সোমবার | সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ | ১৩ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আইপিওর পরে ব্যবসার অধোগতি

তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অর্থাৎ আইপিওতে আসার পর কিছু কোম্পানির আর্থিক অবস্থার হঠাৎ পতন তাদের শেয়ারমূল্যের পতনে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে ধসের পর গত নয় বছরে পুঁজিবাজার থেকে ৯২টি কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে নয়টি কোম্পানি রয়েছে, যেগুলো বাজার থেকে ৪৯৯ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করেও ব্যবসায়িক অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি। উল্টো পুঁজিবাজারের সবচেয়ে মন্দ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। গত বছরে পুঁজিবাজারে যেসব কোম্পানি অভিহিত মূল্য প্রিমিয়ামে তালিকাভুক্ত হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই অতিরিক্ত মূল্যে তালিকাভুক্ত হয়েছে। অভিহিত মূল্যে আসা কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির আগে পরিশোধিত মূলধন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এতে অনেক কোম্পানিই অভিহিত মূল্যের নামে অতিমূল্যায়িত হয়ে পুঁজিবাজারে এসেছে। ওইসব কোম্পানির অভিহিত মূল্যে আসার যোগ্যতাও ছিল না। আবার প্রিমিয়ামে কোনো কোনো কোম্পানি এসেছে, যারা সর্বোচ্চ ১০ টাকা প্রিমিয়াম পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু তাদের ৩০ টাকা দেয়া হয়েছে। এভাবেই অধিকাংশ কোম্পানি অতিমূল্যায়িত হয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছে। অথচ গত বছরে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই তালিকাভুক্ত সময়কালীন যে আয় দেখিয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে ধরে রাখতে পারেনি। ফলে শেয়ারদর কমে গেছে, বিনিয়োগকারীরা এসব শেয়ার কিনে সর্বস্বান্ত হয়ে বাজার ছেড়ে চলে গেছেন। বাজারের বর্তমান দুরবস্থার জন্য এগুলো কম দায়ী নয়।

যেহেতু কোম্পানির ম্যানেজমেন্টই আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে, সেহেতু তাদের দায় যেমন আছে, তেমনি যে নিরীক্ষক এটি নিরীক্ষা করেছে, তার দায়ও রয়েছে। নিরীক্ষকের ভূমিকা এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরীক্ষক যদি সঠিকভাবে নিরীক্ষা না করে তাহলে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন স্বচ্ছ হবে না। আবার কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট যদি আর্থিক প্রতিবেদনে সঠিক তথ্য না দেয় তাহলে নিরীক্ষকের পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইস্যু ব্যবস্থাপক অবলেখকরাও কিন্তু কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই কাজ করে। তাই আইপিওর ক্ষেত্রে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যেসব কোম্পানির আইপিওর বিষয়ে সন্দেহ হবে সেগুলোর ক্ষেত্রে কমিশন নিজে কিংবা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে শীর্ষস্থানীয় নিরীক্ষা ফার্মের মাধ্যমে পরীক্ষা করাতে পারে। একই সঙ্গে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে এক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করা যায় কিনা, তাও বিবেচনায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান . এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন। তিনি বলেছেন, আইপিও প্রক্রিয়ার সঙ্গে কয়েকটি পক্ষ জড়িত। সবার প্রথমে দায় রয়েছে যে নিরীক্ষক কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছে তার। তারপর যে ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল, তার দায় রয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানির প্রসপেক্টাস পরীক্ষা করে থাকে। তারও দায় রয়েছে। আর সব শেষে আইপিওর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া বিএসইসির দায় রয়েছে। এখানে সব পক্ষকেই সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাছাড়া যেসব কোম্পানির পারফরম্যান্স খারাপ হয়েছে, সেগুলোর কারণ উদ্ঘাটনের উদ্যোগ নেয়া উচিত কমিশনের। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের বাছবিচার না করেই আইপিওতে আসা সব কোম্পানিতে বিনিয়োগের প্রবণতা পরিহার করা জরুরি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় কোম্পানির শেয়ারের যৌক্তিক মূল্য, করপোরেট গভর্ন্যান্স ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে। নইলে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রতিষ্ঠা হবে না। স্টক এক্সচেঞ্জ বিএসইসির পরিচালনগত সক্ষমতায় ব্যাপক পরিবর্তন সংস্কার করতে হবে। বিএসইসির ব্যাপক স্বাধীনতা সক্ষমতা প্রদান করতে হবে, যাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তালিকাভুক্ত কোম্পানির ওপর করপোরেট গভর্ন্যান্স তদারক করতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোয় প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন পরিপালনের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কারসাজিসহ যেকোনো ধরনের অপরাধে যথাযথ শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এক্ষেত্রে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে তাদের যথাযথ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের স্বচ্ছতার সুযোগ দিতে হবে, দ্রুত তালিকাভুক্তির সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু আমাদের এখানে কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে অনেক বেশি সময় নেয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটিকে আরো মসৃণ করা আবশ্যক। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন পরিপালন করা কোনো কোম্পানি আন্ডার ভ্যালুতে আসতে চাইবে না। আবার তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় যদি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে তারা আসবে না। কারণ একটি ভালো কোম্পানি, যাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা রয়েছে, মুনাফায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি রয়েছে, তারা কোনো অন্যায়ের সহযোগী হবে না। কম দরেও শেয়ার বিক্রি করবে না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন