শুক্রবার | আগস্ট ০৭, ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

পর্যালোচনা

সরকারের শিল্পদর্পণে পাটকল

এম আর খায়রুল উমাম

বিশ্বব্যাপী মানুষ পরিবেশ সচেতন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পলিথিনকে সরিয়ে পাটকে সামনে নিয়ে আসছে। বিশ্ব যখন পাটকে সমাদর করছে, আমরা তখন পাটকে চরমভাবে অবহেলা করছি। বেসরকারি পর্যায়ে পাটের অবস্থা সন্তোষজনক হলেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাটের করুণ অবস্থা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সরকারি পাটকলের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে এখানে কোনো শুভ উদ্যোগ আছে, তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। একসময় দেশে ৮২টি সরকারি পাটকল থাকলেও আজ তার মাত্র ২৫টি অবশিষ্ট আছে। বিপরীতে আশির দশকে গড়ে ওঠা বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা আজ ২২৫। সরকারি পাটকলগুলো একের পর এক শুধু লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বা ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। পাটকল সরকারি হলেই লোকসান করে আর বেসরকারি হলেই লাভ করে, কী অদ্ভুত এক মজা তাই না? এজন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে কৈফিয়তও দিতে হয় না, এটাও কম মজার বিষয় নয়। শুধু লোকসানের অজুহাতে পাট শিল্পকে বেহাল করার, বিলুপ্ত করার, গোষ্ঠীস্বার্থে নিবেদিত করার যেসব কার্যক্রম চলমান, তার কতটা দেশ জাতির জন্য কল্যাণকর, সে বিষয়টি বিবেচনা করা জাতীয় স্বার্থেই জরুরি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে অর্থকরী ফসল হিসেবে পাট একটা সময় পর্যন্ত বিশ্বে সমাদৃত ছিল। পাটকে সোনালি আঁশ বলে আখ্যায়িত করা হতো। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় খাত হিসেবে স্বীকৃত ছিল পাট। আমাদের আদমজী পাটকল বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল হিসেবে খ্যাত ছিল। সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের এত গুরুত্বপূর্ণ ফসল পাটের জীবনে বিশাল পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়া হয়েছে। বলা যায় একটা ঐতিহ্যের গলা টিপে মেরে ফেলা হয়েছে। বিশ্ববাজারে পাটের গুরুত্ব, ব্যবহার, সমাদর যখন বাড়ছে, ঠিক তখনই পাটের গলা টিপে ধরা হলো। দেশে পাটকে গুরুত্বহীন করতে করতে শূন্যের কোটায় নিয়ে যাওয়া হলো। একের পর এক পাটকল বন্ধ করে দেয়া হলো। বিক্রি করে দেয়া হলো। বিশ্বে শ্রেষ্ঠ পাট উৎপাদনকারী দেশের মানুষকে পাটের বহুমুখী ব্যবহারের কথা জানানো হলো না। পাটসংশ্লিষ্ট গবেষক, উন্নয়নকর্মী, উৎপাদক, ব্যবস্থাপক সবাই পাটের সুতো আর চট তৈরির মধ্যেই নিজেদের আটকে রাখল। পরিবেশ সচেতন হয়ে ওঠা বিশ্ব যে কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহারের চেয়ে পাট আর তুলার ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সে খবর সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছল না। স্বাধীন দেশ, স্বাধীন মানুষ, তাই কারো কোনো জবাবদিহিতা দায়বদ্ধতা নেই। ফলে লোকসানের কারণ অনুসন্ধানের চেয়ে লোকসান বড় হয়ে যাওয়ায় পাটের ভাগ্য অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু ৬৭টি ব্যক্তিমালিকানাধীন পরিত্যক্ত পাটকল তদারকি, পরিচালনা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন গড়ে তোলেন। মাত্র ১০ বছরে সরকার পাটকলগুলো পর্যায়ক্রমে ব্যক্তিমালিকদের কাছে দিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সরকার শিল্প-কারখানা পরিচালনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সরকার বিশ্বাস করে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করতে, শ্রমিকদের রক্ষা করতে এবং অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পাটকলগুলো বেসরকারীকরণ করে ব্যক্তিমালিকদের হাতে ছেড়ে দেয়াই উত্তম। পরিতাপের বিষয় এই যে সরকারের এই উত্তম বিশ্বাস, যা দেশ জাতির কল্যাণ বিবেচনায় গৃহীত হয়েছিল, তা কিন্তু সার্বিকভাবে প্রমাণিত হলো না। বরং বলা যায়, ব্যক্তিস্বার্থ আর দুর্নীতির কালো মেঘ বাংলাদেশের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তাই সেখানে দাঁড়িয়ে সংশ্লিষ্টরা কেউ দেশ জাতিকে দেখতে পেল না। ফলে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে যে সিদ্ধান্ত এল, তা জাতির ভাগ্যকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিল। ব্যক্তির ব্যর্থতার দায় পুরো জাতির কপালে অমানিশার কালো তিলক এঁকে দিল।

সরকারের উত্তম বিশ্বাস পুরো পাট শিল্পের ক্ষেত্রে বুমেরাং হয়ে গেল। জনগণের অর্থের মিল ব্যক্তিমালিকানার হলো। সরকার এই মালিকদের হাতে মিলগুলো হস্তান্তরের সময় সব বকেয়া পরিশোধের নির্দেশনা দিয়েছিল, কিন্তু সে নির্দেশনা পূরণ করার কোনো দায় গ্রহণ করল না। বরং মিলের জমি, মিলের সম্পদ থেকে শত শত কোটি টাকা ব্যাংকঋণের প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিল। এই ঋণের সামান্য অংশ মিলে প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগ হলো ঠিকই, তাতে মিল পরিচালনা করে লোকসানই থেকে গেল। শ্রমিকরা মজুরি পেলেন না, ছাঁটাই হয়ে গেলেন, মিল লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করে দেয়া হলো বা হস্তান্তর করে দেয়া হলো। অন্যদিকে মিল মালিকরা এই ব্যাংকঋণের অর্থে অন্য খাতে শিল্পপতি হয়ে গেল। আরো ব্যাংকঋণ পেল, ব্যাংকের মালিকানা পেল, সমাজে বিত্তবান মানুষ হিসেবে স্বীকৃতির পাশাপাশি অভিজাত শ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করল। পুরো পাটশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলো, দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলো, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেন আর পাটকলের শ্রমিকরা নিঃস্ব হলেন।

দেশে প্রতিটা শিল্প-কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ লোকসান। এই লোকসানের কথা বলে শুধু পাটকল নয়, একে একে বন্ধ করা হয়েছে ইস্পাত মিল, নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, বস্ত্র মিল, সুগার মিল, কেমিক্যাল মিলসহ আরো কত মিল। মোটামুটিভাবে দেশের বৃহৎ শিল্প-কারখানাগুলো বন্ধ করতে লোকসানকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করে রেখে জনগণকে ভূগোল পড়ানো হলো। লোকসান কেন, কীভাবে, কোথায় এবং কখন হচ্ছে, সে বিচার করার সময়ই পাওয়া গেল না। মূল অন্যায়কারীরা বিচারের ভার পেয়ে দায়ের স্বরূপ পরিবর্তন করে নিল। যেকোনো বৃহৎ শিল্প-কারখানা লোকসানের পাশাপাশি কত শ্রমিক পরিবারকে জীবনসংগ্রামের রসদ জুগিয়েছে, কত টাকা রাজস্ব দিয়েছে, কত টাকা বিদ্যুৎ-পানি-টেলিফোন বিল দিয়েছে, কত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে বা ব্যয় বন্ধ করেছে, কত শিক্ষার্থীকে শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে, কত ক্ষুদ্র বড় ব্যবসায়ী পরিবারের রসদ সরবরাহ করেছে, কত কৃষক শ্রমিক কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ করে জীবন যুদ্ধ করেছে, সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর আছে কিনা জানি না। উত্তর কেউ খুঁজলও না। শুধু জাতি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল বিশ্বের বৃহত্তম জুট মিল আদমজী লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করে দেয়া হলো। এখানে ইপিজেট করা হলো। সবচেয়ে মজা হলো, সরকারের জুট মিল বন্ধে রাজনীতিক, প্রশাসনিক থেকে শুরু করে শ্রমিক নেতারা পর্যন্ত নীরবতা পালন করলেন। তারা শুধু বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষীর মতো আর একটা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকলেন।

দেশের বৃহত্তম পেশাজীবী সংগঠন আইডিইবি আশির দশকে দেশব্যাপী সভা করে প্রযুক্তি চিন্তাহীন রাজনীতি শোষণের হাতিয়ার বলে জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিল। আমাদের রাজনীতি প্রযুক্তি চিন্তাহীন। বিজ্ঞান প্রযুক্তি প্রতিদিনকার বিশ্বে যে রকেটের গতিতে এগিয়ে চলেছে, তা আমাদের রাজনীতি ভাবতে চায় না। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করে না। সে অনুভবহীনতা থেকেই পঞ্চাশের দশক, ষাটের দশকে স্থাপিত পাটকলগুলো আধুনিকায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না। পাটের বহুমুখী ব্যবহারের খোঁজ করা হলো না। প্রয়োজনের মুহূর্তে অর্থ সরবরাহ করা হলো না। কাঁচামাল যন্ত্রাংশের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হলো। সব রকমের প্রয়োজনীয় মালপত্র সংগ্রহে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা দায়বদ্ধতাকে শিকেয় তুলে রাখা হলো। আর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ সে তা আমাদের ভাবনার মধ্যেই নেই। বিজ্ঞানের অগ্রগতি বিবেচনায় যে জুট মিলগুলো আধুনিকায়নের ছোঁয়া পেল না, বিপরীতে অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতি বাধাহীন হলো, সেখান থেকে লোকসান ভিন্ন অন্য কিছু আশা করা যায় কীভাবে?

দেশের উচ্চমহল তাদের সব অদক্ষতা, অযোগ্যতা, অব্যবস্থাপনার দায়ভার শ্রমিকদের ঘড়ে চাপিয়ে নিজেরা ধোয়া তুলসীপাতা থাকতে চায়। আমাদের শ্রমিকদের নিম্ন মূল্য সংযোজনের কারণে শিল্প খাত জিডিপিতে যথাযথ অবদান রাখতে পারে না। বহু কারণে শ্রমিকদের নিম্ন মূল্য সংযোজন, যার দায় শ্রমিকদের চেয়ে উচ্চমহলের বেশি। তবে আমাদের দেশে অন্য সব সংগঠনের মতো শ্রমিকরাও শুধু নিজেদের অধিকার নিয়েই তাদের সব কার্যক্রম পরিচালনা করেন। কর্তব্য দায়িত্ব পালনের সুবিধাও যে এক ধরনের অধিকার, তা কেউ বিশ্বাস করে না। ফলে কর্মক্ষেত্রে উন্নয়ন উৎপাদনের ভাবনা দেখা যায় না। সংশ্লিষ্টরা সুযোগটাই গ্রহণ করে শ্রমিকদের ওপর দায় চাপান এবং তাদের ন্যূনতম প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করেন। এখনো এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা চলমান। শ্রমিকদের মজুরির জন্য সংগ্রাম করতে হয়, জীবন দিতে হয়। উন্নয়নের বাংলাদেশে শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।

বিশ্বব্যাপী চলমান মহামারীর নেতিবাচক প্রভাব বর্তমান সময়ে আরো ব্যাপকভাবে পড়েছে আমাদের পাট শিল্পে। জাতীয় দৈনিকগুলোর খবরে প্রকাশ এরই মধ্যে একে একে বাতিল হয়ে গেছে প্রায় সব রফতানি আদেশ। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক কর্মী তাদের পরিবারের জীবন। স্বাধীন দেশে স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে দিনাজপুরে বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন একজন শ্রমিক। মিল মালিকরা তাদের উৎপাদিত রফতানিযোগ্য পণ্যগুলোর জন্য নানাভাবে নতুন ক্রেতার সন্ধান করছেন। যাতে কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করে হলেও ক্ষতি কিছুটা লাঘব করা যায়। বাতিল হয়েছে ১২৭টি মিলের ২৫ কোটি ডলার মূল্যের রফতানি আদেশ। ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে এখন পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে মেলেনি কোনো প্রকার সাড়া, কোনো প্রকার প্রতিশ্রুতি। বরাবরের মতো অবহেলিত থেকে গেছে সোনালি আঁশ খ্যাত বাংলার পাট শিল্প।

স্বাধীনতার পরপর পাট পাটজাত দ্রব্য থেকে রফতানি আয়ে ৮৭ শতাংশ আসত, যা আজ সিঙ্গল ডিজিটে রূপান্তরিত হয়েছে। পক্ষান্তরে গার্মেন্ট খাত মোট রফতানি খাতের তিন-চতুর্থাংশের মালিক। সরকার খাতের প্রসারে খুশি হয়ে একে শিল্পের মর্যাদা দিয়েছে। দেশে সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত এবং নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির সোপান হিসেবে সরকারিভাবে শিল্পের মর্যাদা পেলেও প্রকৃতপক্ষে শিল্প হিসেবে খাতকে মূল্যায়ন করা কষ্টকর। নারী শ্রমিকদের শ্রমনির্ভর লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিল্পকে নিয়ে গর্ব করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। এখানেও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে শ্রমিক বঞ্চনা বিদ্যমান। বৃহৎ শিল্পের তুলনা গার্মেন্টের সঙ্গে হতে পারে না। বৃহৎ শিল্প দেশ জাতির কল্যাণ বিবেচনায় রক্ষা করা জরুরি। বৃহৎ শিল্পের জন্য অর্থ, প্রযুক্তি শ্রমিকদের সুষম সমন্বয় দরকার। দেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আশা করা যায়, মহামারী-উত্তর দেশে পাট শিল্প নিয়ে সরকার নতুন ভাবনায় আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হবে। ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি জনকল্যণে বৃহৎ শিল্পগুলো রক্ষায় সরকারের পাশে থাকবে। দেশের ঐতিহ্যের হাতে হাত রেখে পরিবেশবান্ধব বৃহৎ শিল্পের দিকে নতুনভাবে নজর দেবে। বাংলাদেশের সোনালি আঁশ আবার বিশ্বখ্যাত হবে।

 

এম আর খায়রুল উমাম: প্রকৌশলী সাবেক সভাপতি

ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন