মঙ্গলবার | আগস্ট ১১, ২০২০ | ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

প্রবহমান সময়

নিন্দিত নরকে নন্দিত নিস্তার!

আব্দুল বায়েস

প্রথমে বলে নেয়া ভালো যে আমার বর্তমান লেখার সূত্রপাত ঘটে ফেসবুকের সাম্প্রতিক একটা পোস্ট থেকে। আমাদের সাবেক ছাত্র প্রবাসী ওসমান রহমান করোনাতাড়িত দুর্দশা দাওয়াই নিয়ে এক সুখপাঠ্য নিবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। তাই কখনোসখনো তার লেখার শব্দান্তরিত প্রকাশ ঘটতে পারে বলে আগাম জানান দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

শুরুতে শিরদাঁড়া ঠাণ্ডা করা সংবাদ হলো, বিশ্বে করোনা আক্রান্তের এবং মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে; মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। পশ্চিমে অর্থনৈতিক সামাজিক হাড়গোড় ভেঙে করোনা এখন ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে আগুয়ান। দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশে প্রতিদিন করোনায় আক্রান্ত মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলছে, যদিও আপেক্ষিক অর্থে অবস্থা এখনো ততটা ভয়ংকর নয়। স্বীকার করতেই হবে যে বিদ্যমান খুব দুর্বল স্বাস্থ্য কাঠামো ব্যাপক দুর্নীতির দাপটে পরিস্থিতি নাগালের বাইরে যেতে সময় না- নিতে পারে। বাংলাদেশে করোনা এখন বাঘ বা চিতা, তবে করোনা যেন প্যান্থার হয়ে না ওঠে, সে কামনা আমাদের সবার।

অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে সমস্যা হলো, বিশেষত স্বাস্থ্য খাতে, এখানকার সরকারি খাত অদক্ষ আর বেসরকারি খাত চরম দুর্নীতিপরায়ণ। আগে জানতাম গোবরে পদ্ম ফুল, এখন দেখছি পদ্ম ফুলে গোবর অর্থাৎ তথাকথিত ভালো ব্যাকগ্রাউন্ড উচ্চশিক্ষিত ব্যবসায়ী ডাক্তার মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করছেন। তবে স্বীকার করতেই হয় যে উপরমহলের কঠোর অবস্থানের কারণে কয়েকজন এরই মধ্যে ধরা পড়ে কিঞ্চিৎ স্বস্তির সুবাতাস এনেছে বৈকি। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে এমন ধরপাকড় অব্যাহত রাখা জরুরি। করোনা আজ আছে, কাল হয়তো থাকবে না। কিন্তু এরা সমাজের স্থায়ী করোনা; এদের নির্মূল করা জরুরি। তার জন্য শরীরে হাত না দিয়ে শিকড়ে হাত দেয়া দরকার।

সে যা- হোক, আসল কথা হচ্ছে চাতক পাখির মতো পৃথিবীর মানুষ ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। মানবসভ্যতার ইতিহাস জয়ের, পরাজয়ের নয়। তাই সব সন্দেহ আর সংশয় নিয়ে সচেতন সমাজে স্বাভাবিক ভাবটা এমন যে আমরা করব জয় একদিন, মনের গভীরে আছে প্রত্যয়। বিশেষত রক্তাক্ত একটা মুক্তিযুদ্ধে জয়ী বাংলাদেশীদের রক্তের মধ্যে প্রত্যয় প্রতিনিয়ত বহমান। যেকোনো সংকটে এই চেতনা দাওয়াই হিসেবে কাজ করে।

সম্প্রতি করোনাকালের ভয়ংকর অবস্থা নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির এক পোশাকি চিত্র এঁকেছে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিকতম গবেষণাপত্রে বিদ্যমান করোনা নরকের চিত্রটি সবার চিন্তার খোরাক জুগিয়ে চলছে।

আইএমএফ অনুমান বা অভিক্ষেপ করছে যে ২০২০ সালে বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় শতাংশ সংকুচিত হবে। অবশ্য পরবর্তী বছরের সংহত প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা থেকে থাকলেও ২০-২১ এই দুই বছরান্তে সারা পৃথিবীর অর্থনৈতিক দুরবস্থা করোনাক্রান্ত মহামন্দার পূর্বাবস্থার চেয়ে সাড়ে শতাংশ নিম্নতর নর্দনে নিপতিত থাকবে। বলার বোধ হয় দরকার পড়ে না যে বাংলাদেশের অর্থনীতিও একটা বড় ঝাঁকুনির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিধায় জীবন-জীবিকা ট্রেড অফটা সাক্ষাৎ সামনে এসে হাজিরডাঙায় বাঘ, জলে কুমির। লকডাউনে মানুষ জীবিকাবঞ্চিত আবার শিথিল হলে সমূহ বিপদ। তবে টেস্ট, ট্রেস ও ট্রিটমেন্ট এই তিনের উপস্থিতি কিছুটা উপশম আনে।

করোনার কারণে কতটুকু ক্ষতি? আইএমএফের হিসাব উল্লেখ করে ওসমান রহমান বলছেন, করোনার ভয়াবহ সন্ত্রাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যে অভূতপূর্ব সংকোচনের মুখোমুখি, তার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হচ্ছে ১২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ক্রমপুঞ্জীভূত এই অবক্ষয় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ চীনের সামষ্টিক অর্থনীতির ৮৫ শতাংশের মতো। তার মতে, বিষয়টি এভাবেও চিন্তা করা যেতে পারে যে করোনা মহামারীর বিষাক্ত আক্রমণে মহামন্দাক্রান্ত পৃথিবী থেকে প্রায় চীনের সমান একটি অর্থনীতি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ভাবুন একবার কী ভয়ানক!

এবং এটাই স্বাভাবিক যে এই দুরারোগ্য আর্থিক ব্যাধি থেকে আশু রোগমুক্তির লক্ষ্যে উপায়-উপাত্তসমেত পরীক্ষা-নীরিক্ষা চলছে নিরন্তন। দুটো দিক উল্লেখ না করলেই নয়। এক. এরই মধ্যে পৃথিবীর সব দেশের সরকার রাজস্বনীতির আওতায় প্রায় ১১ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ প্রণোদনা সহায়তা প্রদান করেছে। দুই. মোলায়েম মুদ্রানীতির সহায়তায় যে পরিমাণ অর্থসঞ্চালনা এবং প্রায় শূন্য সুদের সহজ হারে যে ব্যাপক তরল মুদ্রা সরবরাহের ব্যবস্থা সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রহণ করেছে, তা দিয়ে এসব দেশের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত সময়োচিত অর্থধারা অর্থনীতির মস্তিষ্কে হঠাৎ রক্তক্ষরণ নিশ্চিতভাবে বন্ধ করতে সম্ভব হবে বলে গুণীজনরা আশা করছেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সরকারও সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব মুদ্রানীতির সহিষ্ণু সমন্বয়ের মাধ্যমে ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর গত বাজেট বক্তৃতায় সুপারিশকৃত পদক্ষেপের আলোকে আমরা সম্ভবত এমনটি অনুমান করতে পারি। সুশাসনের ঘাটতি না থাকলে সমস্যা সমাধানে খুব একটা বেগ পেতে হবে বলে মনে হয় না। প্রবৃদ্ধিপ্রেমিকদের উচিত হবে আপাতত মানুষ বাঁচানোর কৌশল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হাজির করা।

আর একটা আকুতি। অর্থনীতি যখন মন্দার মুখোমুখি হয়, তখন জন মেইনারড কেইনসকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ না করে উপায় থাকে না। ত্রিশের মহামন্দা উত্তরণে কেইনসীয় কায়দা আজও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ধনী-গরিব সব দেশই মনে হয় কেইনসীয় ভ্যাকসিনে করোনাক্লিষ্ট অর্থনীতির রোগ নিরাময় দেখছে। তাই উদার রাজস্বনীতি জনগণ ব্যবসায়ীদের মোট চাহিদা আর সরবরাহ বৃদ্ধি করে বলে বিশ্বাস। অন্যদিকে নমনীয় মুদ্রানীতি সৃষ্ট অতি অর্থ তারল্য দেশের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় বাণিজ্য আস্থা তৈরি করে।

তবে করোনাক্রান্ত ম্রিয়মাণ অর্থনীতিকে পুনরায় সুস্থ এবং স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার যে নিদান আইএমএফ প্রদান করছে, তার কার্যকারিতা নির্ভর করছে চলমান মহামারীর অনির্দিষ্ট বিবর্তনের ওপর। অর্থাৎ এসব নীতির কার্যকারিতা অর্থনীতি-বহিস্থ (Exogenous)

ত্রিশের মহামন্দা অভিক্ষেপিত মহামন্দার পেছনের কারণে পার্থক্য আছেআগেরটা একেবারেই অর্থনৈতিক, দ্বিতীয়টি একেবারেই -অর্থনৈতিক। অবশ্য এক অর্থে দুটোই সংক্রামক হলেও দ্বিতীয়টি মানব প্রাণহানি ঘটানো বৈশ্বিক যোগাযোগ এবং সামাজিক সম্পর্ক রুদ্ধ করার ক্ষেত্রে অধিকতর বলবান আগ্রাসী।

অর্থনীতি নির্ধারক রাষ্ট্র পরিচালক সবাই এখন শঙ্কিত এবং কিছুটা পরিশ্রান্তও বটে। মানুষ বাঁচাতে যেমন অক্সিজেন মাস্ক দরকার, তেমনি দরকার অর্থনীতি বাঁচাতে। এতে রোগী বাঁচবে কিনা বলা যায় না, কারণ করোনা রোগের গতি-প্রকৃতি গন্তব্য যে অজানা। দীর্ঘকাল বিছানায় পড়া রোগী নিয়ে স্বজনদের যে অবস্থা হয় তেমনি, কী আশায় বাঁধি খেলাঘর বেদনার বালুচরের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বর্তমান কালেও।

সেইমতে যেকোনো প্রক্ষেপণেই প্রত্যাশা থাকে যে অদূরভবিষ্যতে কার্যকর টিকা আবিষ্কার এবং যথাযথ নিরাময়যোগ্য ওষুধ উদ্ভাবন ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্তমান মরণব্যাধি করোনা নিরসনের একটা উপায় বিজ্ঞানীরা বের করবেন। বাংলাদেশের অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই।

এই আশাপূরণের শর্তসাপেক্ষে অর্থনীতিবিদরা দেশের অর্থ স্বাস্থ্যের মহামারী অবক্ষয় নিরাময়ের নিদান আর নির্দেশনা প্রণয়ন করেছেন। যেহেতু আশু করোনা নিধন এখনো সুনিশ্চিত নয়, তাই অর্থ নিদানও এখন পর্যন্ত সম্ভাব্যতার স্তর পেরিয়ে নিশ্চিতির পর্যায়ে উন্নীত হতে পারছে না!

নিন্দিত মহামন্দার নিশ্চিত নিরসনে নন্দিত নিস্তারের সন্ধান মানবিক অনুসন্ধানের নিবিড়তায় একদিন সফল হবেই! সেদিন আমাদের অনেকের কেউ কেউ না থাকলেও ক্ষতি নেই! অর্থনীতি চলবে!

করোনা নামের নিন্দিত নরক থেকে নন্দিত নিস্তার চাই। আশা করি, দীর্ঘ অন্ধকার সুড়ঙ্গ শেষে অচিরেই আলোর সাক্ষাৎ ঘটবে।

তার আগে বাসায় বন্দি সবার ভাবনা প্রায় একই রকম:

ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে

বন্ধু আমার

না পেয়ে তোমার দেখা, একা একা দিন যে আমার কাটেনা রে...

বুঝি গো রাত পোহালো

বুঝি ওই রবির আলো

আভাসে দেখা দিল গগন-পারে...

 

আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য 

অর্থনীতির অধ্যাপক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন