শনিবার | আগস্ট ০৮, ২০২০ | ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

বিশ্ব জনসংখ্যার সংখ্যামত

ড. মো. হাসিনুর রহমান খান

প্রতিবছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিচালনা পরিষদের মাধ্যমে এই দিবসটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৯ সালের ১১ জুলাই ঠিক যখন বিশ্ব জনসংখ্যা প্রায় ৫০০ কোটি হতে চলেছিল। বিশ্ব জনসংখ্যার বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে প্রতিবছর মানুষকে সচেতন করাই এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য। বিশেষ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব, লিঙ্গ ভারসাম্য, দারিদ্র, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য এবং মানবাধিকার বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন করাই এই দিবসের মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু এ বছর এ দিবসটি পালন হচ্ছে এমন একটি সময় যখন বৈশ্বিক করোনা মহামারী গ্রাস করছে মানুষের সকল অর্জন এবং উপরোক্ত জনসংখ্যার সমস্যাগুলোকে আরো প্রকট করে তুলছে। সম্প্রতি ইউএনএফপিএ (UNFPA) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশগুলো যদি লকডাউন ছয় মাস পর্যন্ত বর্ধিত করে তাহলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর প্রায় চার কোটি ৭০ লাখ নারী আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ থেকে বঞ্চিত হবেন। প্রায় ৭০ লাখ অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ঘটবে। অতিরিক্ত প্রায় তিন কোটি ১০ লাখ পারিবারিক সহিংসতা ঘটতে পারে। যারা অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত তাদের প্রায় ৬০ ভাগ নারীই বৈশ্বিকভাবে দারিদ্র্য হয়ে যাওয়ার বড় রকমের এক ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন। এই করোনাকালীন সময়ে বাংলাদেশও অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, বর্ধিত প্রসব কালীন মাতৃ ও শিশুমৃত্যু, বাল্যবিবাহ ও অপুষ্টির মাত্রা বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের অবনতি, পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি, বেকারত্ব বৃদ্ধি, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি ইত্যাদি।

১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে আমার মত অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে পৃথিবীতে মনে হয় বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশ আর একটিও নেই। অথবা জনসংখ্যার সংখ্যায় বেশী থাকলেও জনসংখ্যার ঘনত্বের হিসাবে আর একটি দেশেও নেই। বলা বাহুল্য যে বাংলাদেশের চেয়েও বেশী জনসংখ্যা ঘনত্বের দেশের সংখ্যা একেবারেই কম নয়। পৃথিবীতে এগারোটি এমন দেশ রয়েছে এবং যাদের মধ্যে অনেক পরিচিত দেশও রয়েছে যেমন সিঙ্গাপুর, বাহরাইন, মালদ্বীপ। সিংগাপুরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে আট হাজারেরও বেশী লোকের বসবাস। যেখানে বাহরাইনের রয়েছে দুই হাজার আর বাংলাদেশের রয়েছে ১১শ লোকের বসবাস। অন্যদিকে বাংলাদেশের চেয়ে কম ঘনত্বের দেশের সংখ্যা ২২০। আরেকটু সহজ করে বললে বলা চলে ২৩২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ প্রথম পাঁচ শতাংশ দেশের মধ্যে। সবচেয়ে তলানির যে দেশগুলি রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার ঘনত্ব আশাতীতভাবে কম, যা প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র তিনজন। আবার জনবহুলতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান আট (১৬ দশমিক ৩ কোটি)। অন্যান্য শীর্ষদেশগুলো হলো চীন (১৪৩ দশমিক ৫ কোটি), ভারত (১৩৬ দশমিক ৫ কোটি), যুক্তরাষ্ট্র (৩৩ কোটি) , ইন্দোনেশিয়া (২৭ কোটি), পাকিস্তান (২১ দশমিক ৭ কোটি), ব্রাজিল (২১ কোটি), নাইজেরিয়া (২০ কোটি)। অন্যদিকে সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ হলো ভ্যাটিকান সিটি, যার জনসংখ্যা হলো প্রায় ৮০০।

জনসংখ্যা ও এর ঘনত্বের বৈচিত্রপূর্ণ দেশগুলির রয়েছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নানা নিজস্ব অথচ বৈচিত্রপূর্ণ কর্মকৌশল যেমন চীনের এক সন্তান নীতি বহুল পরিচিত যেটি চালু হয়েছিল ৪০ বছর আগে ১৯৭৯ সালে এবং এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি মানুষের সংখ্যা কমিয়ে ফেলতে পেরেছে। যদিও পরে ২০১৬ সাল হতে দুই সন্তান নীতি চালু করে। এক সন্তান নীতির কারণে ক্রমসংকুচিত জনসংখ্যাকে ঠেকাতে চীনের অধুনা প্রবর্তিত এই দুই সন্তান নীতিও ভাল কাজ দিচ্ছে না সম্প্রতি এমনটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কেননা ২০১৬ সালে জন্মের হার ৮ শতাংশ বাড়লেও পরের বছর সেটি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নেমে আসে। এমনটি হওয়ার পিছনে বড় একটি কারণ হিসেবে ভাবা হচ্ছে মধ্যবিত্ত মানুষদের সন্তান না নেয়ার আকাঙ্ক্ষা যা তৈরি হওয়ার কারণ হিসেবে আবার ভাবা হচ্ছে ব্যক্তি ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা পিছনে অধিক সময় ও শ্রম দেওয়াকে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কিছুটা ফলপ্রসু হবে এমনটি ভাবা হচ্ছে, যেমন ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ৫ কোটি বেশি লোক জন্মাবে দুই সন্তান নীতি গ্রহণ করার কারণে। চীনের একসন্তান নীতি পৃথিবীর কোথাও না দেখা গেলেও দুই সন্তান নীতিটি বিশ্বের অনেক দেশেই বাস্তবায়ন করেছিল। এমনকি মুসলিম দেশও তা গ্রহণ করেছিল। ১৯৭০ সালে হংকং, ১৯৯০ হতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ইরান, ২০১২ হতে যুক্তরাজ্য এক ধরনের দুই সন্তান নীতি গ্রহণ করেছিল। এছাড়াও ভিয়েতনাম প্রায় ৫০ বছর ধরে ১৯৬০ সাল হতে ‘এক বা দুই সন্তান’ নীতি গ্রহণ করেছিল। এছাড়াও বাংলাদেশ, ভারত, নাইজেরিয়া, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক জনবহুল দেশও ব্যাপকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছিল আশির দশক হতে। বর্তমানে এইসব উদ্যোগের অনেকটাই ভাটা পড়েছে বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর পেছনে যেমন অনেকটাই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সহনীয় ও স্থিতি অবস্থা দায়ী, ঠিক তেমনি চীনের একসন্তান নীতির নেতিবাচক দিকও দায়ী। কেননা জনসংখ্যার ঘনত্ব কম (১৪৮ জন প্রতি বর্গকিলোমিটার) হওয়া সত্ত্বেও চীন একসন্তান নীতি গ্রহণ করেছিল। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিকাশের কারণে চীনে জনশক্তিতে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে যার একমাত্র কারণ হিসেবে একসন্তান নীতিকেই দুষছেন সবাই।

অন্যদিকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর নীতির বিপরীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উদার নীতিও গ্রহণ করেছে অনেক দেশ মূলত যাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক পর্যায়ে পৌছেছে, যেমন জাপান, ইটালি, পোল্যান্ড, কিউবা, গ্রিস, পর্তুগালসহ বহু এমন দেশ রয়েছে। আবার এসব দেশের অধিকাংশ দেশ আশুপদক্ষেপ গ্রহণ করেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি বাড়াতে পারছে না। এক হিসাব মতে জাপানের জনসংখ্যা বর্তমানে ১২ দশমিক ৭ কোটি হতে কমতে কমতে ৮ দশমিক ৩ কোটিতে দাঁড়াতে পারে ২১০০ সাল নাগাদ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সূত্রমতে যে সকল দেশ বর্তমানে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, তাদের জনসংখ্যা এক সময় কমতে শুরু করবে এবং বেশকিছু বছর পর উপরোক্ত দেশগুলির মতে কমতে শুরু করবে। যেমন চীনের জনসংখ্যা ২০৫০ সালের পর কমতে শুরু করবে এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বজনসংখ্যার বৃদ্ধি, এইসব দেশগুলির জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি ও প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। এক হিসাব মতে বিশ্বজনসংখ্যা বর্তমানে ৭৭০ কোটি হতে আগামী ৩০ বছরে বেড়ে ৯৭০ কোটিতে দাঁড়াতে পারে এবং ২১০০ সাল নাগাদ তা ১১০০ কোটিতে উন্নীত হতে পারে। অর্থাৎ ২০৫০ সালের পরে বিশ্বজনসংখ্যা বৃদ্ধির কিছুটা স্লথগতি শুরু হবে। জনসংখ্যার এই বৃদ্ধির সহজাত কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের প্রত্যাশিত আয়ু ও প্রজনন হার দুটোই বৃদ্ধি পাওয়া। প্রত্যাশিত আয়ু ও প্রজনন হার একেবারেই কম ছিল শত সহস্র বছর আগে। প্রায় ১২ মিলিয়ন বছর আগে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ৪০ লাখ যা বর্তমানে লন্ডন শহরের বর্তমান জনসংখ্যার অর্ধেক। এমনকি ১৮০০ সালে জনসংখ্যা ছিল ১০০ কোটি যা বর্তমানে প্রায় আটগুণ বেড়ে গিয়েছে ২০০ বছরের ব্যবধানে। পৃথিবীতে কত মানুষের জন্ম হয়েছিল এই প্রশ্নের উত্তরে জনসংখ্যার বৃদ্ধির তত্ব গবেষণা করে যেটা জানা যায় তা থেকে বলা যায় এ পর্যন্ত ১০ হাজার আটশত কোটি মানুষের জন্ম হয়েছিল এই পৃথিবীর বুকে।

এখন হতে ২০৫০ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে যে সকল দেশ সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে তার প্রথম নয়টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থাকবে না। এই নয়টি দেশ একত্রে প্রায় ১০০ কোটি অতিরিক্ত লোক যোগ করবে। দেশগুলি হলো ভারত, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো, ইথিওপিয়া, তানজানিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিশর ও যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের অবদান সবচেয়ে বেশি থাকবে কেননা ভারতের জনসংখ্যা ২০২৭ সালে চীনের জনসংখ্যাকেও অতিক্রম করবে। বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যা প্রজনন হার ২ দশমিক ৫ যা ২০৫০ সাল নাগাদ ২ দশমিক ২ এ নেমে আসবে। প্রজনন হার ২ দশমিক ১ মতান্তরে ২ হলে জনসংখ্যা স্থীতি অবস্থায় থাকে, ফলে বিশ্বের জনসংখ্যাও একসময় স্থীতি অবস্থায় যাবে এমনটি বলা যায়। এক পরিসংখ্যান মতে ২০১০ সালে এক বা তার চেয়েও বেশি শতাংশ জনসংখ্যা কমিয়েছে এমন দেশের সংখ্যা ছিল ২৭ যা ২০৫০ সাল নাগাদ তা বেড়ে গিয়ে হবে ৫৫। প্রত্যাশিত আয়ু বাড়ার কারণে জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটে তুলনামূলক বেশি ধনী ও উন্নত দেশগুলির মধ্যে। কারণ বিশ্বের বর্তমানে প্রত্যাশিত আয়ু ৭২ দশমিক ৬ বছর যা বাংলাদেশের সমান এবং যা আবার গরিব দেশগুলোর মধ্যে ৬৫ বছর। ফলে ভবিষ্যতে বিশ্বে বয়স্ক (৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে) মানুষের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে প্রতি ১১ জনে একজন বয়স্ক লোক পাওয়া যায়, যা ২০৫০ সাল নাগাদ প্রতি ছয়জনে একজনে পরিণত হবে। ৮০ বছরের উপরে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বর্তমানে যা আছে তা ২০৫০ সাল নাগাদ তিনগুণ বেড়ে যাবে। নিম্ন প্রজনন হারের কারণে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি অনেক দেশের অর্থনীতিতে গ্রহণযোগ্য বোঝা হিসেবে ইতোমধ্যেই দেখা দিচ্ছে। ফলে শুধুমাত্র সঠিক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে বয়স্ক মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যাকে সহজে যেভাবে মোকাবেলা করা যাবে ঠিক একইভাবে জনসংখ্যার আধিক্য থাকলে জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে সহজে ওই সমস্ত দেশগুলিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বজায় রাখা দেশগুলির জন্য আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, ফলিত পরিসংখ্যান 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন