শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

সাক্ষাৎকার

প্রতিযোগিতা যেন অর্থনীতির ক্ষতির কারণ না হয়

স্যামসন এইচ চৌধুরীর উদ্যোগে ৬২ বছর আগে যাত্রা করে স্কয়ার গ্রুপ। পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে শুরু হলেও পরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় স্কয়ার গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান। তালিকাভুক্ত দুই প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত টার্নওভার বর্তমানে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলমান মহামারী পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক অগ্রগতি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি বণিক বার্তার মুখোমুখি হন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা তপন চৌধুরী সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বদরুল আলম

কভিড-১৯-এর প্রভাব কাটিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন?

পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াটিকে আমি দুইভাবে দেখি। একটি আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে, আরেকটি বৈশ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। আমাদের রফতানি আয়ের বড় খাত হলো পোশাক রফতানি। রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে খাত থেকে। বছরের শুরুতে পোশাক রফতানিতে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা কেটে যাচ্ছে। যে ক্রয়াদেশগুলো স্থগিত হয়েছিল, সেগুলো এরই মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে এসেছে। সবার অবস্থার কথা জানি না, কিন্তু স্কয়ারের কারখানাগুলোয় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হয়ে গেছে। আশার কথা হচ্ছে, বেশকিছু ক্রয়াদেশ এখন চীন থেকে বাংলাদেশে শিফট হচ্ছে। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এখন যে সম্পর্ক, সে সম্পর্কের কারণেও বড় ব্র্যান্ডগুলো চীন সম্পর্কে খুব সচেতনভাবে এগোচ্ছে। রফতানি পণ্যে যারা অধিকতর ভ্যালু অ্যাডিশন করে, আমি মনে করি তারাই ভালো অবস্থানে আছে। কথা এজন্য বললাম, এখন সময় এসেছে রফতানি বাজারে শুধু মূল্য কমানোর প্রতিযোগিতায় না থেকে আমাদের বরং রফতানি পণ্যের গুণগত মান তথা অধিক ভ্যালু অ্যাডিশনের জায়গাগুলোয় নজর দেয়ার। আমরা সব সময় দোষ দিয়েছি আমাদের তৈরি পোশাকের ক্রেতা ব্র্যান্ডগুলো সঠিক মূল্য দিচ্ছে না। কিন্তু বক্তব্যের সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত নই, কারণ আমরাই অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা করে দাম কমিয়ে ফেলেছি। তৈরি পোশাকের যে মূল্য সিএম (কাটিং মেকিং) বাবদ আট বা নয় ডলার করে দিতে চাচ্ছে ক্রেতারা, আমরা নিজেরাই কম্পিটিশন করে সেটা পাঁচ বা ছয় ডলারে নামিয়ে এনেছি। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কাম্য, কিন্তু সেটা যেন বুমেরাং হয়ে আমাদের তথা দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ক্ষতির কারণ না হয়। বাংলাদেশে আগে আমরা কাপড়ের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। সে নির্ভরতা অনেকাংশে কমে গেছে। এরই মধ্যে বেশকিছু মিল তৈরি হয়ে গিয়েছে, যারা ভার্টিকালি ইন্টিগ্রেটেড, যারা সুতা থেকে শুরু করে কাপড় পর্যন্ত তৈরি করে এবং সবশেষে ফিনিশড প্রডাক্ট রেডিমেড গার্মেন্টস তৈরি করে রফতানি করে। এগুলো অনেক ভালো লক্ষণ। আমাদের সক্ষমতাগুলো কিন্তু বাড়ছে। এটাকে আমরা গুছিয়ে নিয়ে কত তাড়াতাড়ি রফতানির মূলধারায় ফিরে আসতে পারব তার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার।

পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় আমাদের খেয়াল রাখতে হচ্ছে কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি। কর্মীদের নিরাপত্তা বলতে নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে কাজ করা, হাত ধোয়ার অভ্যাস করা এবং মাস্ক ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। খুবই সহজ, কিন্তু বাস্তবায়নে সতর্কতার প্রয়োজন। আমাদের দেশের যেসব ফ্যাক্টরিতে এসব পালন করা হচ্ছে, তারা ভালো অবস্থায় রয়েছে। বিষয়গুলোও আমাদের তৈরি পোশাকের ক্রেতারা যথেষ্ট পর্যবেক্ষণ করছে। দিন শেষে ক্রেতারা কোনো ঝুঁকি নিতে চান না এজন্য, বিদেশে তাদের যারা ক্রেতা আছেন, তারা ঝুঁকিপূর্ণ কারখানায় সোর্সিংকে নিরুৎসাহিত করছেন। এটা খুবই স্বাভাবিক। এজন্যই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে হ্যাঁ, সবকিছুরই একটা খরচ আছে।

কর্মীদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তাকে সামনে রেখে সব কারখানা চালু করতে হবে। সংক্রমণের ভয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে বসে থাকাটা বোকামি হবে। কাজের জায়গায় সব কর্মীর জন্য নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব তৈরি করা না গেলে শিফট করে অথবা সাপ্তাহিক পালার মাধ্যমে হলেও সব অফিস-কারখানা চালু করা দরকার। আমাদের বন্দরগুলোর কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করতে হবে।

কৃষির সঙ্গে জড়িত সব কর্মকাণ্ডকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করতে হবে। কৃষক ফসলের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেলে তা সামলে ওঠা কঠিন হবে। করোনার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বন্যার প্রাদুর্ভাব আমাদের কৃষির সফলতার পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলেছে।

করোনা সংক্রমণের শুরুতে যে ধরনের মন্দার কথা অনেকেই অনুমান করছিলেন, সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদে আমরা সেভাবে পর্যুদস্ত হইনি। কিন্তু এর মানে এই নয়, আমাদের সে শঙ্কা কেটে গিয়েছে। এর প্রতিরোধ সম্ভব, যদি আমরা সাবধানতা অবলম্বন করি। ব্যবসার মধ্যে ওঠানামা থাকতেই পারে। সারা পৃথিবী যখন সমস্যা মোকাবেলা করছে তখন এখানে হবে না কেন? সময়টায় ব্যবসায়ে লাভের বিষয়টির চেয়েও আমাদের এখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার বিষয়টিই মুখ্য হয়ে পড়েছে। সে দর্শন থেকেই আমরা কাজটা করছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটবে, আমি বলব এরই মধ্যে ঘটেছেও।

টিকে থাকার জন্য ব্যয় সংকোচন নিয়ে কী ভাবছে স্কয়ার?

অনেকেই মনে করেন ব্যয় সংকোচন হচ্ছে লোকসংখ্যা কমিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা। ব্যাংকিং সেক্টরে লোকসংখ্যা কমানো নিয়ে কথা হচ্ছে। এটা ছিল আমাদের একদম লাস্ট অপশন এবং তা আমাদের করতে হয়নি। আমাদের ৬২ বছরের প্রতিষ্ঠান, আমরা কথাও স্বীকার করি, আজকে আমাদের যে সাফল্য এসেছে বা আমরা যে অবস্থায় পৌঁছেছি, এটা আমাদের দলের বা স্কয়ারের সব কর্মীর অবদান। এটা স্কয়ারের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাহেব, আমার বা বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের একক অর্জন নয়। সম্মিলিত অর্জন স্কয়ারের বৃহত্তর পরিবারের সবার, কারণ তাদের কঠোর পরিশ্রমে আজকে আমরা জায়গায় পৌঁছেছি। ব্যয় সংকোচনে আমরা অনাবশ্যক খরচগুলোর ব্যাপারে সতর্ক হয়েছি। আমাদের যেসব ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ছিল, সেগুলো আবার শুরু হয়েছে। আমরা কিন্তু কোনো কাজ থামিয়ে রাখিনি। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোও এগিয়ে এসেছে। তারা আমাদের সম্পর্কে ভালো জানে। তাদের আস্থাও আছে এবং আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি।

কর্মী কমিয়ে ব্যয় সংকোচন ধরনের কোনো পদক্ষেপ আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে নেয়া হয়নি। ছোটবেলায় সব সময় দেখেছি যখনই পরিবারে একটু টানাটানি হয়, তখন কৃচ্ছ সাধন করতে হয়। ব্যবসা পরিচালনায় এটাই আমরা করছি। আমরা সবাইকে বলেছি ব্যক্তি জীবনেও কৃচ্ছ সাধনের অভ্যাস বজায় রাখতে। প্রথম থেকেই চেষ্টা করেছি যেন আমাদের কর্মীদের কিছুটা সঞ্চয় হয়। আমরা বলেছি তাদের জীবনযাপনে এখন যেন অনাবশ্যক কেনাকাটা থেকে দূরে থাকে এবং সঞ্চিত অর্থের স্থিতি বজায় রাখে। আমাদের যারা কর্মী আছেন, তারাও যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। আমরা বিভিন্নভাবে তাদের সহযোগিতা করছি। যেমন আমাদের অনেক পণ্য আছে, যেগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে তাদের দিয়েছি, সহজলভ্য করেছি।

স্কয়ারের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।

টেক্সটাইলে আমাদের চারটি স্পিনিং মিল আছে। স্পিনিং মিলগুলোর সঙ্গে ফ্যাব্রিকের মিল আছে। কিন্তু আমাদের রেডিমেড ওভেন গার্মেন্টসের কোনো ইউনিট ছিল না। সেই ওভেন গার্মেন্টসের কাজটা বেশ বড়ভাবে শুরু হয়েছে। আগে আমরা ছিলাম ক্রেতাদের মনোনীত ফ্যাব্রিক সরবরাহকারী। এখন আমরা ওভেন গার্মেন্টসও করব। সম্প্রসারণের উদ্দীপনাটা কিন্তু বিদেশী পোশাক ক্রেতাদের কাছ থেকেই। পৃথিবীর বিখ্যাত পোশাকের ব্র্যান্ডগুলোই বলছে তুমি আমাদের ব্র্যান্ডের জন্য ফ্যাব্রিক বিক্রি করছ, আর যেহেতু তোমাদের ওপর আমাদের আস্থা আছে; তাই এখন ফিনিশড প্রডাক্টটাও আমরা তোমাদের কাছ থেকে চাই। একইভাবে আগে আমরা ডেনিমের ফ্যাব্রিকটা বিক্রি করতাম, এরপর আমরা ছোট একটা ফ্যাক্টরি করেছিলাম। কিন্তু এখন আমরা বড় পরিসরেই ডেনিম গার্মেন্টসের জন্য একটা ফ্যাক্টরি করছি।

ফার্মাসিউটিক্যালেও আমাদের নতুন প্রজেক্ট আসছে। উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারণের কাজ চলছে। পাবনায় যেখান থেকে আমাদের যাত্রা শুরু, সেখানে স্কয়ার লাইফসায়েন্স বলে একটা বড় প্ল্যান্ট হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে। কভিড-১৯-এর সময়েও সেখানে সাবধানতা মেনে পূর্ণোদ্যমে কাজ চলছে। ঢাকা ইউনিটে কালিয়াকৈরে যে প্ল্যান্ট আছে, সেখানেও নতুন সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়েছে। টয়লেট্রিজেরও কিছু কারখানা সম্প্রসারণের কাজ আগে থেকেই চলছিল। সেগুলোও বন্ধ হয়নি। স্কয়ারের সব কার্যক্রমই চলছে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে সামনে রেখে।

৬২ বছরের পুরনো ব্যবসা। ব্যবসা পরিচালনা দেখেছেন দুই প্রজন্ম ধরে। পুরো অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল? ধারাবাহিকভাবে সফলতা ধরে রাখার পেছনের কৌশল কী?

আমার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার বাবার সঙ্গে কাজ করার। শুরুটা ছিল ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এরপর আমরা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হই। অনেকে অনেক কথা বলেন তালিকাভুক্ত কোম্পানি সম্পর্কে। আমরা কিন্তু তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গর্বিত সুফলভোগী। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ফলে আমাদের জবাবদিহিতা অনেক বেড়ে গেছে। কারণ আগে ছিল আমাদের পারিবারিক ব্যবসা। এটা থেকে ভালো করলে খুশি আর ভালো না হলে পারিবারিক সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে। অন্য কারো কাছে জবাবদিহিতা ছিল না। এখন কিন্তু তালিকাভুক্তির পরে প্রত্যেক মুহূর্তে চিন্তা করতে হয় দায়বদ্ধতার বিষয়টি। কারো কাছে যদি কোম্পানির একটা শেয়ারও থাকে, তার কাছেও আমাদের সমান জবাবদিহি করতে হয়। আমার বাবা সব সময়ই বলতেন, দেখো আমরা যে পর্যায়ে এসেছি, এর পেছনে দেশের মানুষের অনেক অবদান আছে। তারা তোমাকে বিশ্বাস করে। দেশের ডক্টরস কমিউনিটি বা চিকিৎসক সমাজ আমাদের বিশ্বাস করে। জবাবদিহি করার সৎ সাহসের জন্যই আমাদের শেয়ারহোল্ডার, পণ্যের ক্রেতা, চিকিৎসক দেশের মানুষ আমাদের ওপর আস্থা রাখে। আর এটাই আমাদের ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখার সূত্র।

শেয়ারবাজার থেকে সংগৃহীত মূলধন থেকেই কিন্তু ব্যবসার ব্যাপ্তিটা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে ৯০ কোটি টাকা, যেটা শেয়ার মার্কেট থেকে সংগ্রহ করি, তার মধ্যে ৫০ কোটি টাকা দিয়ে আমাদের নতুন ফার্মাসিউটিক্যাল প্ল্যান্টের কাজ শুরু করি। আর বাকি ৪০ কোটি টাকা দিয়ে স্পিনিংয়ের কাজ শুরু করলাম। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন এক একটি ব্যবসায়ী ইউনিট কয়েক হাজার কোটি টাকার, ফার্মাসিউটিক্যালস টেক্সটাইল দুটোই। ব্যবসাগুলো কিন্তু চালায় সব প্রফেশনালস বা পেশাদাররা, তারা কিন্তু কোনো অংশেই মালিক থেকে কম নন। পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়েই চালান। এটা আমি গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, আমাদের সবগুলো প্রতিষ্ঠানই, পেশাদারদের দিয়ে পরিচালিত। আক্ষরিক অর্থে হয়তো তারা কোম্পানির মালিক নন, কিন্তু দায়িত্ববোধ ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা অনেকাংশেই মালিকদের চেয়েও বেশি। আমি তাদের নিয়ে প্রচণ্ডভাবে গর্বিত। আমি আনন্দিত যে বাংলাদেশে এই পেশাদারিত্বটা এসেছে। এটা অভূতপূর্ব, আমাদের দেশে পেশাদারদের একটা শ্রেণী দাঁড়িয়ে গেছে। অভিজ্ঞ পেশাদাররা সাফল্যের সঙ্গে দেশের সব শিল্প খাত পরিচালনা করে যাচ্ছেন। এটা খুবই ভালো লক্ষণ। এবং এজন্যই আমরা জানি, আমাদের পরেও প্রতিষ্ঠানগুলো সব টিকে থাকবে এসব প্রফেশনালের জন্য।

ব্যবসার শুরুটা পারিবারিক। এখনো পারিবারিক বলেই স্বীকৃত। পারিবারিক ব্যবসায় সফলতার চাবিকাঠি কী?

আমার কিন্তু প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু হয়েছিল শিক্ষানবিশ হিসেবে, আমার বাবার সঙ্গে। ছাত্র অবস্থায় আমি প্যাকেজিং লাইনেও কাজ করেছি। আমি খুব এনজয়ও করতাম। কারখানার ভেতরে অনেক কিছু দেখতাম, কীভাবে ওষুধ তৈরি করে, কীভাবে ওখানে কেমিস্টরা কাজ করছেন, ট্যাবলেট, লিকুইড প্রডাক্ট কীভাবে তৈরি হচ্ছে। সেই পুরনো সব মানুষের নাম আমার এখনো মনে আছে। ওখানে প্রায় সবাই চাচা। তাদের কাছ থেকে শিখেছি আমি। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জনসন অ্যান্ড জনসনের সঙ্গে তাদের ছয়টি ওষুধ স্কয়ারের পাবনার কারখানায় উৎপাদনের বিষয়ে চুক্তি হলো। আমার মনে আছে ট্যাবলেট তৈরি করতেন জয়নাল চাচা বলে একজন। তিনি মেট্রিক পাস ছিলেন। কিন্তু জনসন অ্যান্ড জনসন থেকে লোক এসে ওনাকে প্রশিক্ষিত করেছিল। তারাও খুশি ছিলেন, একটা মানুষ কতটা দ্রুত শিখেছেন। ওই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা আমরা। একদিনে এটা হয় না। এরপর আমি আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিই মার্কেটিংয়ে। আমাকে সারা বাংলাদেশে ঘুরে ঘুরে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। প্রচুর চিকিৎসককে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। অনেক কেমিস্ট শপের মালিকের সঙ্গে জানাশোনা ছিল। আমার মনে আছে, একবার আমি একটা কেমিস্ট শপে গিয়েছিলাম, আমাকে বের করে দিল। কোনো কথাই বলতে রাজি না। কারণ কী? ওনার দোকানে সাপ্লাই ঠিকমতো হয়নি। ওই সময় একটা প্রডাক্টের সাপ্লাই শর্ট ছিল, তাই একটু বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল। তো আমরা ওনাকে সাপ্লাই দিতে পারিনি বলে ওনার লোকসান হয়ে গিয়েছিল। আমার সঙ্গের সহকর্মীরা তখন খুব বিব্রত হচ্ছিল। আমি ওনাকে বললাম, ‘ভাই, বুঝলাম ঠিক আছে আপনি রাগ করেছেন। তো আপনি এক কাপ চা তো খাওয়াবেন!’ কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে ওনার মন গলে গেল। স্যার স্যার বলে বসালেন, চা খাওয়ালেন। তার তো রাগ করার যথেষ্ট কারণ আছে। আমি যতই কোম্পানির মালিক হই আর যাই হই, তার ব্যবসায় একটা লোকসান হয়েছে, যেহেতু ঠিকমতো ওই সময়ে আমরা সরবরাহ দিতে পারিনি। ধরনের অনেক বিচিত্র অভিজ্ঞতা আছে। পারিবারিক ব্যবসার সফলতার পেছনে রয়েছে নিজের অহমিকা ভুলে দলের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করা। আর যে বিষয়টা আমি জানি না, সেটা পরিবারের বা দলের কারো কাছ থেকে বিনা সংকোচে শিখে নেয়ার মতো মনমানসিকতা ছিল আমার।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ব্যবসা টিকিয়ে রেখে এগিয়ে নিতে অতিরিক্ত কোনো কৌশল আয়ত্তে আনতে হয় কি?

প্রথমত হচ্ছে উত্তরসূরিদের প্রস্তুতি। আমাদের খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে, যারা উত্তরসূরি থাকবে তারা নিজেরা কতটা প্রস্তুত হয়েছে ব্যবসার দায়িত্ব নেয়ার জন্য। তাদের লেখাপড়া, তাদের প্রশিক্ষণ পূর্বসূরিদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।

তাদের প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ। অর্গানাইজেশনাল কালচার বা প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা বোঝা। আমি দেখেছি অনেকের সন্তান এসে প্রথমেই সরাসরি ম্যানেজমেন্টে বসছে। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা হলো তাদের আগে ব্যবসা পরিচালনার খুঁটিনাটি শিখতে হবে একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকে। শিখে নিলে তখন কিন্তু অপারেশনটা বুঝতে অনেক বেশি সুবিধা হবে।

প্রতিটি কোম্পানিতে অভিজ্ঞ লোকজন যারা আছেন তাদের সঙ্গে সম্পর্কটা হবে গুরু-শিষ্যের। আমার বাবা বলতেন কারখানার পুরনো কর্মীদের অবদানকে সব সময় মনে রাখতে। পরবর্তী সময়ে যত বয়স বেড়েছে, পুরনো কর্মীদের সঙ্গে কাজ করে আমার অভিজ্ঞতা বেড়েছে। আমি নিজেই উপলব্ধি করেছি মানুষগুলোর অবদান আর অভিজ্ঞতাকে। আমি অনেক কিছু শিখেছি ওনাদের কাছ থেকে। সবকিছু বুঝে নিয়ে এক দল হয়ে কাজ করতে পারলেই ব্যবসার প্রগতি ধরে রাখা যাবে।

স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তনের কাজ কোন ক্ষেত্র থেকে শুরু করা উচিত?

স্বাস্থ্য খাতে সরকার যে পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর বরাদ্দ করে, অনেকক্ষেত্রেই তার কোনো জবাবদিহিতা থাকে না। এটা খুব দুঃখজনক। তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের প্রস্তুতি বা সাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণের কোনো ঘাটতি নেই। তবু গ্রামের মানুষকে প্রায়ই চিকিৎসার প্রয়োজনে ঢাকামুখী হতে হয়। স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দের পর উন্নয়নটাকে স্থায়ী করতে হলে অন্তত সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে একটা কথা হচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সময় কোনো ক্ষমতার অপব্যবহার যেন না করা হয়।

পুঁজিবাজারকে আরো কার্যকর করার ক্ষেত্রে কী ভূমিকা নেয়া উচিত?

আমি কথাটা বহু আগে থেকে বলে আসছি আমরা যেন বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে পারি। আগে ৫০ কোটি টাকার ওপর মূলধন হলে পুঁজিবাজারে আসতে হয় ধরনের একটা বাধ্যবাধকতা ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কয়েকদিন আগেই বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে, আমি জানি না এটা কেন? কিন্তু যখন ছিল, তখন ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়নি। আমাদের মতো একটা দেশে ব্যাংকের ওপর চাপ কমানোর জন্য এটা প্রয়োজন। ভালো কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ার কোনো কারণই আমি দেখি না। আর যারা পুঁজিবাজারে নিয়মিত বিনিয়োগ করেন, তারা যাতে কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো বিনিয়োগের আগেই ভালোভাবে দেখে নেন।

ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অতিক্রান্ত পথ কেমন কেটেছে?

আমি এভাবে বলব, অনেক লম্বা সময় পাড়ি দিয়েছি। বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যে সময় কেটেছে। কাল যদি আমি না থাকি, আমার কোনো আফসোস থাকবে না। কারণ আমি গর্ব করি, এমন একটি দেশে আমার জন্ম হয়েছে। ছেলেমেয়েদেরও সব সময় নিয়ে উৎসাহ দিয়েছি, অনেক কিছু হতে পারে, কিন্তু দিনশেষে দেশটা আমাদের। আমরা সৌভাগ্যবান, দেশ আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। তাই দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য আছে এবং তা আমাদের টিকে থাকার প্রয়োজনেই। দেশ আমাদের যা দিয়েছে, তা আমাদের ফেরত দিতে হবে।

ব্যাংকিং খাত নিয়ে আপনার পর্যালোচনা কেমন?

ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে যা করা হয়েছে, তার অনেক বিষয়ে আমি একমত নই। ব্যাংকিং খাতে আমূল পরিবর্তন দরকার। আরো স্বচ্ছতার সঙ্গে খাতটি পরিচালিত হলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।

ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশল কেমন হওয়া প্রয়োজন?

এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। আমি বলব যারা দেশ চালান, বিষয়টি তারাই ভালো বলতে পারবেন। সাধারণ জ্ঞানে আমরা যেটা বুঝি, দেশের জন্য যে জিনিসটা মঙ্গলজনক সেটা করতে হবে। কোনো বিশেষ দেশের প্রতি আমাদের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কোনোভাবেই ভালো না। সেটা যেকোনো দেশই হোক না কেন। একটা ব্যালান্স করতে হবে। যারা নীতিনির্ধারক আছেন, তারা নিশ্চয়ই এটা চিন্তাভাবনা করবেন। একটা বড় বিষয় হলো দিনশেষে ওই জায়গায় গিয়েই ঠেকতে হয়, আমরা কোন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখছি। পদক্ষেপে একটু ভুল হলেই কিন্তু প্রচণ্ড ক্ষতি হতে পারে। সে দিকটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সবার সঙ্গে। কিন্তু কারো সঙ্গে বেশি ঘেঁষে যাওয়া মারাত্মক বিষয় হবে। ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট সতর্ক থাকার প্রয়োজন আছে। আমাদের দেখতে হবে, আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কোনটা আমাদের মানুষ অর্থনীতির জন্য সফলতা বয়ে আনবে। বিদেশে আমাদের শ্রমবাজার যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। টেক্সটাইল সেক্টরে আমাদের সম্ভাবনা প্রচুর। এটাকে আমাদের মাথায় রেখে এগোতে হবে। এমন কিছু যেন না হয়, আমাদের পণ্য বা সেবার ক্রেতাদের বিশ্বাসের জায়গায় কোনো দাগ পড়ে। তাদের আস্থার জায়গাটায় যাতে ঘাটতি না হয়।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশকে কেমন দেখছেন?

এটা খুবই দুঃখজনক, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যবসায়ী শব্দটা খুব একটা সম্মানজনক না। আমাদের সাধারণ মানুষের মনের ধারণার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সবাই আরেকটু সহনশীল হলে এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকলে ব্যবসায়ী হিসেবে বিনিয়োগে উৎসাহী হওয়া যায়। মনে রাখতে হবে দেশে ব্যবসায় বিনিয়োগ মানেই নতুন কর্মসংস্থান অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। আমার বিশ্বাস ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যারা আসছে, তারা যাতে আমার দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথাটা বুকের মধ্যে গেঁথে নেয়। স্কয়ার প্রতি বছরই দেশে নতুন বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে এবং এটা নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশকে ইঙ্গিত করে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন