বৃহস্পতিবার | আগস্ট ০৬, ২০২০ | ২১ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

বিদেশগামী সব ফ্লাইটে বাধ্যতামূলক হচ্ছে করোনা নেগেটিভ সনদ

যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে উড়োজাহাজে যাত্রী চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বিদেশগামী সব ফ্লাইটের যাত্রীদের করোনা নেগেটিভ সনদ বাধ্যতামূলক করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, করোনা নেগেটিভ ভুয়া সনদ নিয়ে বিদেশ যাচ্ছে যাত্রী। সেখানে গিয়ে করোনা পজিটিভ হিসেবে ধরা পড়ছে কেউ কেউ। তাতে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। প্রথমে জাপান, কোরিয়া, এরপর বন্ধ হয়েছে ইতালির ফ্লাইট। বিদেশে যাওয়ার পর বিমানবন্দরেই প্রবাসী বাংলাদেশীদের শরীরে করোনা শনাক্ত হচ্ছে কেন, তার কোনো সুস্পষ্ট জবাব মেলেনি কারো কাছ থেকে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দোষারোপ করছে। কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে বিমান যাত্রীদের নির্ভুলভাবে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্তের প্রক্রিয়ায় গলদ আছে। বিমানবন্দরে সহকর্মীদের বিদায় জানাতে গিয়ে দেশে অবস্থানরত বেশ কয়েকজন অভিবাসী জানতে পেরেছেন, সেখানে যাত্রীদের কভিড-১৯ সনদ সঠিকভাবে যাচাই করা হয় না। শুধু শরীরের তাপমাত্রা মেপেই ছেড়ে দেয়া হয়। কয়েকজন অভিযোগ করে বলেছেন, ভুয়া সনদ নিয়ে যারা গেছেন, তারা আগেভাগেই বিমানবন্দরে কর্তব্যরতদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে থাকেন। মূলত বিদেশে গিয়ে তারাই ধরা পড়েছেন। কারণে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করা জরুরি। বর্হির্বিশ্বের আস্থা অর্জনে বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা অবশ্যই ভালো একটি উদ্যোগ। তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ওপর। এখানেই আমাদের দুর্বলতা লক্ষণীয়।

জার্মানিসহ ইউরোপের বহু দেশ এবং জাপানসহ এশিয়ার কিছু দেশ বিমানবন্দরেই সব যাত্রীর করোনা পরীক্ষা চালু করেছে। স্বল্প সময়ে এর ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিমানবন্দরেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায় কিনা, তা ভেবে দেখতে পারে কর্তৃপক্ষ। নইলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে। কারণ বাংলাদেশে পরীক্ষার সক্ষমতা না বেড়ে বরং প্রতিদিনই কমছে। একের পর এক ল্যাব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যারা সরকারের অনুমতি নিয়েছিল, তাদেরও অনুমোদন বাতিল করা হচ্ছে শর্তপূরণ করতে না পারায়। তাছাড়া ভুয়া টেস্ট করিয়ে মিথ্যা সার্টিফিকেট দেয়ার অভিযোগ তো রয়েছেই। এক্ষেত্রে বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা টেস্টের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখাও প্রয়োজন। একই সঙ্গে কতদিন আগের সনদ কার্যকর হবে, তাও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কেননা আজ করোনা নেগেটিভ হলেও কালকেও কেউ করোনা আক্রান্ত হতে পারে। ফলে উন্নত দেশের মতো বিমানবন্দরে করোনা টেস্টের ব্যবস্থা করা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত যাত্রীদের হয়রানি এড়াতে। সুযোগ তো আমাদের রয়েছেই। একই সঙ্গে আবার একথাও সত্য, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে টেস্ট করিয়ে ফল পেতে অনেক দেরি হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানে ভিড় বাড়বে এবং সুযোগ নিয়ে তারা পরীক্ষার ফি আরো বাড়িয়ে না দেয়, তা তদারক করা প্রয়োজন। এখন থেকে বিদেশ গমনকারী সব বাংলাদেশী নাগরিককে বাধ্যতামূলক করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের সুবিধার্থে সার্টিফিকেটগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটেও জমা দিতে হবে। অর্থের বিনিময়ে করোনা সনদ লাভের পথও বন্ধ করতে হবে।  ইতিবাচক বিষয় হলো, কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ গমনকারী প্রত্যেকের করোনা পরীক্ষার সুবিধার জন্য প্রবাসীকল্যাণ বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নির্দিষ্ট নমুনা টেস্টিং সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এগুলো ভালো উদ্যোগ। বাস্তবায়নে নিবিড় তদারকি থাকা আবশ্যক। কেননা আমাদের অনেক ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নে গিয়ে অনিয়ম-অদক্ষতায় বাধাগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি আরো ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। এতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

করোনার কারণে বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবর্মূতি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বটে, তবে সেটি বিদেশগামী সব ফ্লাইটে করোনা নেগেটিভ সনদ চালু করলেই হবে না। সবাই যাতে করোনার পরীক্ষা করাতে পারে, তার ব্যবস্থাও করা চাই। একই সঙ্গে পরীক্ষার মান রক্ষা জালিয়াতি রোধে তদারকি জোরদার করাও প্রয়োজন। করোনা নিয়ন্ত্রণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বিমান চলাচল খুলে দিলেও বাংলাদেশ তালিকায় নেই। অবশ্য রাশিয়া আমেরিকাও তালিকায় নেই, তবে তা মূলত উচ্চসংক্রমণের কারণে। এখানে দুটো বিষয় জড়িত। একটি হচ্ছে টেস্ট নিয়ে প্রতারণা। অর্থাৎ টেস্ট না করেই রিপোর্ট দেয়া। আরেকটি হচ্ছে টেস্টের মান রক্ষা করা। টেস্টের মান ভালো না হলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব নয়। ফলে সংক্রমণ বাড়তেই থাকবে। এমন অবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিদেশ থেকে যাদের বাংলাদেশে আসা দরকার, তাদের অনেকেই আসার জন্য ভরসা পাবেন না। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে বিমানবন্দরে ভালোভাবে চেক করে বিদেশে যাত্রী পাঠানো হয়। যাতে আর কোনো দেশ আমাদের প্রবাসী নাগরিকদের ওপর এভাবে নিষেধাজ্ঞা না দিতে পারে। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে আর কেউ কভিড-১৯-এর ভুয়া নেগেটিভ সনদপত্র না দিতে পারেন। যারা ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে চিহ্নিত করে বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে আমাদের ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে। এমনিতেই বাংলাদেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তার মধ্যে যদি করোনা আক্রান্তরা ফ্লাইটে করে বিদেশে গিয়ে ধরা পড়ে, তা আমাদের ভাবমূর্তি আরো ক্ষুণ্ন করবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন