শনিবার | আগস্ট ০৮, ২০২০ | ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

সুকুকের অগ্রগতি নিয়ে হতাশ ইসলামী ধারার ব্যাংক

হাছান আদনান

ইসলামিক বন্ড বা সুকুক ব্যবহার করে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে সৌদি আরব মালয়েশিয়া। দেশ দুটির বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা রাখছে ইসলামিক বন্ড। অন্তত এক ডজন মুসলিমপ্রধান দেশের পুঁজিবাজারের পাশাপাশি মুদ্রাবাজারেও তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে সুকুক। মুসলিম বিশ্বের গণ্ডি পেরিয়ে সুকুক ছড়িয়ে পড়ছে ইউরোপ-আমেরিকায়। চালু হয়েছে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জেও। অন্যদিকে এখনো বন্ডের ব্যবহারে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।

পরিসংখ্যান বলছে, সুকুকের বৈশ্বিক বাজার এখন প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বহুজাতিক অ্যাকাউন্টিং ফার্ম আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়াংয়ের পূর্বাভাস বলছে, আগামী পাঁচ বছরে সুকুকের বৈশ্বিক চাহিদা ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। বৈশ্বিক চাহিদার ঊর্ধ্বগতি বজায় থাকবে বাংলাদেশেও। দেশে সুকুক নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর হলে পাঁচ বছরের মধ্যে এর বাজার ব্যাপ্তি দাঁড়াবে অন্তত লাখ কোটি টাকায়।

এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও ইসলামী বন্ডটি কার্যকরের দায়িত্বে নিয়োজিত বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কার্যক্রম এগোচ্ছে শম্বুকগতিতে। বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন দেশের ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা। তারা বলছেন, ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর হাতে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার অলস অর্থ পড়ে আছে। অর্থ থেকে বার্ষিক মুনাফা হচ্ছে দেড় থেকে শতাংশ। অন্যদিকে একই বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী সাধারণ ধারার ব্যাংকগুলো - শতাংশ সুদের সরকারি বিল-বন্ডে অতিরিক্ত তারল্য খাটানোর সুযোগ পাচ্ছে। অলস অর্থের যথাযথ ব্যবহার করতে না পারায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষতি দিন দিন বাড়ছে।

তবে হতাশার মধ্যেও আশার কথা জানাচ্ছে বিএসইসি বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কর্মকর্তারা বলছেন, সুকুককে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা সাজিয়েছে নতুন কমিশন। শিগগিরই ইসলামী বন্ডের কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, মুদ্রাবাজারে সুকুকের ব্যবহার শুরু করতে একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সেটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে দুই মাসের মধ্যেই দেশের মুদ্রাবাজারে সুকুক বাস্তবায়ন হবে।

আধুনিক সুকুকের ব্যবহারের সময় কম হলেও এর ইতিহাস আসলে অনেক পুরনো। সপ্তম শতাব্দীতে সিরিয়ার দামেস্ক নগরীতে সুকুকের প্রথম প্রচলন হয়। সুকুক আরবিসককশব্দের বহুবচন। আরবি অভিধানে কোনো সিলমোহরযুক্ত দলিলের মাধ্যমে কাউকে অধিকার দায়িত্ব অর্পণ করার ক্ষেত্রে শব্দটির ব্যবহার রয়েছে। আবার লিখিত কাগজপত্র, অর্থনৈতিক চুক্তিপত্র, সম্পদের সনদ, নথি ইত্যাদি বোঝানোর ক্ষেত্রেও শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। কোনো সম্পদ সেবার মালিকানায় অথবা নির্দিষ্ট প্রকল্পের সম্পদে বা বিশেষ বিনিয়োগের অবিভাজ্য শেয়ারের প্রতিনিধিত্বকারী সমমূল্যের কোনো সার্টিফিকেটকে সুকুক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সুকুক কেনার মাধ্যমে ভূমি, ভবন, কারখানা বা অন্য কোনো সম্পদের আংশিক মালিকানা এবং ওই সম্পদ থেকে অর্জিত মুনাফার অংশ লাভ করা যায়।

বর্তমানে বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের সুকুক প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মুদারাবা (মুনাফায় অংশীদারি) সুকুক, মুশারাকা (লাভ-লোকসান ভাগাভাগি) সুকুক, মুরাবাহা (লাভে বিক্রি) সুকুক, ইস্তিসনা (পণ্য তৈরি) সুকুক, সালাম (অগ্রিম ক্রয়) সুকুক, ইজারা (ভাড়া) সুকুক, মুযারা সুকুক, মুসাকাত সুকুক, প্রাইভেট সুকুক, মানবকল্যাণ সুকুক, করজ হাসানা (উত্তম ঋণ) সুকুক। আবার ইস্তিসনা, মুরাবাহা ইজারার সমন্বয়ে হাইব্রিড ধরনের কিছু সুকুকের ব্যবহারও বিশ্বে প্রচলিত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের তারল্য বাড়ানো, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্প সম্প্রসারণ বা কোনো বৃহৎ প্রকল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে মুশারাকা, মুদারাবা, ইস্তিসনা, সালাম ইজারা সুকুকের ব্যবহার বেশি। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ইজারা সুকুকের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের অনেক বৃহৎ অর্থনীতির দেশে সুকুক চালু হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসির মতো বহুজাতিক ব্যাংকও যুক্ত হয়েছে সুকুকের সঙ্গে।

দেশে সুকুক চালুর কার্যক্রমে জোর পায় প্রায় এক যুগ আগে। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে পুঁজিবাজারে সুকুক ব্যবহারে নীতিমালা তৈরি করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০১৯ সালের ২২ মে ওই নীতিমালা গ্যাজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। নীতিমালা জারির পর পরই ১০০ কোটি টাকার সুকুক ছাড়তে বিএসইসিতে আবেদন জানিয়েছিল শিল্প গ্রুপ প্রাণ-আরএফএল। যদিও সুকুকের নীতিবিরুদ্ধ উপাদান থাকায় সে আবেদন খারিজ করে দিয়েছে বিএসইসি। সম্প্রতি বিএসইসির কাছে বড় অংকের সুকুক বাজারে ছাড়ার মৌখিক প্রস্তাব দিয়েছে করপোরেট জায়ান্ট এসিআই। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এসিআইয়ের মাধ্যমেই দেশের পুঁজিবাজারে প্রচলন হবে সুকুকের।

সুকুক নিয়ে কাজ করছেন বিএসইসির এমন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রাণ-আরএফএল পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে সুকুকের আবেদন জানিয়েছিল। এটি সুকুকের নীতিবিরুদ্ধ। আরো কিছু শর্তের ঘাটতি থাকায় প্রাণ-আরএফএলের আবেদনটি ফেরত দেয়া হয়েছে। এখন তারা শর্ত পূরণ করে নতুন আবেদন করলে, সেটি বিবেচনা করা হবে। সম্প্রতি এসিআই গ্রুপের পক্ষ থেকে সুকুক চালু নিয়ে আলোচনার জন্য বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সঙ্গে দেখা করা হয়। সবকিছু ঠিকঠাক এগোলে এসিআইয়ের বড় অংকের সুকুক বাজারে আসবে।

সুকুককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর করতে বিএসইসির নতুন কমিশন বদ্ধপরিকর বলে জানান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সুকুকে বিনিয়োগ করতে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান উন্মুখ হয়ে আছে। এরই মধ্যে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা জানিয়েছেন। দেশের অভ্যন্তরেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর জনপ্রিয়তা দিনদিন বাড়ছে। খাতে ব্যাংকের সংখ্যা পরিসরও দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সব মিলিয়ে সুকুক কার্যকর হলে দেশের পুঁজিবাজার শক্তিশালী হবে। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ করার ক্ষেত্র বাড়বে। ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকটেরও সমাধান হবে।

দেশে ইসলামী ব্যাংকিং সেবার জনপ্রিয়তা পরিধি বাড়লেও খাতের সেবায় বৈচিত্র্য বাড়ছে না। মুদ্রাবাজারে সুকুকের কার্যক্রম শুরু হলে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো উপকৃত হবে বলে জানান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের শীর্ষ নির্বাহী মো. মাহবুব-উল-আলম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সুকুক পুঁজিবাজারের পাশাপাশি মুদ্রাবাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বহু আগে থেকেই সুকুক প্রবর্তনের দাবি জানানো হচ্ছিল। এটি কার্যকর হলে ব্যাংক, গ্রাহক সরকার সবাই উপকৃত হবে।

দেশে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর হাতে মুহূর্তে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য জমা আছে। এসএলআর সংরক্ষণের পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা থাকা অতিরিক্ত অর্থ থেকে শতাংশের বেশি মুনাফা পাচ্ছে না ইসলামী ব্যাংকগুলো। আবার সরকারি বিল-বন্ডের সুদহার সুনির্দিষ্ট হওয়ায় খাতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ করার সুযোগ নেই। ফলে অতিরিক্ত তারল্য নিয়ে ইসলামী ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের হাতে প্রায় হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য আছে। সাধারণ ধারার ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত তারল্য দিয়ে সরকারের বিল-বন্ড কিনছে, যার সুদহার শতাংশেরও বেশি। আর ইসলামী ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা থাকা অতিরিক্ত তারল্য থেকে শতাংশের বেশি মুনাফা করতে পারছে না। এতে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুকুক প্রবর্তন হলে সরকার চাইলেই তার মেগা প্রকল্পের জন্য ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ নিতে পারে।

দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকেও বারবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সুকুক কার্যকর করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বাজারে সুকুক নিয়ে আসতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রায় দুই বছর আগে প্রস্তাব দিয়েছিল ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) ব্যাংকটির প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠিও দিয়েছিলেন। নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করার আগ্রহ দেখিয়েছিল বহুজাতিক সংস্থাটি। তার পরও সুকুক নিয়ে ধীরালয়ে পথ এগিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

পুঁজিবাজারে সুকুকের নীতিমালা প্রণয়নের সঙ্গে শুরু থেকেই কাজ করেছেন ইসলামিক ব্যাংকস কনসালটেটিভ ফোরামের (আইবিসিএফ) ভাইস চেয়ারম্যান একেএম নুরুল ফজল বুলবুল। দেশের মুদ্রা পুঁজিবাজারে সুকুক প্রবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় পুঁজিবাজারের জন্য সুকুকের নীতিমালা জারি হয়েছে। কিন্তু এখনো বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রাবাজারে সুকুকের প্রবর্তনের জন্য ধীর নীতি নিয়ে চলছে। এতে দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পুঁজিবাজার মুদ্রাবাজারে সমান্তরালে সুকুক কার্যকর করা সম্ভব হলে প্রথম বছরেই এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হবে। পাঁচ বছরে বিনিয়োগ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে বাধ্য। 

তবে মুহূর্তে মুদ্রাবাজারে সুকুক নিয়ে আসতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তত্পর বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেবট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক খুরশিদ আলম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভাগটিই বর্তমানে মুদ্রাবাজারে সুকুকের ব্যবহারবিধি তৈরিতে কাজ করছে। বণিক বার্তাকে খুরশিদ আলম বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল বছরের জুনের মধ্যেই সুকুকের গাইডলাইন জারি করার। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের কারণে কাজে কিছুটা বিঘ্ন হয়েছে। আজই (গতকাল) আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করে সুকুক নিয়ে আলোচনা করেছি। এরই মধ্যে সুকুকের খসড়া নীতিমালা তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সেটি চূড়ান্ত করা হলে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে গাইডলাইন জারি করব।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, সুকুকের গাইডলাইন তৈরিতে কেন বিলম্ব হচ্ছে, তা আমার জানা নেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটি হওয়া দরকার। এতে অর্থনীতির উপকার হবে। সরকার সুকুক ব্যবহার করে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন