শুক্রবার | আগস্ট ০৭, ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

এই সময়

ব্যাংকারদের বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক?

শহীদুল জাহীদ

প্রায়োগিক অর্থনীতিতে খরচ পছন্দ তত্ত্ব (দ্য কস্ট প্রেফারেন্স হাইপোথিসিস) একটি জনপ্রিয় অধ্যায়। অনেকের মধ্যে অর্থনীতিবিদ এডওয়ার্ড হেজেস্টেড ১৯৭৩ সালে এবং হেজেস্টেড মিংগো ১৯৭৬ সালে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিশেষত মুনাফার ওপরে ওই খরচ পছন্দ তত্ত্বের প্রভাব নিয়ে বিস্তর প্রায়োগিক গবেষণা করেন। প্রায়োগিক অর্থনীতির অনেক ছাত্রের কাছেই দ্য এডওয়ার্ড-হেজেস্টেড-মিংগো থিওরি একটি সুপরিচিত নাম।

খরচ পছন্দ তত্ত্ব অনুযায়ী সরল সিদ্ধান্ত এই যে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বেশি বেশি খরচ করতে পছন্দ করে। সে খরচ অবশ্য বিভিন্ন নামেই হতে পারে। হোক সে ব্যবস্থাপকদের উচ্চ বেতন-ভাতা, বোনাস, বাড়ি-গাড়িসংশ্লিষ্ট দৃশ্যমান খরচ অথবা অনেক অদৃশ্যমান বা পরোক্ষ খরচ। যুগের পরিক্রমায় নামে-বেনামে অনেক খরচের খাত যোগ হলেও সব খরচই প্রয়োজনীয় কিনা, তা অবশ্য ভেবে দেখার বিষয়। অভিজাত হোটেলে কর্মশালার আয়োজন থেকে শুরু করে অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ আর পাঁচ তারকা হোটেলে ইফতারি আয়োজন কোনটা যে প্রয়োজনীয় আর কোনটা অপ্রয়োজন, তা সংশ্লিষ্টরা ভাববেন বৈকি।

বাংলাদেশে ব্যাংকারদের বেতন কমানো এবং সুযোগ-সুবিধা স্থগিতকরণ শিরোনামে সম্প্রতি একটি খবর বেশ আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ব্যাংক খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বলা হয়ে থাকে, ব্যাংক হচ্ছে অর্থনীতির চালিকাশক্তি। যেভাবেই বলি না কেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেক অবদান রাখে। তবে বুঝতে হবে ব্যাংক, ব্যাংকিং ব্যাংকার একই সমীকরণে বিভিন্ন উপাদান। এদের প্রতিটা উপাদানের নিজস্ব লক্ষ্য উদ্দেশ্য রয়েছে। এখানে ব্যাংকার বলতে মূলত নিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বোঝায়, যারা ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটিকে পরিচালনা করে।

দ্য এডওয়ার্ড-হেজেস্টেড-মিংগো থিওরি অনুযায়ী ব্যাংকারদের পেছনে ব্যাংকের খরচ এবং ওই ব্যাংকের মুনাফা সমগতিক। অর্থাৎ অন্য কিছু অপরিবর্তিত থাকা অবস্থায় যে ব্যাংকের ব্যাংকারদের পেছনে খরচ বেশি, সেই ব্যাংকের মুনাফাও বেশি। ওই খরচ পছন্দ তত্ত্বের যথেষ্ট যৌক্তিক ব্যাখ্যা অবশ্যই আছে। ব্যাংক পরিচালনার  দায়িত্ব যেহেতু ব্যাংকারদের হাতেই, তাই একটি তুষ্ট ব্যবস্থাপনা অবশ্যই নিশ্চিত করা জরুরি। সময়ে সময়ে তাই ব্যাংকের মালিকপক্ষ ব্যাংকারদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা বিবেচনা করে থাকে। মূলত সুবিধাদি বৃদ্ধি করতেই শোনা যায় বেশি, সুবিধাদি হ্রাস, স্থগিত বা বন্ধের কথা খুব কমই শোনা গেছে বা আলোচিত হয়েছে। বেতন-ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা কমানো বা স্থগিত অবশ্য মালিকপক্ষের একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পরিগণিত, যা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যও প্রযোজ্য।

যে আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকারদের বেতন-ভাতা কমানো এবং ক্ষেত্রবিশেষে স্থগিত করা হয়েছে, তা যথেষ্ট আলোচনার দাবি রাখে। বলা হচ্ছে, করোনা মহামারীর কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দা পরিস্থিতি; যা কিনা অনেক দিন ব্যাপ্ত হতে পারে। ধারণাটি অমূলক নয়। মানুষের নগদ অর্থের অভাব, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে নেতিবাচক অবস্থাসবকিছু মিলিয়ে বর্তমান বা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেই সুখকর নয়। ব্যাংকিং ব্যবসাও অন্যান্য ব্যবসা থেকে মৌলিকভাবেই ভিন্ন। এই ব্যবসায় মালিকপক্ষ যে মূলধন সরবরাহ করে, তা প্রতিষ্ঠানের মোট সম্পদের তুলনায় খুবই নগণ্য। ব্যাংক মূলত তার ঋণদানের জন্য আমানতের ওপর সবিশেষ নির্ভরশীল। তাই নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখে এবং মুনাফার ওপর ধার্যকৃত ট্যাক্স হারও তুলনামূলক বেশি।

ব্যাংকাররা এসব সুবিধা-অসুবিধা মেনে নিয়েই ব্যবসা করেন। দেখা যায় ব্যাংকিং ব্যবসায় ব্যাংকারদের পরিশ্রম কোনোভাবেই কম নয়। ব্যাংকার সামাজিকভাবে একটি মর্যাদার পেশা। অনেকে ভেবে থাকেন, ব্যাংকাররা যে পারিশ্রমিক পান, তা দেশ বা সমাজের গড় সুবিধাদি থেকে বেশিই বটে। কিন্তু পেশার ভিন্নতা এবং চ্যালেঞ্জের কারণে এটাকে স্বাভাবিকই মনে হয়। ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারীদের একটি প্রস্তুত বাজার (রেডি মার্কেট) থাকে। তারা আগে থেকেই অনুমান করতে পারে কতটুকু উৎপাদন করবে এবং উৎপাদন ব্যয় কোথা থেকে আসবে। কিন্তু ব্যাংকাররা সেবার বাজার সৃষ্টি করে থাকেন। বিশেষত বাংলাদেশের মতো আর্থসামাজিক বাস্তবতায় দেশের সাধারণ মানুষের ভেতর ব্যাংকিং আচরণ খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। ব্যাংকাররা তাদের বুঝিয়ে আমানত সংগ্রহ করেন আবার সেই আমানতের সদ্ব্যবহার অর্থাৎ ঋণদান করেন। কাজটি রেডি মার্কেটের চেয়ে ঢের চ্যালেঞ্জিং। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আমানত সংগ্রহ ঋণদানের ক্ষেত্র বেশ সংকুচিত হয়েছে বলে তাদের মুনাফার মূল উৎসে টান পড়েছে।

অন্যদিকে আমদানি-রফতানি কমে যাওয়ার কারণে অন্যান্য খাত (অফ-ব্যালান্স শিট) থেকে অর্জিত আয়ও কমে যাওয়া স্বাভাবিক। নানা কারণে কোনো কোনো ব্যাংকে মালিকপক্ষ ব্যায়সংকোচন নীতি অনুযায়ী তাদের উচ্চ বেতনের ব্যবস্থাপকদের বেতন কমানো এবং অন্যদের সুবিধাদি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

খরচ পছন্দ তত্ত্ব অনুযায়ী খরুচে ম্যানেজার প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো। ধরনের ম্যানেজার পরিশ্রম উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রয়োগ করে শুধু নিজের উচ্চ বেতন ভাতাই নিশ্চিত করেন না, বরং প্রতিষ্ঠানের উচ্চ মুনাফায় অধিক অবদান রাখেন।

গবেষণায় দেখা গেছে খরচের পাশাপাশি আরেকটি উপাদান ব্যাংকের মুনাফা অর্জনে সমগতিক ভূমিকা রাখে। আর তা হলো, মালিকপক্ষের সরবরাহকৃত মূলধন। অর্থাৎ মূলধন ওই ব্যবসার মুনাফার ভেতর ধনাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান। প্রায়োগিক গবেষণায় (বাংলাদেশের তথ্যসহ) প্রকাশ, কোনো ব্যাংকের মূলধন ১০০ টাকা বাড়লে মুনাফা বাড়ে ১৩ টাকার সমান। অন্যদিকে ব্যাংকারদের পেছনে খরচ ১০০ টাকা কমালে ওই ব্যাংকের মুনাফা কমে ৩২ টাকার মতো।

তুলনামূলক আলোচনায় দেখা যায়, ব্যাংক মালিকদের জন্য প্রথম বিকল্পটি অধিক লাভজনক। মাত্র ১০০ টাকা অতিরিক্ত মূলধনের বদৌলতে ১৩ টাকা অতিরিক্ত মুনাফা। সেখানে দ্বিতীয় বিকল্প বেশ ব্যয়বহুল। ১০০ টাকা খরচ বাঁচাতে গিয়ে ৩২ টাকার লোকসানের মুখে পড়া। মনে হচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ প্রথম বিকল্পের চেয়ে দ্বিতীয়টিকে সহজতর মনে করছে। কিন্তু মুনাফা যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে ব্যাংকার তথা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সুবিধাদি কমানো বা স্থগিত কোনো সহজ সমাধান নয়।

বিভিন্ন ব্যাংকার তথা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সুবিধাদি কমানো বা স্থগিতের ফলাফল সুদূরপ্রসারী হবে বলেই প্রতীয়মান হয়। যে করোনা মহামারীর কথা বলা হচ্ছে, সেখানে অন্য অনেক পেশার সঙ্গে সম্মুখসারি থেকে সেবা দিয়েছেন আমাদের ব্যাংকাররা। নিজের জীবন পরিবারের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেও তারা সেবাদানে পিছপা হননি। ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে অনেক পেশার মতো ব্যাংকারদেরও জীবনমান হুমকির মুখে পড়বে, সে প্রসঙ্গ সবারই জানা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পরিতুষ্ট ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হতে পারে। অসন্তুষ্ট ব্যবস্থাপনা আজকে দুর্দিনের পাশাপাশি সুদিনেও তাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য প্রয়োগ না- করতে পারে। তখন দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর মুনাফা বিনষ্ট হতে পারে।

ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কমানো, স্থগিত বা বন্ধের মতো সহজ সমাধানে পৌঁছার আগে অন্যান্য বিকল্পের কথা ভেবে দেখা যেতে পারত।

 

শহীদুল জাহীদ: সহযোগী অধ্যাপক

ব্যাংকিং ইন্সু্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন