মঙ্গলবার | আগস্ট ১১, ২০২০ | ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭

শিল্প বাণিজ্য

বেনাপোলে এক বছরে আমদানি কমেছে ৫৮ হাজার ৩২৫ টন

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি

আবদুল কাদের যশোর

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আগের অর্থবছরের তুলনায় সদ্য শেষ হওয়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫৮ হাজার ৩২৫ টন পণ্য আমদানি কমেছে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। কাস্টমস কর্মকর্তারা করোনার প্রভাবকে দায়ী করলেও আগে থেকেই বন্দরটি দিয়ে আমদানি কমতে থাকে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাস্টমের নানামুখী হয়রানি আর বন্দরের অবকাঠামোগত সমস্যার জন্য আমদানিকারকরা বেনাপোল থেকে সরে আসছেন।

বেনাপোল কাস্টম অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ১৭ লাখ ৭৮ হাজার ৬২৮ টন বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে। যেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৩৬ হাজার ৯৫৩ টন পণ্য। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানি হয় ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯৭ দশমিক ৯৩ টন।

অন্যদিকে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টম হাউজ থেকে ভারত হতে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর প্রাথমিকভাবে হাজার ২৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে এটির পরিমাণ দাঁড়ায় হাজার ৯৯৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তবে সময় লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আদায় করে মাত্র হাজার ৫৩৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এখানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে হাজার ৪৫৮ কোটি ১২ লাখ টাকা।

এর আগেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টম হাউজে হাজার ১৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি ছিল। ওই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। আদায় হয়েছিল হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল হাজার ১৯৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছিল হাজার ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। সেবারও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ১৭৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, কম শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি হলে রাজস্ব কমবে এটা স্বাভাবিক। কাস্টমের জটিলতার কারণে গাড়ির চেসিস, মোটরপার্টসসহ শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি কমে গেছে। আবার নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে তিন মাস আমদানি-রফতানি হয়নি। যে কারণে বাণিজ্য কার্যক্রমে পিছিয়ে পড়ছে বেনাপোল।

বেনাপোল আমদানি-রফতানি সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, দিন দিন আমদানি পণ্যের ওপর অযৌক্তিক হারে শুল্ককর বাড়ছে। এতে বৈধভাবে আমদানি কমে বাড়ছে শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে পণ্য পাচার। শুল্কহার স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা হলে বৈধ পথে আমদানি বাড়বে। এতে বাড়বে রাজস্ব আয়। তবে এবার করোনার কারণে আমদানি কমে গেছে।

যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, বেনাপোল বৃহৎ বন্দর হলেও এর কোনো সুফল আমরা পাচ্ছি না। বাণিজ্য প্রসার করতে হলে বৈধ সুবিধা অবকাঠামো উন্নয়নের বিকল্প নেই। বাণিজ্য প্রসার করতে হলে বেনাপোলে সব ধরনের হয়রানি মুক্ত করা প্রয়োজন। করোনার কারণে আমদানি কমে গেছে। কিন্তু গেল অর্থবছরের শুরু থেকে বেনাপোল দিয়ে সব ধরনের আমদানি কমতে শুরু করে। যে কারণে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি নেমে এসেছে।

ব্যাপারে বেনাপোল কাস্টম হাউজের অতিরিক্ত কমিশনার সৈয়দ নিয়ামুল ইসলাম জানান, কয়েক বছর ধরে বেনাপোল দিয়ে কম শুল্কযুক্ত পণ্য বেশি আমদানি হওয়ার কারণে রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। তার ওপর করোনার ধাক্কা লেগেছে। বন্দরটি সচল থাকলে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয় বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।  

এদিকে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের জন্য নির্ধারিত পণ্যাগার ভাড়ায় ধস নেমেছে। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে পণ্যাগার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯৫ কোটি লাখ টাকা। তার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ কোটি লাখ টাকার রাজস্ব কম আদায় হয়েছে।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, ভারত থেকে আমদানীকৃত পণ্য প্রথম অবস্থায় বেনাপোল বন্দরের ওয়্যারহাউজে (পণ্যাগারে) রাখা হয়। সময় ওইসব আমদানি পণ্য রক্ষণাবেক্ষণ পণ্যাগার ভাড়া বাবদ বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নির্ধারিত পরিমাণে রাজস্ব আদায় করে থাকে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান জানান, বেনাপোল বন্দরের বর্তমান ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০ হাজার টন। তবে এখানে সবসময় পণ্য থাকে প্রায় দেড় লাখ টন। চাহিদার অনুপাতে জায়গা না থাকায় ভারত থেকে আমদানীকৃত মূল্যবান সামগ্রী রাখতে হয় খোলা আকাশের নিচে। এতে সুবিধাবঞ্চিত হয়ে অনেক ব্যবসায়ী বন্দর ছেড়ে বাণিজ্য করছেন অন্য বন্দরে। ফলে বন্দর কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জন ব্যর্থ হচ্ছে।

বেনাপোল আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সভাপতি মহসিন মিলন বলেন, পথে রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন বাড়াতে হবে। এছাড়া বন্দরে বারবার রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অনেক ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো ক্ষতিপূরণ না দেয়ায় তারা বন্দর ছেড়েছেন।

বেনাপোল বন্দর পরিচালক (ট্রাফিক) আব্দুল জলিল বলেন, করোনার কারণে প্রায় আড়াই মাস ধরে আমদানি বন্ধ ছিল। এজন্য রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। আর এরই মধ্যে বেনাপোল বন্দরে অনেক অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। এছাড়া আরো যে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে বন্দরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, বন্দরের চারদিকে উঁচু প্রাচীর নির্মাণ এবং নতুন জায়গা অধিগ্রহণ। এসব উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হলে বেনাপোল বন্দর বিশ্বের কাছে একটি আধুনিক বন্দর হিসেবে পরিচিতি পাবে। তখন আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজস্বও বাড়বে।

উল্লেখ্য, দেশে স্থলপথে যে পণ্য আমদানি হয়, তার ৭০ শতাংশ হয়ে থাকে বেনাপোল বন্দর দিয়ে। প্রতি বছর বন্দর দিয়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়, যা থেকে সরকার প্রায় হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। আমদানি পণ্যের মধ্যে শিল্প-কারখানার কাঁচামাল, গার্মেন্ট, তৈরি পোশাক, কেমিক্যাল বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী রয়েছে। তবে পথে আমদানি কমলেও দিন দিন বাড়ছে রফতানি বাণিজ্য। বন্দর দিয়ে ভারতে প্রায় হাজার কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন পণ্য রফতানি হয়। রফতানি পণ্যের মধ্যে পাট পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, কেমিক্যাল, টিস্যু, চালের কুঁড়া, মেহগনি ফল, মাছ, অক্সিজেনসহ প্রায় ৩০ প্রকারের পণ্য রয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন