শনিবার | আগস্ট ০৮, ২০২০ | ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতি

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কোনো কৌশলই কাজ করছে না

হাছান আদনান

কভিড-১৯ মহামারীর ক্ষত থেকে উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দিতে প্রায় লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। প্রণোদনা প্যাকেজের বড় অংশই ঋণ হিসেবে বিতরণ করার কথা ব্যাংকগুলোর। এতে বাড়ার কথা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র দশমিক ৬১ শতাংশ। অথচ সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ১৪ দশমিক শতাংশ। অর্থবছরের শেষ তিন মাসে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হয়েছে।

বেসরকারি খাতে ঋণের জন্য যখন হাহাকার, ঠিক তখন নতুন অর্থবছরের মুদ্রানীতি তৈরির কাজ প্রায় সমাপ্ত করে এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে চলতি সপ্তাহেই। তবে এখনো তারিখ নির্ধারণ করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রানীতি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, সব কাজ শেষ করে আনলেও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এখনো সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি। অর্থনীতির সব সংকট চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনা করে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।

প্রায় দুই বছর ধরে ঋণের অভাবে ধুঁকছিল বেসরকারি খাত। তার মধ্যেই অর্থনীতিতে আছড়ে পড়েছে করোনাভাইরাসের ঢেউ। ফলে বিদায়ী অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গিয়ে ঠেকে ইতিহাসের সর্বনিম্নে। অবস্থায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা।

তারা বলছেন, প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে যাবেন না। উল্টো বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সবকিছু সংকুচিত করে আনছেন তারা। অবস্থায় প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন হলেও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি শতাংশের বেশি অর্জিত হবে না। এজন্য উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে লাভ নেই।

দেশের ব্যাংকিং খাতে মুহূর্তে নগদ তারল্যের জোয়ার বইছে। গতকাল পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য তারল্য ছিল লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য জমা হয়েছে। জুনে ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ, বিপরীতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দশমিক ৬১ শতাংশে নেমেছে।

অবস্থায় অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর  বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, অর্থনীতির স্বার্থে গত চার মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে ঋণ-আমানতের অনুপাত (এডিআর) বাড়ানো, রেপোর সুদহার কমানোসিআরআর এসএলআর সংরক্ষণে ছাড় দিয়েছে। মুহূর্তে ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত তারল্যও রয়েছে। তার পরও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি না বাড়া স্বাভাবিক নয়।

সিরাজুল ইসলাম জানান, করোনাভাইরাস সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধারের কর্মসূচি হিসেবেই ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে। মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে জোর দেয়া হবে। এখনো মুদ্রানীতি ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। তবে চলতি সপ্তাহেই এটি ঘোষণা করার প্রস্তুতি চলছে।

বিদায়ী অর্থবছরের শুরু থেকেই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে ছিল ভাটার টান। সময় যতই গড়িয়েছে, ঋণ প্রবৃদ্ধি ততই কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ঋণ নেয়ায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। অথচ বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমেছে দশমিক ৬১ শতাংশে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদায়ী অর্থবছরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।

গত তিন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় হয়েছে। এর মধ্যে জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির বিদ্যমান খরা সহসা কাটার সম্ভাবনা দেখছেন না অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস খান। তিনি বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তা কতদিনে বাস্তবায়ন হবে নির্দিষ্ট নয়। তবে প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তারা নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করবেন না। বছর তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন। ফলে চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে, এমন কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না।

বিপুল তারল্য হাতে থাকলেও উদ্যোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দেয়া হচ্ছে না বলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে ব্যাংকগুলো চাচ্ছে সরকারকে ঋণ দিতে। এজন্য নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ব্যাংকগুলো সরকারের বিল-বন্ডকেই বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি ট্রেজারি-বিল বন্ডের টেন্ডার নিলাম ডাকলে সেখানে দ্বিগুণ-তিন গুণ টাকা নিয়ে বিড করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। চলতি অর্থবছরের প্রথম ২৩ দিনেই সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

সরকারকে ঋণ দিতে যতটা উদগ্রীব প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ততটাই নিরুৎসাহী ব্যাংকগুলো। এখন পর্যন্ত বৃহৎ শিল্প সেবা খাতের জন্য ঘোষিত ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে অর্থছাড় হয়েছে মাত্র সাড়ে হাজার কোটি টাকা। আর সিএসএমই খাতের জন্য ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ থেকে মাত্র আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড় দিয়েছে ব্যাংকগুলো।

প্রতি বছরই মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে তফসিলি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীসহ দেশের আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য আনুষ্ঠানিক সভাও আয়োজন করা হয়। কিন্তু এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে কোনো বৈঠক আয়োজন করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ভার্চুয়ালি মতামত নিয়েছে, এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।

মুদ্রানীতি বিষয়ে কোনো মতামত নেয়া হয়নি বলে জানান এনআরবি ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মেহমুদ হোসেন, যিনি ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) ভাইস চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্ব পালন করছেন। মেহমুদ হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মুদ্রানীতি প্রণয়নে আনুষ্ঠানিক মতামত দেয়ার সুযোগ ছিল না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ভার্চুয়ালি কোনো মতামত নেয়া হয়েছে এমনটিও আমার জানা নেই। করোনা পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপো রেটসহ বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী বিষয়ে ছাড় দিয়েছে। তার পরও আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপোর সুদহার আরো একটু কমাবে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোটি চ্যালেঞ্জের। সবার সম্মিলিত উদ্যোগে চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন