শুক্রবার | আগস্ট ০৭, ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

কভিড-১৯ সংকট

এখন কম বিশ্বায়নের বিপরীতে বেশি বহুপাক্ষিকতাবাদের উন্নয়ন প্রয়োজন

কামাল দারভিস

কভিড-১৯ বিপর্যয়সৃষ্ট আঘাতে পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত বৈশ্বিক অর্থনীতির বেরিয়ে আসা অন্তর্নিহিত নাজুকতা-অরক্ষণীয়তাগুলো মনে হচ্ছে অব্যাহতভাবে বিশ্বায়ন থেকে দেশগুলোর পশ্চাত্পসরণ অনিবার্য করে তুলছে। কিছু ক্ষেত্রে পশ্চাত্পসরণ কাঙ্ক্ষিত হতে পারে। তবে এর ইতিবাচক সুফল অর্জন নির্ভর করবে গভীর, অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যকর বহুপাক্ষিকতাবাদের ওপর।

বর্তমানে বি-বিশ্বায়নের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে। এই সমর্থন বাড়ার অন্যতম শক্তিশালী চালক হলো উৎপাদন মডেলের নাজুকতা, যেটি নির্ভর করে দীর্ঘ জটিল বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর। অবশ্য স্বল্পমেয়াদি কার্যকারিতা ব্যয় সাশ্রয়ের বেদিতে এটি (সরবরাহ শৃঙ্খল) এর বলিষ্ঠতা স্থায়িত্বশীলতা বিসর্জন দিয়েছে। অনেক কোম্পানি শিল্প বহুদূরের সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এবং এর কোনো বিকল্প না থাকায় ধরনের মূল্য নিগড়ের (ভ্যালু চেইন) কোনো অংশই কাজ করতে পারবে না, যদি সব অংশ কাজ করতে না পারে। তদুপরি কভিড-১৯ সংকট যেমনটা দেখিয়েছে, কোন কোন অংশ কাজ করা থামিয়ে দেবে, সেটি কেউ জানে না। 

বিশেষত এটি বেশি সত্য চীনের ক্ষেত্রে, যেটি বৈশ্বিক সরবরাহ নিগড়ের হাব। দেশটি সেলফোন, কম্পিউটার, গৃহস্থালি পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের ভোক্তাপণ্য উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল। অধিকন্তু, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওষুধের কাঁচামাল (এপিআই) সরবরাহকারীও। কাজেই আলোচ্য উপাদান উৎপাদনে যেকোনো সংকট বিশ্বব্যাপী মেডিকেল সাপ্লাই ব্যাহত করতে পারে। 

অতএব বিস্ময়ের কারণ নেই যে কভিড-১৯-সংক্রান্ত লকডাউনের অব্যবহিত সময়ে কেন বৈশ্বিক উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, ব্যাহত হয়েছিল। সৌভাগ্যজনক বিষয় হলো, চীন নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ এখন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে এবং দেশটিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে। ফলে ব্যাহত হওয়া (ডিজরাপশন) সীমিত থেকেছে। তবে কোনো নিশ্চয়তা নেই যে পরবর্তী ব্যাহতকরণ আরো ভয়াবহ হবে না কিংবা আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

সবচেয়ে বড় কথা, ধরনের ব্যাহতকরণ আরেকটি জনস্বাস্থ্য সংকট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আদলে আসতে হবে। কিন্তু সেটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও হতে পারে, রাজনীতি বিজ্ঞানী হেনরি ফারেল আব্রাহাম এল. নিউম্যান যাকে বলেছেন উইপনাইজড  ইন্টারডিপেনডেন্স

এমনকি মহামারীর আগেও এটি ছিল আশঙ্কার উৎস, যখন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে চীনা টেলিকমিউনিকেশন জায়ান্ট হুয়াওয়েকে দেশটির বাজারে বাজেয়াপ্ত করেছিল এবং মার্কিন টেকনোলজি সাপ্লায়ারদের কাছে এর প্রবেশাধিকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অনেক সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের মতো সাম্প্রতিক বিদেশী বিনিয়োগের বিষয়ে তদন্ত-খোঁজখবর তীব্রতর করেছে, বিনিয়োগ সীমায়িত করছে, নিজস্ব অর্থনীতির জন্য কৌশলগত বিবেচিত খাতের সংখ্যা বাড়াচ্ছে এবং দেশে উৎপাদন কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা বা প্রত্যাবাসনের জন্য কাজ করছে।

অনেক জলবায়ু কর্মীও আজকাল অধিকতর স্থানীয় উৎপাদনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। বৈশ্বিক শিপিং শিল্প ২০১২ সালে ৭৯৬ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করেছে, ওই বছরে এটি মোট মানবসৃষ্ট কার্বন নির্গমনের দশমিক শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। হিসাব ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের। যেসব পণ্য সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়, তার দূরত্ব কমালে বিশ্ব নির্গমন হ্রাস লক্ষ্যে উন্নতি ঘটবে। তবে সেটি কিসের বিনিময়ে?

কার্বন লিকেজ প্রতিরোধের প্রচেষ্টাগুলোও (যখন কোম্পানিগুলো কার্বন দাম, ক্যাপ অ্যান্ড ট্রেড মেকানিজম বা কঠোর আইনের মতো শক্তিশালী নির্গমন-হ্রাসমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নকারী দেশ থেকে তাদের উৎপাদন কর্মকাণ্ড স্থানান্তর করবে) কিছুটা বি-বিশ্বায়নে ভূমিকা রাখবে। এরই মধ্যে এই প্রপঞ্চ নিরুৎসাহিত করতে কেউ কেউ কার্বন বর্ডার ট্যাক্স আরোপের কথা বলছেন। এটি এমন এক অ্যাপ্রোচ, যা স্থানীয় উৎপাদনের জন্য প্রণোদনা জোরদার করবে।

এসব বিষয় এই ইঙ্গিত দেয় যে বলিষ্ঠতা স্থায়িত্বশীলতার ওপর জোরারোপের সঙ্গে কিছু মাত্রায় বি-বিশ্বায়ন অনিবার্য এবং কিছু মাত্রায় কাঙ্ক্ষিত হতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়া উৎপাদন ব্যয় আকাশছোঁয়া করা থেকে শুরু করে ভূরাজনৈতিক সংঘাতসহ কিছু ভয়াবহ ঝুঁকিও বয়ে নিয়ে আসবে।

সত্যি বলতে কি, দেশগুলো যেহেতু তাদের সরবরাহ নিগড় বহুমুখীকরণ এবং সেগুলো আরো বাড়াতে চেষ্টা করবে, সেহেতু উৎপাদন ব্যয় কিছুটা বাড়বে। খুব বড় অর্থনীতিগুলোর জন্য হয়তো তাদের উৎপাদন বহুমুখীকরণের ব্যয় মেটানো খুব কঠিন নাও হতে পারে; তবে ক্ষুদ্র মাঝারি আকারের অর্থনীতিগুলোর কাছে ব্যয় বাড়তি চাপের, কষ্টক্লিষ্ট মনে হতে পারে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সরবরাহের মজুদ গড়ায় সচেষ্ট দেশগুলোও ব্যয় প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যাবে।

প্রতিশোধের চক্র ত্বরান্বিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ তীব্রতর করার মাধ্যমে জলবায়ু উদ্বেগ এবং কার্বন বর্ডার ট্যাক্স সমস্যাটিকে আরো জটিল করে তুলবে। একইভাবে জাতীয় নিরাপত্তার নামে বাণিজ্য বিদেশী বিনিয়োগ হ্রাস আসলে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর কারণও হতে পারে এবং প্রতিশোধের বৃত্ত ত্বরান্বিত করে সেটি অর্থনীতিগুলোকে একটি নিম্নমুখী প্রবণতায় ফেলে দিতে পারে। 

এদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে দুটি প্রধান ব্লক আরো কিছু বিচিত্র ব্লকের উত্থান বি-বিশ্বায়নের কিছু অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে পারে। কিন্তু এটি অধিকাংশ দেশেরই (যেটি কোনো একটি ব্লকের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য করবে) এজেন্সিও দমিত করতে পারে। সর্বোপরি, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির আরো রাজনীতিকরণ ঘটাতে পারে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বৈধতায় চিড় ধরাতে পারে। অধিকন্তু, একটি দীর্ঘমেয়াদি বিদ্বেষ বাড়িয়ে এটি বৈশ্বিক শান্তির প্রতি গভীর হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্য সহযোগিতামুখী অর্থনীতির সমন্বয়ে গঠিত একটি তৃতীয় ব্লকের সংযোজন এসব অসুবিধা বদলাতে বেশি কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না।

একটি অধিকতর ভালো অ্যাপ্রোচ গড়ে উঠতে পারে বহুপাক্ষিক বৈশ্বিক সহযোগিতার কার্যকর ধরনের ওপরে। উদাহরণস্বরূপ, পর্যাপ্ত মহামারী প্রস্তুতি নিশ্চিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে ব্যয় ভাগাভাগি নীতি নমনীয় ডেপ্লয়মেন্ট প্ল্যান মোতাবেক দেশগুলোকে বিশ্বের একটি অধিকতর উচ্চাকাঙ্ক্ষী সমন্বিত প্রাক-সতকর্তা ব্যবস্থা উন্নয়ন আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুদে সম্মত হতে হবে। একইভাবে প্রটোকল দ্রুত ভ্যাকসিন উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন এবং উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়েও সম্মত হতে হবে (এবং সেটি ধারাবাহিকভাবে হালনাগাদও করতে হবে) এটি প্রতিটি দেশের নিজস্ব অ্যাপ্রোচের বিপরীতে বিশ্বকে বড় মাত্রার রোগের বিস্তার সামলাতে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।

জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষেত্রে দেশগুলোকে আবশ্যিকভাবে সাইবার স্পেস, তথ্য সুশাসন-পরিচালন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জৈব প্রকৌশলবিষয়ক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি উন্নয়নে একযোগে কাজ করা উচিত। এসব চুক্তি নতুন প্রযুক্তিকে হাতিয়ার বানানোর বিপজ্জনক দৌড় প্রতিহত করবে। একই সঙ্গে মানবকল্যাণ নিরাপত্তা জোরালো করে এমন উদ্ভাবনও উৎসাহিত করবে।  

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির সঙ্গে সংগতি রেখে ২০৫০ সাল নাগাদ নির্গমনের বৈশ্বিক টার্গেট অর্জনে আরো অধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী নীতি গ্রহণ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শুধু ইচ্ছামূলক ঘোষণা পারস্পরিক চাপ যথেষ্ট হবে না। উন্নয়নশীল দেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা জোগানোর উদ্দেশ্যে একটি আন্তর্জাতিক সম্মত কাঠামো হিসেবে কার্বন বর্ডার ট্যাক্স লক্ষণীয়ভাবে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে পারে অস্থায়ী পদক্ষেপগুলোর নেতিবাচক প্রভাব ছাড়াই।

বিশ্বব্যাংকের বর্তমান মুখ্য অর্থনীতিবিদ সম্প্রতি উদ্বেগের সঙ্গে ঘোষণা করেছে যে বিশ্বায়নের কফিনে কভিড-১৯ মহামারী হলো শেষ আঁচড়। কিন্তু কিছু মাত্রায় বি-বিশ্বায়ন অর্থনৈতিক বিপর্যয় পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না। কার্যকর, নবায়িত বৈশ্বিক সহযোগিতার সঙ্গে এটি কিছুটা ক্ষতি কমাতে তো পারে এবং বলিষ্ঠতা, নিরাপত্তা স্থায়িত্বশীলতাসহ কিছু সুফল সর্বোচ্চ করতে পারে। বিদ্যমান বাস্তবতায় অবশ্য নতুন বহুপাক্ষিকতাবাদ তৈরি করা সহজ হবে না, এমনকি এটি অসম্ভবও হতে পারে, অন্তত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রতি বীতশ্রদ্ধ বা অনাগ্রহের কারণে। তবে একটি নতুন মার্কিন প্রশাসন শেষ পর্যন্ত আবির্ভূত হবেই। বিকল্পগুলোর ঝুঁকির বাস্তবতা আমলে নিয়ে যেকোনো ক্ষেত্রে চেষ্টা চালিয়ে না যাওয়া সেক্ষেত্রে কোনো অপশনই হতে পারে না। কভিডকালীন নতুন বাস্তবতায় আমাদের একটি সংহতিমূলক বিশ্ব গড়ার চেষ্টা অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে।  

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

কামাল দারভিস: তুরস্কের অর্থনৈতিক বিষয়াদির সাবেক মন্ত্রী এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সাবেক প্রশাসক; ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের  একজন জ্যেষ্ঠ ফেলো

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন