মঙ্গলবার | আগস্ট ১১, ২০২০ | ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭

ফিচার

মানুষের জীবন রক্ষায় নীল রক্ত দিয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ রাজকাঁকড়া

বণিক বার্তা অনলাইন

১০টি চোখ, শরীরের উপরে শক্ত আবরণ আর ছোট্ট লেজবিশিষ্ট প্রাণী। তাদের প্রজাতিটি পৃথিবীতে বিচরণ করছে ৩০ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে। আর মানবজাতি প্রাণঘাতী রোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে যুগ যুগ ধরে ব্যবহার করছে এই শক্ত খোলসবিশিষ্ট সামুদ্রিক প্রাণিটির ফ্যাকাশে নীল রক্ত!

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো শোনালেও, এটি কিন্তু বেশ পুরনো বিজ্ঞান। এই প্রাণিটিকে বলা হয় হয় ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’। সম্ভবত প্রজাতির বয়সের কারণেই। এটি পরিচিত রাজকাঁকড়া (হর্সহো ক্র্যাব) নামে। 

আবিষ্কৃত ওষুধ  মানুষের শরীরের জন্য কতোটা নিরাপদ তা যাচাই করতে ব্যবহার করা হয় রাজকাঁকড়ার রক্ত। কয়েক দশক ধরেই এটি হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিকল্প রাসায়নিক ইউরোপে ব্যবহৃত হলেও যুক্তরাষ্ট্রে সেটি এখনো ততোটা আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ তৈরির গবেষণাগারগুলোতে প্রতি বছর বিপুল পরিমানে এই নীল রক্তের প্রয়োজন হয়। 

প্রতি বছর লাখ লাখ রাজকাঁকড়া ধরে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গবেষণাগারে। সেখানে কাঁকড়াগুলোর ঠিক হৃৎপিণ্ডের কাছের একটি শিরা কেটে বের করে নেয়া হয় কিছুটা রক্ত। এরপর আবার সেটিকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়া হয়। 

চলমান নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর সময় নতুন করে প্রাসঙ্গিক ও অপরিহায হয়ে উঠেছে রাজকাঁকড়ার নীল রক্ত। 

সুনির্দিষ্ট রোগের জন্য তৈরি ওষুধে কোনো বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া আছে কিনা- তা যাচাই করতেই রাজকাঁকড়ার রক্তের প্রয়োজন হয়। এগুলো এমন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যা খুবই সামান্য পরিমাণেও মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে। রাজকাঁকড়ার রক্ত এই যাচাইয়ের কাজটি নিখুঁতভাবে করতে পারে। কারণ, এই রক্ত সামান্য উপাদানগত পরিবর্তনে দৃশ্যমান বড় প্রতিক্রিয়া দেখায়।

এখন যে উপাদান দিয়ে এই যাচাইয়ের কাজটি করা সম্ভব তার মধ্যে রাজকাঁকড়ার রক্তই একমাত্র বস্তু, যা মানুষ পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় পেতে পারে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবগুলো এই নীল রক্তের ওপর আজও নির্ভরশীল।

কিন্তু এখন উঠতে শুরু করেছে, প্রতি বছর এভাবে লাখ লাখ কাঁকড়া ধরা হচ্ছে এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে যেভাবে ক্ষত তৈরি করা হচ্ছে তাতে রাজকাঁকড়ার সংখ্যা আসলে এখন কতো? রক্ত সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি তাদের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে। প্রকৃতিতে স্বাধীনভাবে বিচরণকারী প্রাণির অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলছেন, রাজকাঁকড়ার রক্তদোহন বন্ধ করা হোক। 

এ পদ্ধতিটি যখন ব্যবহার শুরু হয় তখন প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন, রক্ত-দোহনের পর প্রায় সমস্ত কাঁকড়াই বেঁচে যায়। তবে সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, এর কারণে ৩০ শতাংশ কাঁকড়া মারা যায়। অন্য গবেষণায় বলা হয়েছে, এ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়া নারী কাঁকড়াগুলো আর কখনোই সঙ্গম না করার সম্ভাবনা প্রবল।

যুক্তরাষ্ট্রে নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক একটি দলের প্রধান ডা. বারবারা ব্রুমার। তিনি বলেন, এখানে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ রাজকাঁকড়ার রক্ত-দোহন করা হয়। রক্ত নেয়ার পর যখন প্রকৃতিতে এদের জীবিত ছেড়ে দেয়া হয়, তার পরে সেগুলোর জীবনে কী প্রভাব ফেলে- তা কেউ জানে না। 

আমেরিকান রাজকাঁকড়াকে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রায়-বিপন্ন প্রজাতির কাছাকাছি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ওষুধ প্রস্তুতকারী বড় বড় সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, রাজকাঁকড়ার সংখ্যা কয়েক বছর ধরে মোটামুটি একই রকম আছে। 

রাজকাঁকড়ার রক্তের বিকল্প খুঁজতে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। এমন একটি বিকল্প দিয়ে ওষুধ পরীক্ষা করা ইউরোপে ২০১৬ সালে অনুমোদনও পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সংস্থাও এতে যুক্ত হয়েছে।

তবে আমেরিকান ওষুধ নিরাপদ কিনা তা যাচাই করতে কী ব্যবহার করা হবে সেটি যারা নির্ধারণ করে সেই সংস্থা জানিয়েছে, বিকল্প উপায়গুলো যথেষ্ট পরিমাণে কার্যকরী কিনা তা তারা প্রমাণ করতে সক্ষম নন। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ বিক্রি করতে হলে সব সংস্থাকে ওষুধ পরীক্ষার জন্য রাজকাঁকড়ার রক্তের ব্যবহার চালিয়ে যেতে হবে। 

এর মানে হলো, কেউ যদি যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন মানুষের দেহে প্রয়োগ করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই পুরনো উপায়েই পরীক্ষা করতে হবে। কিছু ওষুধ সংস্থা বলছে, তারা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম কাঁকড়া থেকে রক্ত নিয়ে কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন পরীক্ষা করতে পারে। 

যেহেতু অন্যান্য দেশে বিকল্প উপায়ে ওষুধ বা ভ্যাকসিন পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেহেতু বিকল্প উপায় খুঁজে দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানাচ্ছেন ডা. বারবারা। তিনি বলেন, এখানে অন্তত ৩০টি সংস্থা কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে এবং তাদের প্রত্যেককেই এই পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। সুতরাং আমার উদ্বেগের বিষয় হলো রাজকাঁকড়ার সংখ্যা নিয়ে, কারণ তারা বাস্তুতন্ত্রের মূল একটি অংশ। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের প্রাকৃতিক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।

বিবিসি অবলম্বনে

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন