রবিবার | আগস্ট ০৯, ২০২০ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

প্রাইজবন্ড নিয়ে কিছু কথা

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

সম্ভবত ১৯৫৪ সালে আয়ারল্যান্ড সরকার প্রথম প্রাইজবন্ড ইস্যু করে। উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের একটা সঞ্চয়ের সুযোগ দেয়া। পাকিস্তানে বোধ হয় এটা মনঃপুত ছিল। কারণ এই জাতীয় সঞ্চয় একটা জবরদস্তিমূলক সঞ্চয় এবং তার সঙ্গে সুদের সম্পর্ক নেই বলে ধর্মান্ধ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এ ব্যাপারে উৎসাহ বোধ করতো। আর একটা উদ্দেশ্য ছিল বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে মুদ্রাস্ফীতি নাগালের মধ্যে রাখা। পাকিস্তানে এখনও প্রাইজবন্ড চালু আছে। বাংলাদেশে আমরা ১৯৭৪ সালে প্রাইজবন্ড চালু হতে দেখি এবং বন্ডের ওপর তিনমাস অন্তর ড্র অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে প্রাপ্ত পুরস্কারের ওপর কোনো কর আরোপিত না হলেও এখন শতকরা ২০ ভাগ কর আরোপিত হচ্ছে। পাকিস্তানে এই প্রাইজবন্ডকে নিয়ে বিভিন্ন কাহিনী আছে। একটি কাহিনী হলো সঞ্চয় ব্যুরোর লোকেরা ছাড়া এই প্রাইজ কারো ভাগ্যে জোটে না। তাই এই টাকাটা এমনভাবে আবদ্ধ রাখা অর্থহীন। কমপক্ষে বছরে একবার প্রাইজ না পেলে এ অর্থ ধরে রাখা আর কয়েক টুকরা কাগজ ধরে রাখা সমান অর্থহীন। বাংলাদেশে অন্তত আমার তেমন উপলব্ধি। আমি প্রাইজবন্ড কিনতে শুরু করি আদিকাল থেকে! কিনেছি সন্তানদের জন্য, একান্ত প্রয়োজন না হলে কখনও ভাঙ্গাইনি কিন্তু সুদীর্ঘকাল ধৈর্য্য নিয়ে প্রাইজের অপেক্ষায় থেকে একবারও প্রায় ৫০ বছরে কোনো প্রাইজের সন্ধান পাইনি। বছসরে চারবার ড্র অনুষ্ঠিত হলেও বিগত সময়ে প্রায় ২০০ বার প্রাইজবন্ডের ড্র হয়েছে। আমি বা আমাদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে পড়েনি। এ কারণে যখন সংশয়ে ছিলাম যে, এর মাঝে কোনো কারসাজি আছে কিনা তখন কোনো এক পত্রিকায় এক ধরনের কারসাজির খবর পেলাম যার মূল বিষয়টা ছিল পাকিস্তানে উত্থাপিত আপত্তির মতো।

আমি জানি আমার বা আমার পরিবারের কোনো কিছুই ভাগ্যগুণে হয় না। আমার মা বলতেন আমাদের ভাগ্য পাতার নিচের নয়, পাথরের নিচে। পাতার নিচের ভাগ্য সামান্য বাতাসে পাতা উড়ে গেলে ভাগ্য খুঁজে পাওয়া যায়, আর পাথরের নিচে ভাগ্যওয়ালা নিরন্তর ঘসে ঘসে পাথর ছিদ্র করে তবেই ভাগ্যকে পেতে হয়। শেষোক্ত ঘটনা আমাদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হলেও সম্প্রতি লক্ষ্য করছি যে তা নয়। দূর অতীতে আমি রচনা প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জিতেছিলাম, ভাগ্য গুণে মেডেলটি আমার হাতে পৌঁছেনি, বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে রৌপ্য পদক জিতেছিলাম; কিন্তু শেষমেষ পড়লাম বাণিজ্য ও ব্যবসায় প্রশাসনে। সহপাঠিদের সঙ্গে লটারিতে জিতে একটা শার্ট পেয়েছিলাম, ভাগ্যগুণে সে শার্টও আমার গায়ে ওঠেনি। ছোট বেলায় কৃষি ও শিল্প মেলায় যেতাম হাউজি খেলতে। ভুলেও কোনদিন প্রাইজ হাতে আসেনি। তাই প্রাইজবন্ডে আমার প্রাইজ আসবে না জেনেও তা রেখেই দিয়েছি। কারণ এগুলো আমার হেফাজতে থাকলেও এসব আমার নয়। সম্প্রতি আমি বেশ কিছু প্রাইজ এখানে ওখানে পেয়েছি অনেকটা প্রত্যয়ী হচ্ছি যে আমি কোনো না কোনো দিন প্রাইজবন্ডে এক বড়সড় প্রাইজ পেয়ে যাব। ভাবনায় এসব রেখেছি বলে আমি নিজে খোঁজখবর নিই কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে খোঁজখবর রাখি। কিন্তু সকলই গরল ভেল! তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি প্রাইজবন্ডগুলো ভাঙ্গিয়ে ফেলবো। আফসোস হচ্ছে যে এত বছর যাবত এগুলো অন্যকোনো সঞ্চয় স্কিমে রাখলে অন্তত চতুর্গুন অর্থ পেতাম। কারণ, আমি আমার চোখে এমন দ্বিগুন-ত্রিগুনের চক্রবৃদ্ধি দেখেছি। আমি বুঝেছি এটা বিনিয়োগের কোনো লাভজনক ক্ষেত্র নয়। সরকারের এ জাতীয় বন্ড বিক্রয়ের প্রয়োজন কি আছে? 

সরকারের উদ্দেশ্য ছিল মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে রাখা। উপায় হিসেবে টাকাটা বাক্সবন্দি না করে সরকারের নিগড় বন্দি করা। দেশে বর্তমানে প্রচলিত মুদ্রাস্ফীতির হার সহনীয় রয়েছে। সরকার ঋণ নিচ্ছে এবং বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াবার পথ খুঁজছে। এমতাবস্থায় যদি তার অর্থায়নের জন্য এই উৎসটা বেছে নেয়, তাহলে আমি বা আমরা উপকৃত হবো ও সরকারও উপকৃত হবে। এখন সরকারের গৃহীত ঋণের হার ১১-১২ শতাংশ সীমারেখায় বেঁধে দিলেও কতিপয় সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে এই হার বা তার কাছাকাছি হার প্রযোজ্য। 

সরকার ঋণ নিচ্ছে আর শুনেছি সরকার অর্থনীতির মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে ব্যবসায়ীদের ঋণ দিচ্ছে, ব্যবসায়ীরা সরকারকে উচ্চসুদে ঋণ দিচ্ছে। এইসব অবস্থা বিবেচনা করে বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়াতে ও সরকারের নিজস্ব ঋণ চাহিদা খানিকটা মেটাতে প্রাইজবন্ডগুলো পুনঃক্রয়ের প্রয়াস সরকার নিতে পারে। এক্ষেত্রে যদি প্রাইজবন্ডের বিপরীতে তার উল্লেখিত মূল্যের কিছু অধিক অর্থ দেয়া হয়, তাহলে প্রাইজবন্ডধারীদের উপকার হবে, সরকারের উপকার হবে, ব্যয় সাশ্রয়ের মাধ্যমে। প্রাইজবন্ড চালু রাখার প্রশাসনিক ব্যয়ও কমবে, কমবে সত্যি কিংবা গুজবের প্রসার। আশা করি আগত বাজেটে প্রাইজবন্ড একটু উচ্চহারে পুনঃক্রয়ের বিধান থাকবে। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন