বৃহস্পতিবার | আগস্ট ০৬, ২০২০ | ২১ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

বিনোদনে বিনোদন ক্ষয়

সৈয়দ রাইয়ান আমীর

হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ ২০১২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ইস্যুতে পিটার স্টারন্সের ‘দি হিস্টরি অফ হ্যাপিনেস’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশ করে যেখানে  তিনি সুখ সম্পর্কিত খানিক ইতিহাস তুলে ধরেন যার একটি অংশে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সুখের ধারণার ব্যবহার সম্পর্কে  কিঞ্চিত আলোচনা পাওয়া যায়। সুখী-সুখী ভাব দেখানো বা সুখের বহিঃপ্রকাশ অনেক কাল যাবৎ সামাজিক বা সাংস্কৃতিকভাবে অনেক দেশে বিশেষ করে পূর্ব এশিয়া, রাশিয়াসহ কিছু অঞ্চলে ব্যক্তিত্বের ঘাটতি হিসেবে দেখা হতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার পরপর নতুনভাবে তার পরিচয় প্রকাশের জন্য সুখের প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণকে একটি পথ হিসেবে বেছে নেয়। তখন থেকেই দেখা যায় বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে খুশি থাকার কথা বলা হচ্ছে বা তাদের পণ্য কিভাবে মানুষকে আনন্দ দেবে বা খুশি রাখবে তার রঙচঙে প্রকাশ। এই ধরনের আলাপের সঠিক বাস্তবতা নিরূপণ সব সময় বেশ কষ্টসাধ্য কেননা এত আগে মানুষের পার্সোনালিটি ট্রেইট বা অন্য কোন ব্যক্তিত্ব নির্ধারক পরীক্ষা বেশ জটিল। তবে এই লেখার অংশবিশেষ সুখকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক প্রচারণায় ডিসনির ভূমিকা  নিয়ে যে  আলোকপাত সূচনা করে তার প্রমাণ পাওয়াটা কঠিন নয় যেমন কোকাকোলার অনেকগুলো বিজ্ঞাপনের একটি বলতো ‘Open happiness’।

কভিড-১৯ এর কারণে ঘরে থাকার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে সেখানে এই ঘরবন্দীকালীন অবস্থায় বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ও অন্যান্য বিনোদনমূলক অনলাইন প্লাটফর্ম বেশ সাহায্য করেছে বললে ভুল হবে না বরং কিছু ক্ষেত্রে গৃহবন্দী জনপদে এটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে বিনোদন আহরণের মাধ্যম হিসেবে। আর বিনোদনের মুখ্য উদ্দেশ্য আনন্দ লাভ বললে খুব ভুল হবে না মনে হয়।

সমস্যাটা দেখা দিয়েছে মানুষের ঘরে থাকার সময় এর ব্যপ্তি নিয়ে কেননা করোনার দ্বরুন এই ঘরে থাকার সময়ের  শেষ ঠিক কোথায় তা বোঝা বেশ মুশকিল হয়ে দাড়িয়েছে আর এখানেই আজকের আলোচনার মূল বক্তব্য ভিত্তি গেড়েছে। 

সাধারণ অবস্থায় সুখানুভূতির জন্য যে নিউরোট্রান্সমিটারকে দায়ী করা হয় তার নাম ডোপামিন। জর্ডান পিটারসনের মতে এর নিঃসরণ আনন্দ ও পুরস্কার এর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। অতিরিক্ত ডোপামিন নিঃসরণ স্কিতজোফ্রেনিয়া এবং এর অভাবে পারকিনসন্স রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। ডোপামিনের নিঃসরণ আনন্দ পাবার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে তোলে, লক্ষণীয় যে আনন্দ বাড়িয়ে তোলার চেয়ে এর আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে তোলা এর কাজ। যেহেতু পুরস্কার লাভের সাথে এর সরাসরি সম্পর্ক তাই তাৎক্ষণিক আনন্দ যেসব কাজে বেশি পাওয়া যায় সেসব কাজের দিকে আমাদের মস্তিষ্ককে ধাবিত করা এর একটি লক্ষ্য। কোন কাজ তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন তাৎক্ষণিক আনন্দ বা সুখানুভূতি যদি তা  তৈরি করতে না পারে তবে আমাদের মস্তিষ্ক সেই দিকে  কম ধাবমান হয় এবং এর জন্য মূলত এই ডোপামিন দায়ী। রবিন শর্মা এর জন্যই সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ শারীরিক ব্যায়ামের কথা বলেন কেননা এতে মস্তিষ্ক ডোপামিন নিঃসরণ করে এবং সকাল সকাল খুশি খুশি ভাব নিয়ে দিনের অন্যান্য কাজ শুরু করা যায়। এরিস্টিপ্পাস প্রবর্তিত সাইরেনাইক দর্শন মানসিক প্রশান্তির থেকে দৈহিক প্রশান্তিকে অধিক গুরুত্ব দিতেন এবং সর্বাধিক আনন্দ যুক্ত কাজের দিকে ধাবিত হওয়ার কথা বলতেন যেখানে অন্যান্য দুর্ভোগ থেকে দূরে থাকার প্রবণতা লক্ষণীয়। তবে অধিক নিঃসরণ মনোযোগের অভাব, অস্থিরতাসহ নানা বিধ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। আনন্দদায়ক কাজ যদি তা গুরুত্বপূর্ণ না হয়ে থাকে এবং এতে যদি কেউ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তবে তা তার উৎপাদনমূলক অন্যান্য কার্যকলাপে বাধা সৃষ্টি করতে পারে কেননা আনন্দ বিহীন কাজ (হয়তো ভবিষ্যতের জন্য আনন্দ বয়ে আনবে) করা তার জন্য কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়ায় তার এতে অনভ্যস্তার তার জন্য। অর্থনীতিতে বিষয়টিকে উপযোগিতার সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায়। 

২০২০ সালের প্রথম তিন মাসে টুইটার গ্রাহকসংখ্যা ছিল ১৬৪ মিলিয়ন যা গত বছরের চেয়ে ২৩ শতাংশ বেশি। জে পি মরগানের এক গবেষণায় দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেবল চালিত সংবাদমাধ্যমগুলো দ্বিগুণ রেটিং পেয়েছে গত কয়েক মাসে। নিউইয়র্ক টাইমসের সাবস্ক্রাইব বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া ইকুইটি রিসার্চ প্রধান আলেক্সিয়া কোয়াদ্রানি বলেন গত বছরের তুলনায় এবছর এখন পর্যন্ত প্রচার মাধ্যমগুলো রেটিংএ ১০ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি দেখতে পেরেছে। ডগ আন্মুথ, যিনি জে পি মরগান ইন্টারনেট ইকুইটি রিসার্চ এর প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন, মনে করেন যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার আমরা এবছর দেখতে পাবো। ভাইরাস কবলিত অঞ্চলগুলোয় ফেসবুক মেসেঞ্জার এর ব্যবহারে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ইতালিতে ভাইরাস কবলিত অঞ্চলগুলোয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে যেখানে গ্রুপ কলিং বৃদ্ধি পেয়েছে ১০০০ শতাংশ।

স্ন্যাপ এর ব্যবহার দৈনিক ১১ মিলিয়ন বৃদ্ধিতে গড়ে ২২৯  মিলিয়নে পৌঁছেছে। বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ জানুয়ারির শেষ সপ্তাহের চেয়ে মার্চের শেষ সপ্তাহে ৩০ শতাংশ বেড়েছে এমনটাই মনে করছেন জেপি মরগানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান। স্ন্যাপে কোভিড ১৯ সম্পর্কিত কনটেন্টের দর্শক বেড়েছে প্রায় ৬৮ মিলিয়ন। 

ভেরিজন দাবি করেছে তাদের ভিডিও স্ট্রিমিং বেড়েছে ১২ শতাংশ। এনবিসি এবং এইচবিও সামনের মাসগুলোতে নতুন কিছু নিয়ে আসার প্রচারণায় ব্যস্ত। আলেক্সিয়া কোয়াদ্রানি বলেন যে ইতিহাসে আর কখনো এত অধিক পরিমাণ মৌলিক কনটেন্ট এসব স্ট্রিমিং সাইটগুলোতে আসেনি এবং সামনের মাসগুলোতে এগুলোর সাবস্ক্রিপশন ও ব্যবহার আরো বৃদ্ধি পাবে। 

২০১৯ সালে ভায়াকম প্লুটো টিভি অধিগ্রহণ করে। এ বছরের শুরুতে কমকাস্ট জুমো অধিগ্রহণ করে এবং ফক্স ঘোষণা দেয় যে এটি টুবি অধিগ্রহণ করতে যাচ্ছে। অধিগ্রহণের আওতায় পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সবই  ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট এবং অধিগ্রহণ করা বা করতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ প্রভাবশালী মিডিয়া কেন্দ্রিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে মানুষের ঘরে থাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্যবসায় এসব বড় প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িত হতে চায়, কেন চায় তা পরবর্তী তথ্যগুলো খেয়াল করলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে ধারণা করা যায়। বর্তমানে এবং করোনা পরবর্তী সময় এদের তৈরিকৃত নতুন ভিডিওগুলো কি হবে তা নির্ধারিত হবে মূলত মানুষ কি চাচ্ছে বা তার চাহিদা কোন দিকে যাচ্ছে তার উপর অবশ্য নতুনত্ব তৈরি করা বা তা সম্প্রচারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। 

বছরের প্রথম কোয়ার্টারে নেটফ্লিক্সের নতুন সাবস্ক্রিপশন হয়েছে ১৫ দশমিক ৮  মিলিয়ন- জে পি মরগানের ৮ দশমিক ৮ মিলিয়নের পূর্বানুমান কে ভুল প্রমাণ করে। উল্লেখ্য গত বছর নেটফ্লিক্সের বাংলাদেশ থেকে আয় প্রায় ২১ মিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালের প্রথমার্ধে তাদের আয় ৭০৯ দশমিক ০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যেখানে ২০১৯  এ তাদের আয় ছিল ১ হাজার ৮৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। 

পিডব্লিউসি এর ২০১৮ সালের এক  রিপোর্ট অনুযায়ী মিডিয়া এবং বিনোদন জগতের আয় ২০২১  সাল নাগাদ ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে উপনীত হতে পারে। 

যদিও সঙ্গীত সম্পর্কিত বাণিজ্য থেকে সঙ্গীতজ্ঞগন  মাত্র ১২  শতাংশ আয় করেছিলেন  এর ব্যবসা ২০১৭  সালে ছিল ৪৩  বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। সমান পরিমাণ অর্থ ২০০৬ সালে ছিল তখনকার সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ আয়। 

অডিও ভিজুয়াল বিনোদনের কারণে বেতার যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৮ সালের আয় করেছিল ২০ বিলিয়ন ডলার সেখানে ২০১৮ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ১১ হাজার ৫০০ বেতার কেন্দ্রের সামষ্টিক আয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৭টি প্রধান স্টুডিও তাদের মোট আয়ের ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ডিসনি, এনবিসি ইউনিভার্সাল, টাইম ওয়ার্নার, টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফক্স এবং সনি যথাক্রমে ১৮ দশমিক ২, ১৬ দশমিক ৪, ১৬ দশমিক ২, ১২ দশমিক ৯ এবং ১২ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ন্ত্রন করে। মার্কিন চলচ্চিত্র ২০১৭ সালে ৪৩ দশমিক ৪ বিলিওন মার্কিন ডলার লাভ করে যার মাত্র ১৮ শতাংশ কর্মীদের জন্য ব্যায় করা হয়।

অনলাইন প্লাটফর্মগুলোর জন্য ডিভিডি সম্পর্কিত আয় ২০০৬ থেকে ২০১৬ তে ২৫ বিলিয়ন থেকে কমে ১২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। 

৩ হাজার ৮৪৬ টি চলচ্চিত্র বিষয়ক নতুন প্রজেক্ট ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গৃহীত হয় যা ৬৬ দশমিক ৪  মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে যেখানে সফলতার হার ছিল ৩৭ শতাংশ। 

ক্রাউড ফান্ডিং এর ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ চলে যায় সঙ্গীত এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে যেখানে ৪১ দশমিক ৪  শতাংশ নতুন উদ্যোক্তা ও অন্যান্য ব্যবসার জন্য ব্যবহৃত হয়। 

বর্তমানে ভিডিও স্ট্রিমিংএ ব্যবহৃত হয় প্রায় ৩০ হাজার পেটাবাইট (১ পেটাবাইট= ১০২৪ টেরাবাইট) যা ২০২১ সাল নাগাদ দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ইউটিউব দাবি করে প্রতিবছর তাদের ভিডিও দেখার হার বাড়ে প্রায় ১০০ শতাংশ। ২০১৯ সালে সকল ধরনের ইন্টারনেট ব্যবহারের ৮০  শতাংশ ছিল ভিডিও স্ট্রিমিং। 

ধারণা করা হয়, কভিড ১৯ এর ফলে বৈশ্বিক চলচ্চিত্রাঙ্গনে ৫  বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি নেমে আসতে পারে। এ ধরনের ক্ষতির কথা মাথায় রেখেই জেমস বন্ড সিরিজের নতুন সিনেমার মুক্তির দিন মার্চ মাস থেকে পিছিয়ে নভেম্বর মাসে নিয়ে যাওয়া হয়।

ফিনান্সিয়াল টাইমস এর মতে চীনে কোয়ারেন্টাইন এবং লকডাউন এর ফলে ফেব্রুয়ারি মাসে অ্যাপস ডাউনলোড ২০১৯ সালের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি ছিল। একই সময় অ্যাপেলের গেমস ডাউনলোড বাড়ে  প্রায় ৮০ শতাংশ। নিয়েলসেন ডাটার টেলিভিশন দেখার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এই সময় যেখানে অন্যান্য বছরের একই সময়ে তা কমতে থাকে কেননা লুনার নিউ ইয়ারের কারণে মানুষ বেশি বেড়াতে বের হয়। 

অনলাইনে পত্রিকা পড়ার অভ্যাসও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এই সময় যা পত্রিকাগুলোকে সংকটে ফেলে দিয়েছে কেননা সংবাদ সরবরাহের মাধ্যমে তাদের ধরে রাখা এবং সাথে সাথে বিজ্ঞাপন জোগাড় করা দুটো একসাথে বেশ কষ্টসাধ্য যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো এই করোনা কালীন সময় অন্যান্য সময়ের চেয়ে কম ব্যয় করছে। 

ফেব্রুয়ারি মাসে ‘করোনাভাইরাস’ শব্দটি পাবলিশারদের জন্য পছন্দের তালিকায় দ্বিতীয় ছিল। স্পষ্টত নিজের কনটেন্ট পাঠক জনপ্রিয়তার তালিকায় শীর্ষে রাখার জন্য এই শব্দ গুচ্ছটির অধিক ব্যবহার লক্ষণীয়। 

চীনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর করা এক গবেষণা দেখা গিয়েছে যে ১৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের বিজ্ঞাপন অফলাইন থেকে অনলাইনে নিয়ে গিয়েছে।

বিশ্বব্যাপী ডিসনির আয় ৩৪ শতাংশ এসে থাকে এর থিম পার্কগুলো থেকে আরো ৮ শতাংশ এসে থাকে ভোগ্যপণ্য থেকে। ওড়নার কারণে থিম পার্ক গুলো জনশূন্য হয়ে পড়ায় এর আয় যে হ্রাস লক্ষ্য করা যাবে তা পুষিয়ে নিতে অনলাইন কনটেন্টের উপর জোর দেওয়াটা এর জন্য ভালো একটি পথ হতে পারে। 

বাজার গবেষণা সংস্থা ওয়ানপোল এর মতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিডিও স্ট্রিমিং এর হার দ্বিগুণ হয়েছে এই করোনা কালীন সময়ে যা ৪ ঘণ্টা থেকে পৌঁছেছে ৮ ঘণ্টায়। অন্তত একটি স্ট্রিমিং কারণ যার সাথে জড়িত দুই হাজার মানুষের উপর গবেষণা করে এই ফলাফল দেওয়া হয়। প্রতি ৪ জনের ৩ জন একের অধিক স্ট্রিমিং সার্ভিস ব্যবহার করছেন করোনার শুরু থেকে। ৩৮ শতাংশ মার্কিনি ৫ বা এর অধিক স্ট্রিমিং সার্ভিস ব্যবহার করছেন যেখানে অধিকাংশ চারটি বা তার অধিক সাইটে লগইন করে থাকেন।

অ্যাপেল টিভি প্লাস, কুইবি, সিবিএসসহ আরো কয়েকটি সাইট বিনামূল্যে সাবস্ক্রিপশন দিচ্ছে কিছু নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে যাতে করে তারা গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে  অন্যান্য সাইট গুলোর থেকে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পায়। কুইবি এপ্রিল মাসে এর প্রতিষ্ঠার  সাত দিনের ভেতর ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডাউনলোড পেয়ে যায়। স্ট্রিমিং সাইট রকু  ধারণা করে যে এ বছরের প্রথমার্ধে স্ট্রিমিং আমার হতে পারে ১৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘণ্টা পূর্বের বছরের তুলনায় ৪৯ শতাংশ বেশি। তারা আরো আশা করে যে ডিসেম্বর নাগাদ তাদের অ্যাক্টিভ একাউন্ট সংখ্যায় আরও ৩ মিলিয়ন নতুন অ্যাকাউন্ট যোগ হবে। স্ট্রিমিং বাণিজ্য এত অধিক পরিমাণ আয়ের পথ দেখাচ্ছে যে  ধারণা করা হচ্ছে এ বছরের শেষ নাগাদ ফক্স কর্পোরেশন ৪৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময় টুবি অধিগ্রহণ করতে যাচ্ছে।

রিকারলি ইনকরপোরেশনের মতে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে নেটফ্লিক্সের সাবস্ক্রিপশন ৩২ শতাংশ বেড়ে যায়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইডিও এর মতে করোনা ভাইরাস আক্রমণের পর থেকে নতুন সাবস্ক্রাইবারের ২৯ শতাংশ ডিসনি প্লাস, ২১ শতাংশ হুলু এবং ১৫ শতাংশ নেটফ্লিক্সকে বেছে নেয়। ১০ শতাংশের কিছু কম অ্যাপেল প্লাসে যোগ দেয়। এইচবিও ম্যাক্সও উল্লেখযোগ্য কেননা তারাও বিনামূল্যে কিছু ট্রায়ালের মাধ্যমে বেশ সাড়া ফেলতে পেরেছে। 

ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলে অনলাইন প্লাটফর্মগুলোর এরকম আগ্রাসী বিপণন পরিকল্পনা দর্শকদের  বিনোদনের উপরে প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয়। এত অধিক সময় ধরে অনলাইন প্লাটফর্মে ভিডিও দেখা বা অন্যান্য কারণে অনলাইন প্লাটফর্মে ব্যস্ত থাকায় প্রথমে উল্লেখ করা ডোপামিনের প্রভাব বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এত অধিক সময় ধরে এই প্লাটফর্মগুলোয় ব্যস্ত থাকলে স্বাভাবিকভাবেই আপাত বিনোদনের মাধ্যম গুলোর উপর অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে যেতে পারে যখন বিনোদনের জন্য এগুলোর উপযোগিতার হ্রাস দৃশ্যমান হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তৈরি করতে হবে নতুন নতুন কনটেন্ট যার বিষয়বস্তু পূর্বের তুলনায় আরও অধিক আনন্দদায়ক বা কিছু ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে তা মানুষের মানসিক জগতের ঠিক কি রকম প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে গবেষণার বিস্তর পরিধি রয়েছে বলে মনে হয়। বিনোদন যদি দিনের অধিকাংশ সময়ের  স্থান দখল করে নেয় তাহলে করোনা পরবর্তী সময় এই অভ্যাস মানুষের বিনোদন জগতে কি ধরনের প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে মনে হয় কাজ হওয়া উচিত। কেননা মাদক গ্রহণ যে ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে তার কাছাকাছি ধরনের সমস্যা এক্ষেত্রে তৈরি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। 

এত বড় বাজার তৈরি হবার পর সাথে পারিপার্শ্বিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনলাইন প্লাটফর্মগুলো করোনা  পরবর্তী মানুষের মানসিক জগতের বিনোদন যোগানোর জন্য ঠিক কী ধরনের নতুন কনটেন্ট নিয়ে আসে তাও গবেষণার বিষয় বলে আমার মনে হয়। বর্তমানে ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ চলচ্চিত্র অ্যাডভেঞ্চার ও অ্যাকশনধর্মী হয় এমনটাই ধারণা করেছে পিডব্লিউসি। তাই ঠিক কি ধরনের কতটা উত্তেজক কনটেন্ট এই ধরনের প্ল্যাটফর্মগুলোয় আসতে যাচ্ছে তার ওপরে নজরদারি মনে হয় জরুরি হয়ে পড়তে পারে মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য রক্ষায়।

এপিকিউরাস তার শিষ্যদের আনন্দলাভের বস্তুর সংস্পর্শ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার কথা বলেন এতে করে অল্পে তুষ্ট থাকার এক প্রবণতা তৈরি হয় বলে তিনি মনে করতেন। তার মতে এই অতিরিক্ত আনন্দ লাভের যে প্রবণতা তা পূরণ করার জন্য অতিরিক্ত কসরতের প্রয়োজন হয় যা তিনি কষ্ট বা দুর্ভোগের সাথে তুলনা করেন। এখন দেখার বিষয় এই যে করোনা পরবর্তী যে দ্বিপাক্ষিক কসরতের আবির্ভাব হবে তা কোন দিকে মোড় নেয়। 

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected] 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন