বৃহস্পতিবার | আগস্ট ০৬, ২০২০ | ২১ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

কৃষকের আয় নেই বোরোতে

সাইদ শাহীন

দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান শস্যে পরিণত হয়েছে বোরো ধান। মোট উৎপাদিত চালের অর্ধেকই জোগান দেয় বোরো। বোরোতে এই সাফল্যই বিশ্বে তৃতীয় শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশের অবস্থান এনে দিয়েছে বাংলাদেশকে। অথচ সেই বোরো চাষেই আয়ের দিক থেকে কৃষকের অর্জন শূন্য। লাভ দূরে থাক, উল্টো নিয়মিত গুনতে হচ্ছে লোকসান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোরো ধানে কৃষকের লোকসানের অন্যতম কারণ এতে উৎপাদন খরচ বেশি। আউশ-আমনে সেচ খরচের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বোরোতে সেচের পেছনে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয় কৃষককে। খরচ বেশি হলেও সে তুলনায় ধানের দাম পান না কৃষক। ফলে গুনতে হয় লোকসান।

কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে গত বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ধান হাজার ৪০ টাকায় কেনার ঘোষণা দিয়েছিল খাদ্য অধিদপ্তর। কিন্তু ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে গড়িমসির কারণে সরকার ঘোষিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করতে হয়েছে কৃষককে।

হাওড়ের সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদনকারী জেলা সুনামগঞ্জের কৃষকরা জানান, অঞ্চলভেদে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে ৭০০-৮৫০ টাকা খরচ হলেও ওই ধান বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ৬০০-৭৫০ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচ তো ওঠেইনি উল্টো গুনতে হয়েছে লোকসান। শুধু সুনামগঞ্জ নয়, একই চিত্র ছিল দেশের প্রায় সব জায়গায়।

এদিকে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, প্রতি হেক্টর বোরো আবাদে কৃষকের এখন ক্ষতি হচ্ছে প্রায় হাজার ৩৫ টাকা। তবে আউশ আমনে লাভের মুখ দেখছে কৃষক। প্রতি হেক্টর আউশ আবাদে কৃষকের মুনাফা হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার ৭১০ টাকা। অন্যদিকে আমন ধানে মুনাফা হচ্ছে হাজার ৬৯০ টাকা।

প্রমোটিং এগ্রি ফুড সেক্টর ট্রান্সফরমিং ইন বাংলাদেশশীর্ষক ওই প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদন তৈরিতে সারজেন্ট অ্যান্ড গ্রাফহামেরবিল্ডিং রেজিল্যান্স অ্যান্ড কম্পিটেটিভনেস এলং ভ্যালু-চেইনস ইন এগ্রি ফুড সিস্টেমশীর্ষক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যে গবেষণাটি মূলত বিশ্বব্যাংকেরএগ্রিকালচার স্ট্র্যাটেজিস ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ফুড প্র্যাকটিসশীর্ষক গবেষণার ব্যাকগ্রাউন্ড পেপার হিসেবে ছিল।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, প্রতি হেক্টর বোরো আবাদে কৃষকের গড় ফলন ধরা হয়েছে প্রায় চার হাজার কেজি। প্রতি কেজি ধানের দাম ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ টাকা। ফলে প্রতি হেক্টর বোরো আবাদে কৃষকের মোট আয় হয় ৫৬ হাজার ১৫ টাকা। এর বিপরীতে কৃষকের খরচ হচ্ছে প্রায় ৬২ হাজার ৫০ টাকা। এসব খরচের মধ্যে বীজে হাজার ৪৮৫ টাকা, সারে হাজার ৫৬৫ টাকা, কীটনাশক বালাইনাশকে হাজার ৯৯৫ টাকা, কৃষিযন্ত্র বাবদ হাজার ১৬০ টাকা, সেচে ১০ হাজার ৩০ টাকা, ভাড়া করা শ্রমের খরচ ২৩ হাজার ৯৭০ টাকা এবং নিজেদের পরিবারের শ্রম খরচ হাজার ৭৬০ টাকা ধরা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, নিজেদের পরিবারের শ্রম খরচ বাদ দিলে কৃষকের আয় ব্যয় অনেকটাই সমান সমান।

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থা শঙ্কা প্রকাশ করলেও বাংলাদেশের দানাদার খাদ্যশস্য বিশেষ করে চালের উদ্বৃত্ত উৎপাদন হবে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য কৃষি সংস্থা (এফএও) সংস্থাটি এও বলেছে, চলতি বছরে প্রথমবারের মতো চাল উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়াকে টপকে তৃতীয় স্থানে চলে আসবে বাংলাদেশ। দেশের অর্জনে বড় অবদান রাখবে শুধুই বোরো আবাদ।

যে বোরো দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বৈশ্বিক সুনাম অর্জন বৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখছে, সেই ধান আবাদে কৃষক লোকসান গুনছে কেন? মুনাফা না হলেও কেনই বা তারা বোরো আবাদ করছে? এসব প্রশ্নের জবাবে সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, বোরোতে সেচের খরচ এবং শ্রমিক খরচ অত্যধিক বেশি হওয়ার কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি তো আছেই। মূলত তিনটি কারণে বোরো ধান থেকে কৃষক সরতে পারছে না।  প্রথম কারণটি হচ্ছে, নিজের নিত্য চালের চাহিদা মেটাতে ধান উৎপাদন ধরে রাখতে চায় কৃষক। এই শস্য আবাদ করলে স্বল্প সময়ে বাড়তি চাল উৎপাদন করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, ধান বিক্রি করে নিশ্চিত নগদ অর্থ ঘরে আসে। কেজিপ্রতি ধানের দাম কিন্তু খুব বেশি পার্থক্য হয় না। তৃতীয় কারণটি হলো বেশির ভাগ কৃষকের দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই। বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলের কৃষকরা মূলত একটি ধান করতে পারে।

তিনি বলেন, ধানের দাম না বাড়িয়ে ভোক্তা সন্তুষ্ট রাখতে হলে সেচে ভর্তুকি বাড়ানো এবং যান্ত্রিকীকরণ বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে হবে। কৃষিকে লাভজনক না করতে পারলে কৃষকের পরবর্তী প্রজন্ম কৃষিতে থাকতে চাইবে না।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে গত অর্থবছরে প্রায় কোটি ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বোরো আবাদ হয় ৪৮-৪৯ লাখ হেক্টরে, যা মোট ধান আবাদের প্রায় ৪২ শতাংশ। অন্যদিকে আমনের আবাদ হচ্ছে ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে এবং আউশের আবাদ হয় ১১-১২ লাখ হেক্টরে। অন্যদিকে গত অর্থবছরে কোটি ৮৮ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বোরোতে কোটি লাখ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এরই মধ্যে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার পথে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পান বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছুটা ক্ষতি হলেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিচ্যুতির আশঙ্কা কম। ফলে বোরো আবাদের মাধ্যমে মোট চালের চাহিদা পূরণ হবে প্রায় ৫০ শতাংশ।

বোরোতে কৃষকের আয় না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা জেনেছি আউশ, আমন বোরো তিনটি ধানের মধ্যে কৃষককে সবচেয়ে কম মুনাফা দিচ্ছে বোরো ধান। তবে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটি এখনো আমরা পাইনি। বোরোতে মুনাফা কম দিচ্ছে এমন বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে স্বল্প দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ধানের আবাদকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বোরো আবাদ থেকে সরে আউশ আমনে জোর দিতে প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। আবার আমন বোরোর মাঝখানে একটি স্বল্পমেয়াদি বাড়তি শস্য আবাদ করতে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। বোরোর পরিবর্তে রবি মৌসুমে অন্যান্য অর্থকরী ফসল আমদানিনির্ভর শস্য আবাদে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করতে অর্থায়ন উপকরণ সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। এটির ফলও আমরা এরই মধ্যে পেয়েছি। তবে সেটি ধীরে হলেও সামনের দিনে তা আরো গতি পাবে। গতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত চালের উৎপাদন ঠিক রাখতে আমরা বোরো আবাদে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোয় নজর দিচ্ছি। বিশেষ করে সেচ বীজের দাম কমানো হয়েছে। পাশাপাশি সারের দামও কমানো হয়েছে। এছাড়া যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষকের শ্রম খরচ কমানো হচ্ছে। কৃষিতে নতুন মডেল সিনক্রোনাইজড আবাদ পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে সার্বিক উৎপাদন খরচ অনেক কমিয়ে আনতে পারব।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন