাস-পানি দিয়েছি, এখন বিদ্যুৎ দিচ্ছি। সর্বশেষ যে চীনা কোম্পানির বিনিয়োগ সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হয়েছে সেটি দ্বিতীয় ধাপে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে যাবে। সার্বিকভাবে ভাবলে সম্ভাবনাময় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে এবং চলছে।

পরিকল্পিত শিল্পায়নের লক্ষ্যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ১৫ বছরের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ধারাবাহিকতায় বেজা মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার একর জমিতে একটি শিল্প শহর গড়ে তোলার কাজ হাতে নিয়েছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে মিরসরাই উপজেলায় এর অবস্থান।

বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি আশরাফুল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কাজ চলছে। ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরের উন্নয়নও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। কিন্তু বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য যে ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি বেজার পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিল বিশেষ করে নীতি সহায়তার বিষয়ে, সেই সহায়তা পর্যাপ্ত না। আমরা আশা করি চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় নীতি অবকাঠামো সংকটসহ সব ধরনের সংকট কেটে যাবে এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারব।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন